‘এটা একেবারেই নির্লজ্জ কাজ!’ ফোনের ওপার থেকে এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন মার্কিন জীবাশ্মবিদ প্রফেসর পল সেরেনো। নাইজারে পাওয়া মঙ্গলগ্রহের বিরল উল্কাপিণ্ডটি নিউইয়র্কে নিলামে বিক্রি হওয়ার খবরে ক্ষুদ্ধ তিনি। সেরেনোর মতে, এটি এখনই নাইজারে ফিরিয়ে দেয়া উচিত।

উল্কাপিণ্ডটির নাম এনডব্লিউ ১৬৭৮৮, যার ওজন প্রায় ২৫ কেজি (প্রায় ৫৪ পাউন্ড)। এটি বিক্রি হয়েছে ৫ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৬৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে নাইজারের সাহারা মরুভূমিতে উল্কাপিণ্ডটি আবিষ্কৃত হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, একটি বিশাল গ্রহাণুর আঘাতে এটি মঙ্গলগ্রহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রায় ২২ কোটি ৫০ লাখ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীতে এসে পড়ে। নিলাম আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠান সদবিস জানিয়েছে, নিলামে এর সর্বশেষ দর ছিল ৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু কর ও অন্যান্য ফি-সহ মোট মূল্য দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার। ক্রেতা ও বিক্রেতা দুজনের পরিচয়ই গোপন রাখা হয়। তবে এই অর্থের কোনো অংশ নাইজার পেয়েছে কিনা, তা স্পষ্ট নয়।

উল্কাপিণ্ড দীর্ঘদিন ধরে মানুষের কৌতূহল ও শ্রদ্ধার বিষয়—কখনো ধর্মীয় বস্তু, কখনো প্রদর্শনীর কৌতূহল, আর সাম্প্রতিক কালে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিরলতা ও সৌন্দর্যের ভিত্তিতে এর বাজারদর অনেকটা শিল্পকর্মের মতোই।

প্রথমে নিউইয়র্কে উল্কাপিণ্ডটির জনসমক্ষে প্রদর্শনীতে সাড়া জাগে। কিন্তু শিগগিরই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—এটি কীভাবে নিলামঘরে পৌঁছাল? নাইজার সরকারও সন্দেহ প্রকাশ করে, এর রফতানি বৈধ ছিল কিনা এবং অবৈধ আন্তর্জাতিক পাচারের আশঙ্কা তুলে তদন্ত শুরু করে।

ইতালির একটি গবেষণাপত্র অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর সাহারা মরুভূমির আগাদেজ অঞ্চলে, চিরফা ওয়েসিস থেকে প্রায় ৯০ কিমি পশ্চিমে, এক অজ্ঞাত উল্কাশিকারি এটি খুঁজে পান। পরে স্থানীয়রা এটি এক আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেন। তারপর এটি ইতালির আরেজ্জো শহরের একটি ব্যক্তিগত গ্যালারিতে যায়, যেখানে ফ্লোরেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এর গঠন ও উৎস নিয়ে গবেষণা করেন। সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য এটি ইতালিতেও প্রদর্শিত হয়।

গত মাসে নিউইয়র্কে প্রদর্শিত হওয়ার সময় ইতালিতে গবেষণার জন্য দুটি অংশ রেখে বাকিটুকু নিলামে তোলা হয়। সদবিস জানায়, উল্কাপিণ্ডটি আন্তর্জাতিক সব প্রক্রিয়া মেনে রফতানি করা হয়েছে এবং প্রতিটি ধাপে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক ছিল। তবে নাইজারের তদন্তের খবর পেয়ে তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।

ইউনেস্কোসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক চুক্তি এসব সম্পদের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। তবে উল্কাপিণ্ড নিয়ে নিয়মে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। ফলে প্রতিটি দেশকে নিজস্বভাবে আইন নির্ধারণ করতে হয়। নাইজার ১৯৯৭ সালে ঐতিহ্য রক্ষার আইন করলেও তাতে উল্কাপিণ্ডের কথা নেই। সরকারও স্বীকার করেছে—উল্কাপিণ্ড নিয়ে সুনির্দিষ্ট আইন নেই, যা সদবিসও উল্লেখ করেছে। তবু প্রশ্ন থেকেই যায়—এত বড় ও ভারী একটি বস্তু কীভাবে কর্তৃপক্ষের চোখ এড়িয়ে দেশ ছাড়ল!

একই সমস্যা দেখা দিয়েছে মরক্কোতেও। সাহারার বিশাল অংশজুড়ে হাজারেরও বেশি উল্কাপিণ্ড পাওয়া গেছে। ২০ বছরেরও বেশি আগে শিথিল নিয়ম আর স্থিতিশীল পরিবেশের কারণে সেখানে এক ধরনের ‘মরুভূমির সোনার খনি’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

মরক্কোর ভূতত্ত্ববিদ প্রফেসর হাসনা চেন্নাউই আওদজেহানে গত ২৫ বছর ধরে চেষ্টা করছেন এই মহাজাগতিক সম্পদ দেশের ভেতরেই রাখতে। তবুও, ২০১১ সালে মঙ্গল থেকে আসা ৭ কেজি ওজনের তিসসিন্ত উল্কাপিণ্ড সংগ্রহের পর বর্তমানে মরক্কোতে এর মাত্র ৩০ গ্রাম অবশিষ্ট আছে। বাকিটা বিশ্বের নানা জাদুঘরে ছড়িয়ে রয়েছে।

বিবিসি অবলম্বনে