মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ। ১৯২৬ সালের ৩ জুন যুক্তরাষ্ট্রের নিওয়ার্ক শহরে জন্ম নেয়া এই কবি শুধু মার্কিন সাহিত্যের ইতিহাসে নন, বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের ইতিহাসেও একটি অনন্য স্থান দখল করে আছেন। আজ তার জন্ম শতবর্ষ পূর্ণ হলো।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের শরণার্থী সংকট নিয়ে লেখা অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিল যুদ্ধের এক নির্মম মানবিক চিত্র।

আজ জন্মশতবর্ষে গিন্সবার্গকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন কবিকে স্মরণ করা নয়। বরং এমন একজন সাহিত্যিককে স্মরণ করা— যিনি হাজার মাইল দূরের মানুষের দুর্ভোগকে নিজের ভাষায় বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিয়েছিলেন।

অ্যালেন গিন্সবার্গের শৈশব কেটেছে প্যাটারসনে। তার বাবা লুইস গিন্সবার্গ ছিলেন কবি ও শিক্ষক। মা নওমি গিন্সবার্গ ছিলেন রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এবং দীর্ঘদিন মানসিক অসুস্থতায় ভুগেছেন। পরিবারের এ অভিজ্ঞতা, বিশেষত মায়ের মানসিকভাবে স্থিত থাকার সংগ্রাম পরবর্তীকালে তার কবিতায় গভীর প্রভাব ফেলে।

উচ্চশিক্ষার জন্য অ্যালেন ভর্তি হন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে পরিচয় হয় জ্যাক কেরুয়াক, উইলিয়াম এস বারোজ ও নিল ক্যাসাডির মতো তরুণ লেখকদের সঙ্গে। এই বন্ধুত্ব থেকেই জন্ম নেয় বিংশ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী সাহিত্য আন্দোলন ‘বিট জেনারেশন’।

১৯৫০-এর দশকে বিট জেনারেশন ছিল আমেরিকার মূলধারার সামাজিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে এক ধরনের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ। দ্বিতীয় যুদ্ধোত্তর আমেরিকার ভোগবাদ, রক্ষণশীলতা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সমালোচনা ছিল এ আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু।

অ্যালেন গিন্সবার্গ এ আন্দোলনের সবচেয়ে পরিচিত কবি হয়ে ওঠেন। ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত তার কাব্যগ্রন্থ ‘হাউল অ্যান্ড আদার পয়েমস’। বইটি আমেরিকান সাহিত্যে এক বিস্ফোরণের জন্ম দেয়। কবিতার বিখ্যাত সূচনা—‘I saw the best minds of my generation destroyed by madness’। লাইনটি তৎকালীন প্রজন্মের হতাশা, মানসিক সংকট ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার প্রতীক হয়ে ওঠে।

অশ্লীলতার অভিযোগে বইটি নিয়ে মামলা হলেও আদালত শেষ পর্যন্ত এর সাহিত্যিক মূল্য স্বীকার করে। সেই রায় যুক্তরাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

গিন্সবার্গের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে কাদিস, রিয়েলিটি স্যান্ডউইচেস, প্লানেট নিউজ ও দ্য ফল অব আমেরিকা।

১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে অ্যালেন গিন্সবার্গ একাধিকবার ভারত সফর করেন। ভারতীয় দর্শন, আধ্যাত্মিকতা ও সংস্কৃতির প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানি বাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে লাখ লাখ বাঙালি ভারতে আশ্রয় নেয়। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী যশোর রোড ও আশপাশের এলাকায় বিশাল শরণার্থী শিবির গড়ে ওঠে।

কবিতাটি শরণার্থীদের দুর্ভোগের এক প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য। যেখানে আছে ফোলা পেটের শিশুদের কথা, ক্ষুধা ও রোগে জর্জরিত মানুষের কথা, আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা অসহায় মানুষের কথা। কবিতাটি শুধু মানবিক বেদনার বর্ণনা নয়। এতে তৎকালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের নীরবতা ও পাকিস্তানপন্থী অবস্থানের সমালোচনাও ছিল
allen1

১৯৫৯ সালের জুনে অ্যালেন গিন্সবার্গ

সেই সময় গিন্সবার্গ কলকাতায় অবস্থান করছিলেন। কবি ও সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে যশোর রোডের শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শন করেন তিনি। সেখানে যা দেখেন, তা অ্যালেনকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

হাজার হাজার ক্ষুধার্ত মানুষ, কলেরায় আক্রান্ত শিশু, বন্যায় বিধ্বস্ত শিবির, চিকিৎসাহীনতা এবং অনিশ্চয়তায় ভরা জীবন—এসব দৃশ্য তার মনে দাগ কাটে। সেই অনুভূতির অবিস্মণীয় অনুরণন হলো ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’।

কবিতাটি শরণার্থীদের দুর্ভোগের এক প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য। যেখানে আছে ফোলা পেটের শিশুদের কথা, ক্ষুধা ও রোগে জর্জরিত মানুষের কথা, আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা অসহায় মানুষের কথা। কবিতাটি শুধু মানবিক বেদনার বর্ণনা নয়। এতে তৎকালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের নীরবতা ও পাকিস্তানপন্থী অবস্থানের সমালোচনাও ছিল।

ওই সময় পশ্চিমা বিশ্বের অনেক মানুষই পূর্ব পাকিস্তানে কী ঘটছে তা জানতেন না। অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতা সেই বাস্তবতাকে আন্তর্জাতিক পাঠকের সামনে তুলে ধরে। ফলে মুক্তিযুদ্ধ ও শরণার্থী সংকট নিয়ে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে জর্জ হ্যারিসনের ‘বাংলা দেশ’ গান এবং জোয়ান বায়েজের প্রতিবাদী সংগীতের পাশাপাশি গিন্সবার্গের এ কবিতাও বিশেষভাবে স্মরণীয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ শুধু একটি কবিতা হয়ে থাকেনি; এটি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সাংস্কৃতিক দলিলে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে কবিতাটির একাধিক বাংলা অনুবাদ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ, শরণার্থী সংকট, সাহিত্য ও মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা ও গবেষণায় কবিতাটি আজও গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অনেকের কাছে এটি ইতিহাসের বইয়ের তথ্যের চেয়ে বেশি জীবন্ত, কারণ এতে ঘটনাগুলো একজন প্রত্যক্ষদর্শীর চোখে ধরা পড়েছে।

অ্যালেন গিন্সবার্গের এ কবিতার সাংস্কৃতিক যাত্রা নতুন মাত্রা পায় মৌসুমি ভৌমিকের গান ‘যশোর রোড’-এ। অবশ্য এটি প্রচলিত অর্থে গান নয়। বরং গান, আবৃত্তি, স্মৃতি, ইতিহাস এবং লোকসংগীতের সংমিশ্রণ বলা যায়। যা শ্রুতি ও দর্শনকে একীভূত করেছে।

অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতা ছিল একটি তাৎক্ষণিক মানবিক বিপর্যয়ের প্রতি সাড়া। আর মৌসুমী ভৌমিকের সংগীত সেই স্মৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বহন করে নিয়ে এসেছে।

১৯৯৭ সালের ৫ এপ্রিল নিউইয়র্ক শহরে মারা যান অ্যালেন গিন্সবার্গ, তখন সত্তর বছর বয়স তার। আর জন্মের একশ বছর পরও অ্যালেন গিন্সবার্গের অনমনীয় কণ্ঠস্বর আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সাহিত্য শুধু নান্দনিকতার বিষয় নয়; এটি কখনো কখনো ইতিহাসের সাক্ষী, মানবতার পক্ষে উচ্চারিত প্রতিবাদ এবং নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর এক শক্তিশালী মাধ্যম।