পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং (পিএমই) হলো প্রকৌশল বিজ্ঞানের একটি বিশেষায়িত শাখা। যেখানে নিরাপদ, দক্ষ ও পরিবেশসম্মত পদ্ধতিতে ভূগর্ভস্থ থেকে পেট্রোলিয়াম (ক্রুড অয়েল) এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের অনুসন্ধান, ড্রিলিং, উত্তোলন, প্রক্রিয়াকরণ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, নকশা ও প্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে কাজ করা। পেট্রোলিয়াম এবং মাইনিং ইঞ্জিনিয়াররা ভূগর্ভস্থ খনিজ ও গ্যাসের সম্ভাব্য ক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ, কূপ খননের নকশা ও পরিচালনা, রিজার্ভার থেকে মজুদ নিরূপণ এবং সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিতকরণে কাজ করেন। এছাড়া উত্তোলিত তেল ও গ্যাস প্রক্রিয়াজাত করা, উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ পরিবহন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে টেকসই প্রযুক্তির প্রয়োগ তাদের মূল দায়িত্ব।
২০০৪ সালে বাংলাদেশে পেট্রোলিয়াম ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ প্রথম চালু হয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি)। এরপর ২০১০ সালে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) এ বিভাগ চালু করে। মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি) ২০১৬ সালে পিএমই বিভাগটি চালু করে। বর্তমানে বাংলাদেশের মাত্র চারটি বিশ্ববিদ্যালয় পেট্রোলিয়াম ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি প্রদান করছে। বুয়েটে পেট্রোলিয়াম ও খনিজ সম্পদে মাস্টার্স প্রোগ্রাম চালু আছে।
একজন দক্ষ পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার হতে হলে শিক্ষার্থীদের গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও সিভিল বিষয়ে গভীর জ্ঞান, ভূতত্ত্ব ও খনিজবিদ্যা, ড্রিলিং প্রযুক্তি, রিজার্ভার ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন প্রকৌশল ও খনিজ উত্তোলন সম্পর্কিত ব্যবহারিক দক্ষতা থাকা জরুরি। কম্পিউটার সফটওয়্যার, সিমুলেশন টুলস, জিআইএস, মডেলিং টেকনিক এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা একজন প্রকৌশলীকে প্রতিযোগিতামূলক করে। সমস্যা সমাধান, বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাশক্তি, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, দলগত কাজ, যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ এবং পরিবেশ ও নিরাপত্তা সচেতনতা পেশাগত যোগ্যতা সমৃদ্ধ করে।
বাংলাদেশে পিএমই ইঞ্জিনিয়াররা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম অনুসন্ধান ও উৎপাদন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স), পেট্রোবাংলা, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (সিজিএফএল), বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল), গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডে (জিটিসিএল) তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন, সরবরাহ এবং বিতরণে কাজ করেন। খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও খনন পরিচালনা করে বাংলাদেশ খনিজ সম্পদ উন্নয়ন বোর্ড। এছাড়া বহুজাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানি শেল, বিদেশী গ্যাস উৎপাদক কোম্পানি শেভরন, ব্রিটিশ তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি কেয়ার্ন এনার্জি এবং দেশীয় খনিজ/খনি কোম্পানিও উল্লেখযোগ্য। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি, ফুলবাড়ী ও দিনাজপুরের খনিজ প্রকল্প, সিলেটের চুনাপাথর, বালি ও সিলিকা বালির খনি গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সিমেন্ট ও সার শিল্পেও কর্মসংস্থান রয়েছে এ প্রকৌশলীদের। গবেষণা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে পিএমই বিভাগ এবং বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষার্থীরা ইন্টার্নশিপ, গবেষণা প্রকল্প ও ক্ষেত্রভিত্তিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে পেশাগত দক্ষতা অর্জন করে দেশে ও বিদেশে সফলতার স্বাক্ষর রাখছে।
বিদেশে প্রকৌশলীরা শেল, যুক্তরাষ্ট্রের এক্সনমোবিল, শেভরন, ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি), ফ্রান্সের টোটাল এনার্জিসে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন ও ড্রিলিংয়ে নিযুক্ত থাকেন। খনিজ খাতে কয়লা, লোহা, স্বর্ণ, তামা, বক্সাইট ও রূপা উত্তোলন, প্রক্রিয়াকরণ, খনিজ অনুসন্ধান, খনন পরিকল্পনা এবং নিরাপত্তা ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা করেন তারা। শক্তি খাতে গ্যাসভিত্তিক, কয়লাভিত্তিক ও নবায়নযোগ্য শক্তি প্লান্টে উপদেষ্টা বা প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন। পরামর্শ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি যেমন যুক্তরাষ্ট্রের বেকটেল, ফ্লুর করপোরেশন, জেকবস সলিউশনস, অস্ট্রেলিয়ার ওর্লি লিমিটেডে তারা প্রকল্প পরিকল্পনা, ডিজাইন ও পরিবেশ মূল্যায়ন সম্পাদন করে। গবেষণা ও একাডেমিক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ও টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে নতুন খনি প্রযুক্তি, রিজার্ভার মডেলিং ও তেল-গ্যাস উত্তোলন কৌশল নিয়ে কাজ করেন। এছাড়া ইউএনডিপি, বিশ্বব্যাংক ও এডিবিতে প্রকল্প ও নীতি পরিকল্পনায় অংশগ্রহণ করেন।
এ সেক্টরে বহুমুখী সুযোগ রয়েছে। পিএমই ইঞ্জিনিয়াররা মাস্টার্স ও পিএইচডি করে রিজার্ভার ইঞ্জিনিয়ারিং, অফশোর ড্রিলিং, খনিজ প্রক্রিয়াকরণ বা শক্তি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ হতে পারেন। সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার, প্রকল্প ব্যবস্থাপক, উৎপাদন ম্যানেজার বা টেকনিক্যাল কনসালট্যান্ট হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে পারেন। তারা পরামর্শক, নিজস্ব প্রকল্প পরিচালনা বা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বহুজাতিক কোম্পানিতে অংশ নিতে পারেন। এছাড়া শিক্ষকতা, প্রশিক্ষণ ও নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রচুর সুযোগ রয়েছে।
অধ্যাপক ড. মো. তোফায়েল আহাম্মদ: চেয়ারম্যান, পেট্রোলিয়াম ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়










