একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ, বিশ্বায়ন, বৈশ্বিক রাজনীতি, যুদ্ধ পরিস্থিতি, অপরাধের ফলে সৃষ্ট উদ্ভূত ভয়াবহ পরিস্থিতি ও আধুনিকায়নের ফলে পরিবর্তনশীল বিশ্বে অপরাধবিজ্ঞান একটি নতুন বিভাগ। তবে বিভাগটির স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। মৌলিক গবেষণার বিষয়বস্তু হিসেবে বিভাগের পঠন-পাঠনে ব্যাপক বৈচিত্র্য রয়েছে। বিভাগটির কোর্স কারিকুলাম ও সিলেবাসের বিশেষত্ব প্রকৃত অর্থে একজন গবেষণা অনুসন্ধিৎসু শিক্ষার্থীকে সহজেই আকর্ষণ করতে পারে। ফিল্ডট্রিপ, ওয়ার্কশপ, সেমিনার, কনফারেন্স, ইন্টার্নশিপ, ল্যাবওয়ার্ক ইত্যাদির বিশেষায়নে ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগটি স্বতন্ত্র ও গবেষণাভিত্তিক বিভাগ হিসেবে বিশ্বময় সুপরিচিত, যার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও বিভাগটির অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের কৌশল, ধরন, অপরাধের ভয়াবহতার পরিবর্তন হওয়ায় বিভাগটির যৌক্তিকতা সর্বক্ষণ ও সর্বজনীন। এছাড়া অপরাধীদের কৌশল, মোটিভ, অস্ত্র ব্যবহার, অস্ত্রের উৎস, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে জানা-বোঝার জন্য শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে বিভাগটি। অঞ্চলভেদে, ঋতুভেদে, সময়ভেদে অপরাধের ভয়াবহতার মাত্রা ও রকমফের পরিবর্তিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের গবেষণাকর্মের সুযোগ থাকায় এ বিভাগের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে অপরাধ প্রতিকার ও প্রতিরোধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা, আইনের প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ, ন্যায্যতার ভিত্তিতে শাস্তি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক অপরাধ, পুলিশ-পাবলিকের আন্তঃসম্পর্ক প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞানলাভের প্রবল আকাঙ্ক্ষায় এ বিভাগের প্রতি আলাদা আগ্রহ অনুভব করেন শিক্ষার্থীরা।
চাকরির ক্ষেত্রে ক্রিমিনোলজি বিভাগ থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যান্য ডিসিপ্লিন থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের মতো একই সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এ বিভাগের গ্র্যাজুয়েটদের জন্য বিশেষ জায়গায় চাকরির সংস্থান করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে এ ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ পুলিশি ব্যবস্থাপনাকে একটি ইতিবাচক ও জনবান্ধব পুলিশিংয়ের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারে। প্রচলিত চাকরির বাজারে গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষক হিসেবে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে মানবাধিকার কর্মী, মিডিয়া কর্মী, সমাজকর্মী হিসেবে এ বিভাগের শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ রয়েছে। এছাড়া সরকারি চাকরিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিসিএসের বিভিন্ন পদে বিশেষ করে পুলিশ, প্রশাসন, পররাষ্ট্র, ডাক বিভাগ, ব্যাংক, সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে এ বিভাগের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিভাগটির চার বছর মেয়াদি অনার্স কোর্সে যেসব বিষয় পাঠদান করানো হয় এর মধ্যে রয়েছে ক্রিমিনোলজির ভিত্তি, পুলিশিং পরিচিতি, অপরাধী আচরণের মনোবিজ্ঞান, আইনি বিচার ব্যবস্থার পরিচিতি, অপরাধ তদন্তের ভূমিকা, অপরাধের তত্ত্ব, কিশোর অপরাধ, গবেষণা পদ্ধতি, তুলনামূলক পুলিশিং, ফরেনসিক বিজ্ঞানের পরিচিতি, আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ, সংঘটিত অপরাধ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ, মানবাধিকার ও পুলিশিং, ভিকটিমোলজি, লিঙ্গ ও অপরাধ, জাতি, অপরাধ ও জাতিগত পরিচয়, অপরাধীর চিকিৎসা: তত্ত্ব ও পদ্ধতি, আইনশাস্ত্র, শাস্তি বিজ্ঞান ও সংশোধন, অপরাধ প্রতিরোধ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, মাদক ও অপরাধ, সাইবার অপরাধ ও সাইবার নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং গবেষণা মনোগ্রাফ। এসব বিষয় অপরাধ বিজ্ঞানের বিভিন্ন দিককে বিশ্লেষণ করে, যার মাধ্যমে অপরাধের কারণ, প্রতিরোধ, তদন্ত এবং সংশোধনের পদ্ধতিগুলো গভীরভাবে অনুসন্ধান করা হয়।
বাংলাদেশে ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিষয়ে সর্বপ্রথম মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পাঠদান শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিমিনোলজি বিভাগের যাত্রা শুরু হয়। সবশেষ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্সে শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি প্রদান করা হয়। এছাড়া পুলিশ স্টাফ কলেজ বাংলাদেশে প্রফেশনাল মাস্টার্স প্রোগ্রামে ‘মাস্টার অব অ্যাপ্লায়েড ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ ম্যানেজমেন্ট’ শীর্ষক কোর্সে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করানো হয়ে থাকে। সম্প্রতি বেশকিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অপরাধ বিজ্ঞানের ওপর প্রফেশনাল ডিগ্রি প্রদান করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড ক্রিমিন্যাল জাস্টিস বিষয়ে প্রফেশনাল মাস্টার্স প্রোগ্রাম চালু রয়েছে।
এ বিভাগের শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। পৃথিবীর নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এ বিভাগের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পথ উন্মুক্ত রয়েছে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্টস ফ্যাকাল্টির অধীনে এ বিভাগটির পাঠদান করানো হয়ে থাকে, আবার কোথাও আইনের অধীনে পাঠদান করানো হয়। বাংলাদেশ থেকে এ ডিসিপ্লিন থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের একটি অংশ উচ্চশিক্ষায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অধ্যয়নরত। কানাডার প্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় যেমন টরন্টো, অটোয়া, আলবার্টা, কার্লটন; অস্ট্রেলিয়ার প্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ম্যাকোয়ারি, মেলবোর্ন প্রভৃতি; আমেরিকার প্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় টেক্সাস এ অ্যান্ড এম; ইউনিভার্সিটি অব নিউ হেভেনসহ সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বাংলাদেশ থেকে তথা ক্রিমিনোলজি বিভাগ, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স থেকে পাস করা গ্র্যাজুয়েট ও শিক্ষকরা তাদের উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন। পৃথিবীর প্রখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এ বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার অবারিত সুযোগ রয়েছে।
মো. সাখাওয়াত হোসেন : সহকারী অধ্যাপক
ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়










