অধ্যাপক ড. মীর আজাদ। ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের প্রধান। সিএসই বিভাগের অধীনেই দেয়া হয় এমএসসি ইন সাইবার সিকিউরিটি ডিগ্রি। অধ্যাপক মীর সম্প্রতি সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা, ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে।

সাইবার সিকিউরিটি বলতে আসলে কী বোঝায় এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?

সাইবার সিকিউরিটি হলো ডিজিটাল সিস্টেম, নেটওয়ার্ক ও ডাটাকে অননুমোদিত অ্যাকসেস, আক্রমণ বা ক্ষতি থেকে রক্ষা করার প্রক্রিয়া। বর্তমানে ব্যক্তিগত তথ্য, আর্থিক লেনদেন, সরকারি ডাটা থেকে শুরু করে ক্রিটিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার—সবই ডিজিটালাইজড। সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে এসব তথ্য চুরি বা বিকৃত করা হলে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এমনকি জাতীয় নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ে। সাইবার নিরাপত্তার মূল লক্ষ্য তথ্যের সুরক্ষা দেয়া। ব্যক্তিগত, আর্থিক, স্বাস্থ্য বা করপোরেট তথ্য যাতে চুরি, পরিবর্তন বা ধ্বংস না হয়। সার্ভার, কম্পিউটার, মোবাইল ও ইন্টারনেট-সংযুক্ত যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ব্যক্তিগত তথ্য যেন অনুমতি ছাড়া কারো হাতে না পড়ে। তাই সাইবার সিকিউরিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাইবার সিকিউরিটিতে গবেষণা এবং উন্নয়নে সাম্প্রতিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা বা অগ্রগতি সম্পর্কে যদি বলতেন।

সাম্প্রতিক সময়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে সাইবার হুমকি শনাক্তকরণে বড় অগ্রগতি হয়েছে। এছাড়া কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের বিকাশ সাইবার নিরাপত্তাকে নতুন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার মুখে ফেলেছে। ব্লকচেইন টেকনোলজি ডাটা অখণ্ডতা নিশ্চিত করছে, আর জিরো-ট্রাস্ট আর্কিটেকচার ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কে নিরাপত্তা বাড়াচ্ছে। এছাড়া র‍্যানসমওয়্যার ও ফিশিং আক্রমণ মোকাবেলায় নতুন নতুন পদ্ধতি গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু।

বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তা শিক্ষার বর্তমান অবস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে স্নাতক ডিগ্রির অভাব প্রসঙ্গে আপনার মতামত?

বাংলাদেশে সাইবার হামলা বাড়লেও এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ সীমিত। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে স্নাতক ডিগ্রির অভাবে দক্ষ কর্মী তৈরিতে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি বা সাম্প্রতিক সাইবার হামলার সতর্কতা প্রমাণ করে, এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন। আমরা এমএসসি ইন সাইবার সিকিউরিটি চালু করলেও স্নাতক পর্যায়ে ডিগ্রি চালু করা জরুরি। এতে শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক স্তর থেকেই প্রশিক্ষিত হবে।

এমএসসি ইন সাইবার সিকিউরিটি কোর্সে কী কী পড়ানো হয়?

ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে আমাদের কোর্সে নেটওয়ার্ক সিকিউরিটি, ক্রিপ্টোগ্রাফি, এথিক্যাল হ্যাকিং, ম্যালওয়ার অ্যানালাইসিস, ডিজিটাল ফরেনসিক্স, আইটি ল ও সাইবার ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট শেখানো হয়। পাশাপাশি ক্লাউড সিকিউরিটি, আইওটি সিকিউরিটি এবং বাস্তব কেস স্টাডির মাধ্যমে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

ভর্তির যোগ্যতা কী? কারা পড়তে পারবেন?

সাইবার সিকিউরিটি প্রোগ্রামে কম্পিউটার সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং, আইসিটি বা সমতুল্য বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারীরা আবেদন করতে পারবেন। এছাড়া প্রোগ্রামিং ও নেটওয়ার্কিংয়ে বেসিক জ্ঞান থাকা বাধ্যতামূলক। কিছু ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে অগ্রাধিকার দেয়া হয়।

দেশে-বিদেশে ক্যারিয়ার সম্ভাবনা কেমন? চাকরি কোথায়?

সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞদের চাহিদা বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশে ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্স, আইটি ফার্ম, সরকারি প্রতিষ্ঠান (যেমন সাইবার ক্রাইম ইউনিট) এবং ডিফেন্স সেক্টরে চাকরির সুযোগ আছে। বিদেশে সাইবার সিকিউরিটি কনসালট্যান্ট, পেনেট্রেশন টেস্টার বা সিকিউরিটি আর্কিটেক্ট হিসেবে ক্যারিয়ার গড়া যায়। এছাড়া গ্লোবাল টেক জায়ান্টস গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজনে (থ্রেট রিসার্চ টিম) ভালো ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া কনসাল্টিং ফার্ম কেপিএমজি এবং ডেলয়েটের মতো বিশ্বের বৃহত্তম পেশাদার পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থায় অডিট, ট্যাক্স এবং পরামর্শ পরিষেবা প্রদান করেন একজন সাইবার অডিটর। পালো আল্টো নেটওয়ার্কস, ক্রাউডস্ট্রাইক, ফায়ারআইয়ের মতো সিকিউরিটি ফার্মে সাইবার বিশেষজ্ঞের চাহিদা রয়েছে।

দেশে স্নাতক ডিগ্রি চালু করতে প্রতিবন্ধকতা কোথায়?

একটি উন্নয়নশীল ও দ্রুত ডিজিটাল হয়ে ওঠা দেশের প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ স্নাতক ডিগ্রি চালু না হওয়াটা একটি বড় সীমাবদ্ধতা। যদিও কিছু বিশ্ববিদ্যালয় কিছু কোর্স বা মাইনর ট্র্যাক হিসেবে বিষয়টি পড়াচ্ছে, তবুও স্বতন্ত্র ব্যাচেলর ইন সাইবার সিকিউরিটি ডিগ্রি প্রোগ্রাম এখনো দৃষ্টিগোচর নয়। চালু না হওয়ার জন্য প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো দক্ষ ফ্যাকাল্টি ও ল্যাব সুবিধার অভাব। এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত শিক্ষক কম, আর হাইএন্ড ল্যাব স্থাপনে বিনিয়োগ প্রয়োজন। এছাড়া কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট ও ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সমন্বয় জরুরি। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা বাড়ালে এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পার্টনারশিপ করলে এ সমস্যা কাটানো সম্ভব। সাইবার সিকিউরিটি এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা ও গবেষণার প্রসার ঘটাতে হবে, নতুবা ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হবে।