পড়াশোনা কিংবা কাজের উদ্দেশ্যে যারা বিদেশে যান, তাদের অনেকের মধ্যেই দেখা যায় প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে যোগ্যতা ও অন্যান্য দক্ষতায় খুব বেশি পার্থক্য নেই। তবে যারা বাংলাদেশে থাকতেই গন্তব্য দেশের ভাষা শিখে নেন, তারা সাধারণত অন্যদের তুলনায় স্পষ্টতই এগিয়ে থাকেন। ভাষাজ্ঞান থাকায় তারা নতুন দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেন। ফলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে, পাশাপাশি অন্যান্য দক্ষতাও দ্রুত বিকশিত হয়। ফলে প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মক্ষেত্রেও তারা এগিয়ে থাকেন।
যারা এরই মধ্যে বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা কাজের উদ্দেশে গেছেন, তাদের অভিজ্ঞতাও বলছে নতুন একটি দেশে গিয়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় সে দেশের স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়া। ফলে আগেভাগে সে ভাষা শেখা থাকলে নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়ানো তুলনামূলক অনেক সহজ হয়। পাশাপাশি স্থানীয় ভাষায় দক্ষতা অর্জন করা গেলে বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে ভালো বেতনে কাজের সুযোগ তৈরি হয়। সবচেয়ে বেশি সুযোগ থাকে সংশ্লিষ্ট ভাষাভাষী দেশগুলোয়ই। এজন্য ভাষা শিক্ষার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এবং সে দেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও কৃষ্টির বিষয়ে সম্যক ধারণা থাকা জরুরি। জাপানের কোবে গাকুইন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এবিএম রেজাউল করিম ফকির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভাষাগত দক্ষতা একটি মানবিক পুঁজি। এ পুঁজি গঠনে সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ প্রয়োজন। তবে এ বিনিয়োগ ভাষাগত দক্ষতা উন্নয়নে সহায়ক হতে হবে।’
চীনের লানঝো বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে পড়াশোনা করছেন রবিউল ইসলাম। এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। চীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও সেখানে বিভিন্ন প্রয়োজনে দেশে অর্জিত ডিগ্রিটি কতটা কাজে এসেছে— জানতে চাইলে রবিউল বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া চীনা ভাষার স্নাতক ডিগ্রিটি চীনের প্রায় প্রতিটি জায়গায় আমার জন্য সহায়ক হয়েছে। ভাষা রপ্ত থাকায় যোগাযোগ রক্ষা, সহজে ক্লাস বুঝতে পারা, কাজ খোঁজা—সবই সহজ হয়ে গেছে। যারা ভাষা রপ্ত না করে চীনে আসেন, তারা শুরু থেকেই কিছু সমস্যায় পড়েন। ভাষা জানার কারণে আমাকে এসব ঝামেলায় পড়তে হয়নি।’
শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উপযোগী করে তোলাসহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বিদেশী ভাষা শেখার জন্য স্নাতকসহ বিভিন্ন কোর্স। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় চালু থাকা এসব ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র বিদেশী ভাষা শেখার সুযোগ দিয়ে বিদেশে পড়াশোনা, কাজ ও বসবাসের পথ সহজ করে তোলে। বাংলাদেশের চারটি সরকারি ও পাঁচটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা শিক্ষার ওপর বিভিন্ন মেয়াদে একাধিক কোর্স পরিচালিত হয়। শিক্ষার্থীরা ভাষা অর্জনে পারদর্শী হয়ে উঠলে দেশের বাইরে যেমন, তেমনি দেশের মধ্যেও ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ তৈরি হয়। অনেকেই বিদেশী ভাষা রপ্ত করে দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দোভাষী হিসেবে কাজ করছেন।
বিদেশী ভাষা শিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট। এখানে মোট ১৬টি ভাষায় সার্টিফিকেট ও ডিপ্লোমা কোর্স পরিচালিত হয়। এছাড়া চালু রয়েছে বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য এক বছরের বাংলা ভাষা শিক্ষার কোর্স। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অন্যদের জন্য আরবি, চীনা, কোরীয়, ফরাসি, জার্মান, ইতালীয়, জাপানি, ফার্সি, রুশ, হিন্দি, স্পেনীয় ও তুর্কি ভাষায় জুনিয়র, সিনিয়র, ডিপ্লোমা ও উচ্চতর ডিপ্লোমা কোর্স চালু আছে। ইংরেজি ভাষায় রয়েছে কেবল জুনিয়র ও সিনিয়র কোর্স।
নিয়মিত প্রোগ্রামের আওতায় চারটি ভাষায় চালু রয়েছে অনার্স কোর্স। সেগুলো হলো বিএ ইন ইংলিশ ফর স্পিকার্স অব আদার ল্যাঙ্গুয়েজেস (ইএসওএল), বিএ ইন ফ্রেঞ্চ ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার, বিএ ইন জাপানিজ ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার এবং বিএ ইন চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার। এছাড়া রয়েছে এমএ ইন ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ টিচিং নামে একটি প্রফেশনাল ইভিনিং মাস্টার্স প্রোগ্রাম। প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী এ প্রতিষ্ঠানে এমফিল ও পিএইচডি প্রোগ্রামেও ভর্তি হন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের অধীনে পরিচালিত আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটেও রয়েছে ভাষা শিক্ষার সুযোগ। এখানে বাংলা (শুধু বিদেশীদের জন্য), ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, জাপানি, চীনা, আরবি ও ফার্সি ভাষায় এক বছর মেয়াদি সার্টিফিকেট ও ডিপ্লোমা ডিগ্রি প্রদান করা হয়।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি–বাংলাদেশে বিভিন্ন মেয়াদে বিদেশী ভাষা শেখানোর কোর্স পরিচালিত হয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা শিক্ষার জন্য চালু রয়েছে মোট ১১টি কোর্স। এর মধ্যে রয়েছে কমিউনিকেশন স্কিলস ইন ইংলিশ, ইংলিশ ফর প্রফেশনাল পারপাস, জাপানি ভাষা, ফ্রেঞ্চ ভাষা, জার্মান ভাষা, চাইনিজ ভাষা, স্প্যানিশ ভাষা, কোরিয়ান ভাষা, আরবি ভাষা ও সংস্কৃত ভাষা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইংলিশ অ্যান্ড আদার ল্যাঙ্গুয়েজেসে ছয়টি ভাষায় আলাদা আলাদা সার্টিফিকেট কোর্স করার সুযোগ রয়েছে। ভাষাগুলোর মধ্যে রয়েছে ইংরেজি, জাপানিজ, চাইনিজ, ফ্রেঞ্চ, জার্মান ও কোরিয়ান। এইচএসসি পাস করা যে কেউ এসব কোর্সে আবেদন করতে পারেন।
এ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মাসউদ আখতার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদেশী ভাষা শেখার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে ভালো করতে পারে। ভাষা শেখা তাদের ক্যারিয়ার গড়তে সহায়তা করে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের এখানে মোট ছয়টি ভাষায় কোর্স করানো হয়—ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, জার্মান, জাপানিজ, চাইনিজ ও কোরিয়ান। চাইনিজ ও কোরিয়ান ভাষা শেখানোর জন্য রয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশের শিক্ষক। শিক্ষার্থীরা এসব ভাষা রপ্ত করে বিদেশে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ পাচ্ছে। ২০১৫ সালে ইনস্টিটিউটটি গড়ে ওঠার পর থেকে বহু শিক্ষার্থী এখানে ভর্তি হয়েছে। যারা এখন বিভিন্ন দেশে কাজ করছে এবং ভালো করছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে।’
তবে ক্রমবর্ধমান শিক্ষার্থীর চাহিদা ও মানসম্পন্ন ভাষা শিক্ষার সুযোগ আরো বড় পরিসরে নিশ্চিত করার জন্য দেশে জাতীয়ভাবে ভাষাগত দক্ষতা অভীক্ষা চালু করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে ড. এবিএম রেজাউল করিম ফকির বলেছেন, ‘দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভাষাগত দক্ষতাসম্পন্ন মানবসম্পদ প্রয়োজন। এটি নিশ্চিত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় ভাষাগত দক্ষতা অভীক্ষা চালু করা প্রয়োজন। প্রস্তাবিত এ দক্ষতা অভীক্ষার কাজ হতে পারে দেশে বিদেশী ভাষার শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষার্থীদের উচ্চতর ক্লাসে উত্তীর্ণের বিষয়টি তদারকি করা।’
আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের সাবেক এ পরিচালক মনে করেন, দেশে ভাষাগত দক্ষতাসম্পন্ন মানবিক পুঁজি গড়ে উঠলে বিদেশে বিভিন্ন খাতে সামাজিক মর্যাদা অর্জন করা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।










