ড. নাজমা শাহীন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক। সম্প্রতি নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্সে পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাইমিনুল ইসলাম
নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড টেকনোলজি বলতে কী বোঝায়?
খাদ্য কেবল ক্ষুধা মেটানোর মাধ্যম নয়। এটি আমাদের শরীর, মস্তিষ্ক, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং সার্বিক সুস্থতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই খাদ্যকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বোঝা, পুষ্টি উপাদানের গুরুত্ব নির্ধারণ এবং খাদ্যকে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকরভাবে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করা অত্যন্ত জরুরি। নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড টেকনোলজি হলো একটি সমন্বিত বিদ্যা, যেখানে মানবদেহের পুষ্টি চাহিদা, খাদ্যের রাসায়নিক গঠন ও গুণাগুণ এবং খাদ্যকে নিরাপদভাবে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাত ও উন্নত করার প্রযুক্তি একসঙ্গে আলোচনা করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো কোন খাবার কীভাবে উপকারী, পুষ্টি উপাদান শরীরে কীভাবে কাজ করে এবং খাদ্যকে কীভাবে নিরাপদ, পুষ্টিকর ও দীর্ঘস্থায়ী রাখা যায় এসব প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক উত্তর ও প্রয়োগ নির্ধারণ করা। এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে মানুষের স্বাস্থ্য এবং খাদ্যের গুণমান ও প্রযুক্তিগত ব্যবহার দুটি সমানভাবে গুরুত্ব পায়।
নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড টেকনোলজি, নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্স বা নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং—এ তিনটি বিষয়ের মধ্যে কী কী পার্থক্য রয়েছে?
উচ্চশিক্ষায় খাদ্য ও পুষ্টিসংক্রান্ত বিভিন্ন শাখা থাকলেও লক্ষ্য ও কর্মক্ষেত্র ভিন্ন। ফুড সায়েন্স মূলত খাদ্যকে বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝার ওপর জোর দেয়। ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ করে খাদ্যকে শিল্প পর্যায়ে উৎপাদন ও সংরক্ষণ করার প্রযুক্তিগত দিক নিয়ে। আর নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড টেকনোলজি মানুষের পুষ্টি চাহিদা বুঝে খাদ্যকে নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী করার দিকে মনোযোগ দেয়। এখানে খাদ্যকে শুধু পণ্য হিসেবে নয়, বরং মানুষের সুস্থতা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে দেখা হয়।
কেন এ বিষয়ে অধ্যয়ন গুরুত্বপূর্ণ?
মানুষের সুস্থতার মূল ভিত্তি হলো খাদ্য। প্রতিদিন যা খাই, তা শুধু ক্ষুধা মেটায় না, শরীর ও মস্তিষ্কের বিকাশ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং কর্মক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলে। যদি পুষ্টি উপেক্ষা করা হয়, তাহলে রোগ বাড়ে, কর্মক্ষমতা কমে, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং জাতির সামগ্রিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য নয়, জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
একজন শিক্ষার্থী কেন এ বিষয়ে পড়াশোনা করবে?
এ বিষয়ে পড়াশোনা শিক্ষার্থীদের শুধু খাবার সম্পর্কেই ধারণা দেয় না, বরং তাদের স্বাস্থ্য, রোগ প্রতিরোধ, খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের দায়িত্বে সক্ষম করে। তারা টিচিং, গবেষণা বা কমিউনিটির পুষ্টিকাজে অবদান রাখতে পারবে। এটি কেবল একটি একাডেমিক বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষার একটি দায়িত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ক্ষেত্র। যে শিক্ষার্থী মানুষের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে চায়, সে এ বিষয়ে পড়াশোনা করে জীবনে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে পারে।
চাকরির ক্ষেত্র কোথায়? গ্র্যাজুয়েটরা কর্মক্ষেত্রে কেমন করছে?
পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান গ্র্যাজুয়েটরা বহুমুখী ক্ষেত্রের পেশাজীবী। তারা কাজ করতে পারে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ান ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ হিসেবে, রোগীদের জন্য ডায়েট থেরাপি পরিকল্পনা এবং স্বাস্থ্যপরামর্শ প্রদান, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্র, খাদ্য শিল্প এবং জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানে। আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা এ খাতে দক্ষতা প্রদর্শন করেছে। তারা হাসপাতাল, এনজিও, খাদ্য শিল্প ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কেউ কমিউনিটি পুষ্টিকাজে, কেউ নতুন পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি উদ্ভাবনে অংশ নিচ্ছে। এভাবে তারা দেশের পুষ্টি ও খাদ্য চ্যালেঞ্জ সমাধানে সরাসরি ভূমিকা রাখছে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ কেমন?
পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান একটি বৈশ্বিক চাহিদাসম্পন্ন ক্ষেত্র। বিদেশে উচ্চশিক্ষা শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞতা দেয়, যা দেশে ফিরে জাতীয় পুষ্টি ও খাদ্য উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সহায়ক। এটি শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ারকে আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রসারিত করে এবং পেশাগত ও গবেষণার ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা প্রদান করে।










