২০১৭ সালে দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রথম আন্তর্জাতিক মানের জিনোম গবেষণা ইনস্টিটিউট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এনএসইউ জিনোম রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এনজিআরআই)। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) ট্রাস্টি বোর্ডের (বিওটি) অর্থায়নে পরিচালিত ইনস্টিটিউটটির উদ্বোধন করেন ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড ও জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর রিটা আর কোলওয়েল এবং এনএসইউ বিওটি চেয়ারম্যান আজিম উদ্দিন আহমেদ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইনস্টিটিউটটি জিনোম স্টাডি, জেনেটিক ডাটাবেজ তৈরিসহ বিভিন্ন রোগের মূল কারণ অনুসন্ধানে ভূমিকা রাখছে। এ ইনস্টিটিউটের গবেষণাগুলো দেশের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। দেশের প্রথম জিনোম গবেষণা ইনস্টিটিউট নিয়ে লিখেছেন শফিকুল ইসলাম

কভিড প্রতিরোধে মাস্কের কার্যকারিতা

এ ইনস্টিটিউট কভিড-১৯ প্রতিরোধে মাস্কের কার্যকারিতা প্রমাণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করে। মাস্ক কভিড প্রতিরোধে সহায়ক—এটি বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্বে এর আগে প্রমাণিত ছিল না। এনজিআরআইয়ের পরিচালক ড. মুহাম্মদ মকসুদ হোসেনের যৌথ নেতৃত্বে এ গবেষণায় অংশ নেয় যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়, স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসি বার্কলে ও ইনোভেশনস ফর পভার্টি অ্যাকশন। গিভওয়েল ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত এ প্রকল্পে মোট ব্যয় ছিল ২ দশমিক ৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। গবেষণাটি বিশ্বখ্যাত সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত হয় এবং এটি প্রমাণ করেছে যে সার্জিক্যাল মাস্ক কভিড-১৯ সংক্রমণ, বিশেষ করে বয়স্কদের মধ্যে, উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। গবেষণাটি দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, দি ইকোনমিস্ট ও দি আটলান্টিকের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচিত হয়।

ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া: নতুন ওষুধের সন্ধানে

ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া একটি ভয়ংকর ব্যাকটেরিয়া, যা মানুষের ফুসফুস, রক্ত, প্রস্রাবের নালি ও শরীরের অন্যান্য অংশে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটাতে পারে। জীবাণুটি ক্রমেই এমনভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে যে এটি অনেক ওষুধে আর সাড়া দিচ্ছে না। চিকিৎসকরা একে মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট বা এক্সট্রিমলি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট বলে উল্লেখ করছেন। ফলে এটি এক ধরনের সুপারবাগ হয়ে উঠছে, যাকে দমন করা খুব কঠিন। অনেক ক্ষেত্রেই রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। এ বিপজ্জনক সংক্রমণের সমাধান খুঁজতে এনজিআরআইয়ের গবেষকরা এক হাজারেরও বেশি ক্লেবসিয়েলা ব্যাকটেরিয়ার জিনোম সিকোয়েন্স সম্পন্ন করেছেন। তারা খুঁজে বের করছেন, কোন জেনেটিক পরিবর্তনের কারণে রোগ দ্রুত ছড়াচ্ছে, কেন কিছু রোগী মারা যাচ্ছে আর কেউ কেউ সেরে উঠছে এবং কোন অঞ্চলে জীবাণুটি সবচেয়ে বেশি ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। এ প্রকল্পের বাংলাদেশ পক্ষের প্রধান গবেষক এনজিআরআই পরিচালক ড. মুহাম্মদ মকসুদ হোসেন। আন্তর্জাতিকভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রফেসর তানিয়া দোত্তোরিনি (ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যাম)। এ প্রকল্পে আরো যুক্ত আছেন প্রফেসর জাকির হাবিব ও প্রফেসর তাহমিনা শিরীন, পরিচালক, আইইডিসিআর। এ গবেষণায় অংশ নিচ্ছে যুক্তরাজ্যের নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়, কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় বেলফাস্ট ও আইইডিসিআর। পুরো প্রকল্পটি অর্থায়ন করছে যুক্তরাজ্যের মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল, যার মোট বরাদ্দ ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়া এনজিআরআইয়ের গবেষকরা Staphylococcus aureus, Pseudomonas aeruginosa, Enterococcus faecium, এবং Acinetobacter baumannii-সহ ESKAPE জীবাণুর সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স সম্পন্ন করেছেন।

ভিব্রিও কলেরার জীবন-রহস্য উন্মোচন

এনজিআরআই, আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআরবি,র ইমেরিটাস সায়েন্টিস্ট অধ্যাপক ড. ফেরদৌসি কাদরীর নেতৃত্বে পরিচালিত একটি যুগান্তকারী গবেষণা এটি। বাংলাদেশের ছয়টি জেলার হাসপাতালে ভর্তি ডায়রিয়া রোগীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ২০০টির বেশি ভিব্রিও কলেরা জীবাণুর জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়েছে। এ গবেষণা যুক্তরাজ্যের গ্লোবাল চ্যালেঞ্জেস রিসার্চ ফান্ডের আড়াই লাখ পাউন্ড অনুদানে সম্পন্ন হয়। এতে অংশ নেয় নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণা দল। এ গবেষণায় জিনোমিক বিশ্লেষণ, ক্লিনিক্যাল উপসর্গ (যেমন বমি, পেটব্যথা, মলের পরিমাণ, ডিহাইড্রেশন) এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহারের মাধ্যমে গবেষকরা দেখিয়েছেন, রোগের তীব্রতা জীবাণুর জিনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। গবেষণায় শনাক্ত হয়েছে যে নির্দিষ্ট কিছু জিন, যেমন dapF, gshB, fabV, clpS, add, pckA, luxR, rpoS, tufB ইত্যাদি ডায়রিয়ার সময়, উপসর্গের তীব্রতা ও রোগীর অবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

বিশেষভাবে dapF জিনের কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়া রোগীদের মধ্যে ডিহাইড্রেশন ও অতিরিক্ত মলত্যাগের ঘটনা বেশি দেখা গেছে। fabV জিনে একটি নির্দিষ্ট রূপান্তরের (His149) সঙ্গে ডায়রিয়ার সময় এবং উপসর্গের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। একইভাবে gshB জিন জীবাণুর অন্ত্রের পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষমতা বাড়ায়, যা রোগের গভীরতা বাড়াতে পারে। এ গবেষণার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ভিব্রিও কলেরা জীবাণুর জিনগত গঠন ও মানুষের শরীরে উপসর্গের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা, টার্গেটেড ভ্যাকসিন ও ওষুধ এবং উন্নত রোগ নির্ণয় পদ্ধতির পথ সুগম হবে। গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে এবং বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশনস জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বৈশ্বিক কলেরা নিয়ন্ত্রণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কোলন ক্যান্সারের বিশেষায়িত চিকিৎসার দ্বার উন্মোচন

এনজিআরআই সম্প্রতি বাংলাদেশে কোলন ক্যান্সারের ওপর নেক্সট জেনারেশন সিকোয়েন্সিং (এনজিএস) পরিচালনা করেছে। এ গবেষণায় ২৪টি টিউমার নমুনার ৫০টি জিনের মিউটেশন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যেখানে বাংলাদেশী রোগীদের ক্ষেত্রে FGFR3, APC, TP53, CDKN2A এবং RET জিনের মিউটেশনের উচ্চ প্রকোপ পাওয়া গেছে। সাধারণত ক্যান্সারের ক্ষেত্রে মিউটেশন (ডিএনএ ক্রমের পরিবর্তন) একেকজন রোগীর একেক রকম হয়ে থাকে। এ গবেষণার ফলে বাংলাদেশী রোগীদের জন্য পার্সোনালাইজড মেডিসিনের মাধ্যমে নির্ভুল চিকিৎসা দেয়া সম্ভব। গবেষকরা জানান, কোষের মধ্যে জেনেটিক পরিবর্তনের কারণেই ক্যান্সার হয়। এ পরিবর্তন সবার জন্য এক রকম নয়। নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে উন্নত দেশগুলো ওষুধ তৈরি করে, যা সব রোগীর জন্য শতভাগ কার্যকরী না। কিন্তু এ গবেষণার ফলে বাংলাদেশী ক্যান্সার রোগীর জন্য আরো সুনির্দিষ্ট ওষুধ তৈরি করা সম্ভব।

এছাড়া গ্লিওব্লাস্টোমা ক্যান্সারের জীবন-রহস্য উন্মোচন করেছেন এনজিআরআইয়ের গবেষকরা। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল (এনআইএনএস) ও লাইফ সায়েন্সেসের ডিন অধ্যাপক দীপক কুমার মিত্র যৌথভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করছেন। এ গবেষণার লক্ষ্য হলো বাংলাদেশী গ্লিওব্লাস্টোমা রোগীদের প্রাথমিক শনাক্তকরণ এবং পার্সোনালাইজড মেডিসিনের জন্য জনসংখ্যা-নির্দিষ্ট বায়োমার্কার তৈরি করা।

পয়োনিষ্কাশিত পানিতে কভিড, চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু শনাক্ত

প্রথমবারের মতো দেশে পয়োনিষ্কাশিত পানিতে ‘সার্স-কভ-২’ (SARS-CoV-2)-এর জেনেটিক ম্যাটেরিয়ালের উপস্থিতি এনজিএরআইয়ের গবেষকরাই চিহ্নিত করেছেন। এর মাধ্যমে কোনো এলাকার জনগোষ্ঠীর মাঝে কভিড-১৯ মহামারী রয়েছে কিনা সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বৈজ্ঞানিক গবেষণা সাময়িকী সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্টে এটি প্রকাশিত হয়। এনজিআরআই চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু ভাইরাসসহ পুনরুত্থিত আদি ভাইরাল প্যাথোজেনগুলোর সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রক্রিয়া শুরু করছে, যার মাধ্যমে কোনো এলাকার পয়োনিষ্কাশিত পানিতে কী পরিমাণ চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু ভাইরাস রয়েছে তা শনাক্তের মাধ্যমে আগাম সতর্কতা দেয়া সম্ভব হবে। গবেষকরা জানান, কোনো এলাকায় যখন রোগের প্রাদুর্ভাব হয় তখন এর কিছুদিন আগেই পয়োনিষ্কাশিত পানিতে তা চলে আসে। আমাদের পরিকল্পনা এ গবেষণার মাধ্যমে আগাম সতর্কতা দেয়ার একটি প্রক্রিয়ার উন্নয়ন করা।

NGRI-02

এনএসইউ জিনোম রিসার্চ ইনস্টিটিউটে গবেষকরা ছবি: এনএসইউ

গবেষকদের কথা

এনএসইউর স্কুল অব হেলথ অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সের ডিন অধ্যাপক ড. দিপক কুমার মিত্র বলেন, ‘ প্রতিষ্ঠানটি দেশে জিনোম-সংক্রান্ত গবেষণায় পথিকৃৎদের অন্যতম। গত কয়েক বছরে এনজিআরআই দেশী-বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শক্তিশালী সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। জিনোমিকস গবেষণায় আমাদের অব্যাহত অগ্রযাত্রা বাংলাদেশকে বৈশ্বিক গবেষণার মানচিত্রে স্থান করে দিয়েছে। আমরা জাতীয় প্রাধান্যপ্রাপ্ত এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কার্যকর গবেষণায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

এনজিআরআইয়ের পরিচালক ড. মুহম্মদ মাকসুদ হোসেন বলেন, ‘দেশে গবেষণার অগ্রগতি সত্ত্বেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ এখনো গবেষকদের পথকে কঠিন করে তুলছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আন্তর্জাতিক অনুদান গ্রহণ ও ব্যবহার প্রক্রিয়ার জটিলতা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য আন্তর্জাতিক অনুদান গ্রহণের অনুমোদন পেতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি থেকে অনুমতি নিতে দীর্ঘ সময় লাগে। এটি অনেক ক্ষেত্রে দাতা সংস্থাকে নিরুৎসাহিত করে এবং গবেষকদের অনুদান প্রস্তাব লেখার আগ্রহও কমিয়ে দেয়। এছাড়া গবেষণা সরঞ্জাম ও রি-এজেন্ট আমদানির উচ্চ খরচও একটি চ্যালেঞ্জ। দেশে এ উপকরণগুলো আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ও করসহ তিন গুণ পর্যন্ত বেশি খরচ হয়, যা উচ্চমানের গবেষণা পরিচালনার জন্য বড় বাধা। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সরঞ্জাম ও রি-এজেন্ট আমদানির ক্ষেত্রে কর মওকুফ বা বিশেষ অনুমতি প্রদান করা উচিত।’

অব্যাহত থাকবে সাফল্যধারা

এনএসইউ উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী বলেন, ‘দেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক জিনোম গবেষণা ইনস্টিটিউট হিসেবে এনজিআরআইয়ের সাফল্যে আমরা গর্বিত। বিশ্বমানের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনায় বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পরিবেশ নিশ্চিত করে আসছে। ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিওটি চেয়ারম্যান আজিমউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এনএসইউ শুরু থেকেই গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বরাবরের মতোই গবেষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা, সুযোগ এবং স্বাধীনতা নিশ্চিত করে আসছি। ভবিষ্যতেও আমরা জ্ঞান, উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায় নেতৃত্ব দেয়ার এ যাত্রা অব্যাহত রাখব।’