১৯৪০ সাল। ইউরোপের আকাশ নাৎসি জার্মানির বোমারু বিমানের গর্জনে প্রকম্পিত। ব্রিটেন তখন একাকী লড়াই করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৫ এর সদর দপ্তরে এক অভাবনীয় সত্য উন্মোচিত হলো। তারা আবিষ্কার করলেন, হিটলারের গোয়েন্দা সংস্থা আব্যুয়ের ব্রিটেনে যে গুপ্তচর পাঠাচ্ছে, তাদের বেশির ভাগ আনাড়ি ও অপ্রশিক্ষিত। হয় তারা ধরা পড়ছে, না হয় ভয়ে নিজেরাই আত্মসমর্পণ করছে।

এ পরিস্থিতি দেখে ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মাথায় এক দুর্ধর্ষ বুদ্ধি খেলে গেল। তারা ভাবলেন, মেরে না ফেলে যদি এ গুপ্তচরদের মাধ্যমেই জার্মানিকে ভুল তথ্য পাঠানো যায়? জন্ম নিল ইতিহাসের সবচেয়ে সফল গোয়েন্দা অপারেশন ‘অপারেশন ডাবল ক্রস’।

অপারেশনটি বাস্তব জীবনের এমন এক থ্রিলার যা ফিকশনকেও হার মানায়। সেই রোমাঞ্চকর ইতিহাস নিয়ে বিশ্বজুড়ে অসংখ্য বই লেখা হয়েছে এবং কালজয়ী সিনেমা ও সিরিজ নির্মিত হয়েছে। এ বিষয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও জনপ্রিয় বই বেন ম্যাকইনটায়ারের ‘ডাবল ক্রস: দ্য ট্রু স্টোরি অব দ্য ডি-ডে স্পাইজ’। যেখানে লেখক অত্যন্ত চমৎকারভাবে পাঁচ প্রধান ডাবল এজেন্টের জীবনের ঝুঁকি ও বিচিত্র স্বভাব তুলে ধরেছেন। এছাড়া মিশনটির সঙ্গে যুক্ত জন মাস্টারম্যান লিখেছেন ‘দ্য ডাবল ক্রস সিস্টেম’। এজেন্টদের ব্যক্তিগত জীবনের ওপর ভিত্তি করে বিখ্যাত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ডাবল এজেন্ট গার্বোর জীবন নিয়ে লেখা ‘গার্বো: দ্য স্পাই হু সেভড ডি-ডে’ এবং ডাসকো পপভের স্মৃতিচারণমূলক বই ‘ইনটু দ্য মিরর’।

সিনেমার জগতে অপারেশন ডাবল ক্রসের ছায়া পাওয়া যায় জেমস বন্ড সিরিজে। লেখক ইয়ান ফ্লেমিং এজেন্ট পপভের ক্যাসিনো জীবন ও সাহস দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে বন্ড চরিত্রটি তৈরি করেছিলেন। ১৯৯৩ সালে নির্মিত ‘ডাবল ডিসেপশন’ সিনেমাটি সরাসরি এই অপারেশনের প্রেক্ষাপটে তৈরি। এছাড়া ‘দ্য ম্যান হু নেভার ওয়াজ’ সিনেমাটি সরাসরি ডাবল ক্রস না হলেও সংশ্লিষ্ট দলের অন্য এক ধোঁকা দেয়ার মিশন নিয়ে নির্মিত। সাম্প্রতিক কালে বিবিসি নির্মাণ করেছে দারুণ এক তথ্যচিত্র, যেখানে এজেন্টদের বুদ্ধির লড়াইকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

২০ নম্বর কমিটি ও ‘প্যাশন প্যান্টস’

এই অপারেশনের মূল মস্তিষ্ক ছিলেন টমাস আরগিল রবার্টসন, যাকে সবাই ‘প্যাশন প্যান্টস’ নামে চিনত। অদ্ভুত এ ডাকনামের কারণ ছিল তার পরনের বিশেষ রেজিমেন্টাল ট্রাউজার। রবার্টসন ও অক্সফোর্ডের ইতিহাসের অধ্যাপক জন মাস্টারম্যান মিলে গঠন করলেন এক্সএক্স কমিটি। রোমান সংখ্যায় এর মানে ২০, যা আসলে ‘ডাবল ক্রস’ বা দুবার ধোঁকা দেয়ার প্রতীক। তাদের লক্ষ্য ছিল জার্মানদের পাঠানো এজেন্টদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের মাধ্যমেই হিটলারকে ভুল পথে চালিত করা।

বাস্তবের চেয়েও রোমাঞ্চকর বিচিত্র এক গোয়েন্দা বাহিনী

Double cross juan pujol garcia

জুয়ান পুজোল গার্সিয়া

অপারেশন ডাবল ক্রসের এজেন্টরা কোনো পেশাদার সৈনিক ছিলেন না। ক্রিমিনাল, প্লে-বয়, জুয়াড়ি ও জেদি এক নারীর বিচিত্র এক সম্মিলন ছিল পুরো টিম।

গার্বো নামে পরিচিত জুয়ান পুজোল গার্সিয়া স্প্যানিশ যুবক, যার মুরগির খামার ব্যবসায় লাল বাতি জ্বলেছিল। কিন্তু তার ছিল অভিনয়ের সহজাত প্রতিভা। প্রথমে ব্রিটিশদের কাছে কাজ চাইলেও তারা গার্বোকে ফিরিয়ে দেয়। এরপর তিনি জেদ করে জার্মানদের কাছে যান এবং বিশ্বাস করান যে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি করতে চান।

লিসবনে বসে জুয়ান শুধু একটি ব্রিটিশ মানচিত্র আর রেলওয়ের সময়সূচি দেখে এমন সব রিপোর্ট তৈরি করতে লাগলেন, যা দেখে জার্মানরা মুগ্ধ হয়ে গেল। পরে ব্রিটিশরা এ প্রতিভা দেখে তাকে নিজেদের দলে টেনে নেয় এবং কোডনেম দেয় ‘গার্বো’। তিনি একা হাতে ২৬ জন কাল্পনিক সাব-এজেন্টের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করেন। জার্মানরা ভাবত তাদের এ বিশাল নেটওয়ার্ক ব্রিটেনজুড়ে ছড়িয়ে আছে, অথচ বাস্তবে তাদের কারোরই অস্তিত্ব ছিল না।

Double cross Dusko popov

দুস্কো পপভ

এক সার্বিয়ান ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান দুস্কো পপভ। সুদর্শন, উচ্চশিক্ষিত ও চরম নারীসঙ্গলোভী মানুষটির প্রতি জার্মানদের ছিল অগাধ বিশ্বাস। তার কোডনেম ছিল ‘ট্রাইসাইকেল’। ধারণা করা হয়, তার ব্যক্তিগত জীবনে সবসময় অন্তত দুজন নারী থাকতেন বলেই এ নাম। পপভ ছিলেন অত্যন্ত সাহসী। তিনি ডাবল এজেন্ট হিসেবে কাজ করার সময়ও ক্যাসিনোতে গিয়ে লাখ লাখ টাকা ওড়াতেন। তার এ বেপরোয়া জীবনই ছিল তার সেরা ছদ্মবেশ। বিখ্যাত লেখক ইয়ান ফ্লেমিং তাকে দেখেই তার অমর চরিত্র ‘জেমস বন্ড’ সৃষ্টি করেছিলেন।

Double cross- eddie chapman

এডি চ্যাপম্যান

এডি চ্যাপম্যান ছিলেন দাগী অপরাধী ও সিন্দুক চোর। যুদ্ধের সময় তিনি চ্যানেল আইল্যান্ডে বন্দি ছিলেন। জার্মানরা তাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে নাশকতার জন্য ইংল্যান্ডে পাঠায়। কিন্তু চ্যাপম্যানের মনে কিছুটা দেশপ্রেম, আবার প্রাণ বাঁচানো ও অ্যাডভেঞ্চার লিপ্সা জেগে ওঠে। তিনি ইংল্যান্ডে নেমেই এমআই-৫-এর কাছে ধরা দেন। তিনি ব্রিটিশদের হয়ে কাজ করে জার্মানদের এমনভাবে বোকা বানিয়েছিলেন যে নাৎসিরা তাকে ‘আয়রন ক্রস’ পদক দিয়ে সম্মানিত করে। খামখেয়ালি জীবনের জন্য তার কোডনেম দেয়া হয়েছিল ‘জিগজ্যাগ’।

অপারেশন ফরটিটিউড: ডাবল ক্রসের চূড়ান্ত পরীক্ষা

১৯৪৪ সাল। মিত্রবাহিনী ইউরোপ পুনরুদ্ধারের জন্য ‘ডি-ডে’ বা নর্মান্ডি ল্যান্ডিংয়ের পরিকল্পনা করছে। কিন্তু সমস্যা একটাই—জার্মানরা জানে যে আক্রমণ হবে। আবার সুবিধা হলো, কোথায় হবে সেটা তারা জানে না। হিটলারের ধারণা ছিল ফ্রান্সের ‘পা দ্য ক্যালে’ দিয়ে আক্রমণ হবে, কারণ সেটি ছিল ইংল্যান্ড থেকে সবচেয়ে কাছে।

এখানেই ডাবল ক্রস কমিটি তাদের সেরা চালটি চালল। এই সাব-অপারেশনের নাম দেয়া হলো ‘অপারেশন ফরটিটিউড’। গার্বো ও তার পুরো নেটওয়ার্ক জার্মানিকে একের পর এক বার্তা পাঠাতে লাগল, মিত্রবাহিনী আসলে একটি বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তুলছে, পা দ্য ক্যালে দিয়েই আক্রমণ করবে। এমনকি ব্রিটিশরা সেখানে প্রচুর ডামি বা নকল ট্যাংক আর কাঠের যুদ্ধজাহাজ সাজিয়ে রাখে যাতে জার্মান উড়োজাহাজ থেকে দেখলে মনে হয় সত্যিই সেখানে বিশাল বাহিনী জড়ো হয়েছে।

কুকুর যখন যুদ্ধের ভাগ্যবিধাতা: লিলি সার্গেইভ

Double cross lily sergeuvei

লিলি সার্গেইভ

অপারেশন ডাবল ক্রসের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তটি আসে লিলি সার্গেইভ বা এজেন্ট ট্রেজারকে নিয়ে। ফরাসি এ নারীকে ব্রিটিশরা ডাবল এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করছিল। কিন্তু লিলির কাছে তার কুকুর ব্যাবস ছিল প্রাণের চেয়ে প্রিয়। যখন লিলিকে লন্ডন পাঠানো হয়, তখন কোয়ারেন্টাইন আইনের কারণে তার কুকুরটিকে জিব্রাল্টারে রেখে আসতে হয়। দুর্ভাগ্যবশত কুকুরটি সেখানে মারা যায়।

লিলি বিশ্বাস করেছিলেন যে ব্রিটিশরা ইচ্ছা করে তার কুকুরটিকে মেরে ফেলেছে। ক্ষোভে ফেটে পড়ে হুমকি দেন যে ডাবল এজেন্টদের সব তথ্য জার্মানদের ফাঁস করে দেবেন তিনি। এমআই-৫-এর কর্মকর্তারা আতঙ্কে পড়ে গেলেন। যদি তথ্য ফাঁস হয়ে যেত, তবে নর্মান্ডি ল্যান্ডিংয়ে হাজার হাজার মিত্র সেনার মৃত্যু নিশ্চিত ছিল। শেষ পর্যন্ত অনেক বুঝিয়ে এবং তাকে শান্ত করে অপারেশনটি চালু রাখা হয়। গোয়েন্দা ইতিহাসে একে বলা হয়, একটি কুকুরের জন্য প্রায় ভেস্তে যাওয়া মহাযুদ্ধ।

বিজয়ের রহস্য: এনিগমা ও ডাবল ক্রস

ডাবল ক্রস কমিটির এ বিশাল সাফল্যের পেছনে ছিল আরো একটি গোপন রহস্য—এনিগমা। ব্রিটিশ কোডব্রেকাররা আগেই জার্মানদের গোপন সংকেত এনিগমা ভেঙে ফেলেছিলেন। এর ফলে ডাবল এজেন্টরা যখন জার্মানদের কোনো তথ্য পাঠাত, তখন জার্মানরা ফিরতি বার্তায় কী বলছে তা ব্রিটিশরা আগেই পড়ে ফেলত। এর মাধ্যমে তারা নিশ্চিত হতে পারত যে জার্মানরা তাদের এজেন্টদের বিশ্বাস করছে কিনা।

এমনও হয়েছে যে এমআই-৫ একজন এজেন্টকে দিয়ে ইচ্ছা করে ভুল তথ্য পাঠিয়েছে এবং কিছুক্ষণ পর এনিগমা ডিকোডিংয়ের মাধ্যমে তারা জানতে পেরেছে যে হিটলার স্বয়ং সেই তথ্যটি বিশ্বাস করেছেন!

শেষ দৃশ্য: ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ পরিহাস

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দেখা গেল, অপারেশন ডাবল ক্রস শুধু সফলই হয়নি, এটি জার্মান গোয়েন্দা সংস্থাকে আর্থিকভাবেও দেউলিয়া করে দিয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো, এ ডাবল এজেন্টদের চালানোর পুরো খরচ, বেতন এবং বোনাস পাঠিয়েছিল খোদ জার্মানরাই! অর্থাৎ ব্রিটিশ গোয়েন্দারা জার্মানদের অর্থ খরচ করেই জার্মানিকে যুদ্ধে পরাজিত করার পথ প্রশস্ত করেছিল।

অপারেশন ডাবল ক্রস প্রমাণ করেছিল যে যুদ্ধের জয়-পরাজয় কেবল কামানের গোলার ওপর নির্ভর করে না; বরং পর্দার আড়ালে থাকা কিছু রহস্যময় মানুষের ধূর্ততা আর বুদ্ধির ওপর নির্ভর করে। গার্বো যখন যুদ্ধের পর তার ‘আয়রন ক্রস’ এবং ব্রিটিশ ‘এমবিই’ দুটো পদকই তার ড্রয়ারে সাজিয়ে রাখছিলেন, তখন হয়তো তিনি নিজেই হেসেছিলেন ইতিহাসের এ চরম পরিহাস দেখে।