আকাশের দখল কার হাতে থাকবে? ১৯৬০-এর দশকে স্নায়ুযুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এ প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন দুই পক্ষের দ্বৈরথের মাঝে সাক্ষী হয়েছিল এমন এক গোয়েন্দা অভিযান, যা আধুনিক আকাশযুদ্ধের ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। এ গল্পের মূল চরিত্র লোভ অথবা ভয়ের কাছে পরাজিত এক ইরাকি পাইলট এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের অদম্য জেদ।

মস্কোর তুরুপের তাস মিগ-২১

১৯৫৯ সালে সোভিয়েত বিমান বাহিনীতে শামিল হয় মিগ-২১ জেট, যা ছিল আকাশযুদ্ধে মস্কোর তুরুপের তাস। মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো এর সঙ্গে এঁটে উঠতে পারত না। ফলে অস্ত্রের বাজারে বাড়তে থাকে মিগ-২১’র চাহিদা। আর উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্য খর্ব করতে কয়েকটি মিত্র দেশে এ জেট বিমান সরবরাহ করে মস্কো।

মস্কোর এ বিপজ্জনক নীতি আঁচ করে নিতে ইসরায়েলের বেশি সময় লাগেনি। উপসাগরীয় অঞ্চলে সবচেয়ে শক্তিশালী বিমান বাহিনী তৈরি করলেও মিগ-২১ তাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। বিষয়টি বুঝতে পেরে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গুরিয়েন মিগ-২১ প্রযুক্তি হস্তগত করতে সরাসরি যুদ্ধবিমান চুরির নির্দেশ দেন।

পরপর ব্যর্থতা: মিসরে ফাঁসি হয় ইসরায়েলি গুপ্তচরের

ওই সময়ে আরব দুনিয়ার দুটি দেশের আকাশবহরে ছিল মিগ-২১। মিসর ও ইরাক। মিসর থেকে যুদ্ধবিমান চুরির দায়িত্ব পায় জিন থমাস নামের এক এজেন্ট। তিনি দ্রুতই আদিব হান্না নামে কায়রোর এক জেট পাইলটের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আদিব জানান, ১০ লাখ ডলার ঘুসের বিনিময়ে মিগ-২১ ইসরায়েলে উড়িয়ে নিতে রাজি।

কিন্তু আদিব মূলত ইসরায়েলি গুপ্তচর ধরতে ফাঁদ পেতেছিল। তার দেয়া তথ্যানুযায়ী থমাসসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে মিসরীয় পুলিশ। পরে তাদের ফাঁসি হয়। এবার ইরাকি বিমান বাহিনীর দুই পাইলটকে বিপুল অর্থের লোভ দেখায় ইসরায়েলি গোয়েন্দারা। কিন্তু রাজি হননি তারা।

এ ঘটনার দুই বছর পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিরোধের জের মিসরীয় পাইলট ক্যাপ্টেন আব্বাস হেলমি ইয়াক-১১ বিমান নিয়ে ইসরায়েলে পালিয়ে যায়। এর দুই মাস পরই হেলমিকে হত্যা করা হয় দক্ষিণ আমেরিকায়। ধারণা করা হয়, এর সঙ্গে মিসরীয় গোয়েন্দারা জড়িত। অবশ্য ইয়াক-১১ ছিল নিছক প্রশিক্ষণ বিমান। আর পাইলট মারা যাওয়াতে ইসরায়েল বাড়তি কোনো তথ্যই পায়নি।

এক রহস্যময় প্রস্তাব

১৯৬৩ সাল। প্যারিসের ইসরায়েলি দূতাবাসে পা রাখেন ‘সালমান’ নামে এক ব্যক্তি। তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় এবং শক্তিশালী যুদ্ধবিমান মিগ-২১-এর একটি আস্ত কপি ইসরায়েলকে এনে দেয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। বিনিময়ে দাবি করেন মাত্র ১০ লাখ ডলার।

সালমান ছিলেন ইরাকের এক প্রভাবশালী ব্যক্তির ভৃত্য। তিনি ইসরায়েলি কূটনীতিককে একটি নম্বর দিয়ে বলেন, ‘বাগদাদে কাউকে পাঠান, এই নম্বরে ফোন করে জোসেফকে খুজুন। আর আমাদের ১০ লাখ ডলার তৈরি রাখুন।’

মোসাদের সংশয় ও ‘অপারেশন ডায়মন্ড’

তৎকালীন মোসাদ প্রধান মীর অমিত প্রথমে বিষয়টিকে টোপ বা ফাঁদ বলে সন্দেহ করেছিলেন। কিন্তু নিজেদের কাছে থাকা ফরাসি মিরাজ-৩-এর দুর্বলতা বিবেচনায় ঝুঁকি নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ব্লু-প্রিন্ট পাওয়াও যেখানে অসম্ভব, সেখানে আস্ত একটি যুদ্ধবিমান হাতে পাওয়া হবে গোয়েন্দা জগতের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় জয়। জন্ম নিল ‘অপারেশন ডায়মন্ড’।

জর্জ বেকন ও রহস্যময়ী লিসা ব্রাট

Stolen MiG-21- lisa brat

লিসা ব্রাট

মোসাদ এক এজেন্টকে ‘জর্জ বেকন’ ছদ্মনামে ব্যবসায়ী সাজিয়ে বাগদাদে পাঠায়। বেকন যোগাযোগ করেন জোসেফের সঙ্গে। এমনও বর্ণনা আছে, মারোনাইট খ্রিস্টান জোসেফ ছিলেন ইসরায়েলের স্লিপার এজেন্ট। তার ভাগ্নে মুনির রেদফা ইরাকি বিমান বাহিনীর মিগ-২১ পাইলট।

বলা হয়ে থাকে, সংখ্যালঘু খ্রিস্টান হওয়ার কারণে রেদফা ইরাকি বিমান বাহিনীতে বৈষম্যের শিকার হচ্ছিলেন। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন তিনি। মোসাদ এ সুযোগই গ্রহণ করে। রেদফাকে ১০ লাখ ডলার এবং তার পুরো ৪৩ জন সদস্যের বর্ধিত পরিবারের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়।

নিজের দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে রেদফার বিবেক বাধা দিচ্ছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে মীর অমিত ওয়াশিংটন গিয়ে সিআইএ পরিচালক রিচার্ড হেলমসের সঙ্গে দেখা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের আশ্বাস পাওয়ার পর রেদফা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। অভিযানের কিছুদিন আগে স্ত্রী-মেয়েকে নিয়ে প্যারিসে যান ওই ইরাকি জেট পাইলট। সেখানে পরিকল্পনার কথা স্ত্রীকে জানান রেদফা। এতে রেগে গিয়ে সব কিছু ফাঁস করে দেয়ার হুমকি দেন রেদফার স্ত্রী। কিন্তু পরে স্ত্রীকে রাজি করাতে পারেন তিনি।

তবে রেদফার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা সেবারই প্রথম ছিল না। এর আগে নারী এজেন্ট লিসা ব্রাটকে পাঠিয়েছিল মোসাদ। প্রথমে রেদফার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন তিনি। পরে তার হতাশা আর রাগের কথা শুনে মিগ-২১ চুরির টোপ ফেলেন। তার প্ররোচনায় প্যারিসে গিয়ে মোসাদ এজেন্টদের সঙ্গে দেখা করেন মুনির রেদফা।

১৯৬৫ সালের শেষের দিকে লিসা ব্রাট মার্কিন প্রসাধনসামগ্রী বা ফ্যাশন বিশেষজ্ঞের ছদ্মবেশে বাগদাদে প্রবেশ করেন। তার মূল লক্ষ্য ছিল মুনির রেদফার সঙ্গে এমনভাবে মেলামেশা করা যাতে কেউ সন্দেহ না করে। একটি উচ্চবিত্ত সামাজিক অনুষ্ঠানে লিসার সঙ্গে রেদফার প্রথম দেখা হয়। রেদফা তখন ইরাকি বিমান বাহিনীর একজন পোস্টার বয় বা উজ্জ্বল নক্ষত্র, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি ছিলেন অত্যন্ত একা ও বিমর্ষ। লিসা তার সেই মানসিক একাকিত্বকে পুঁজি করেন। তাদের মধ্যে একটি গভীর সখ্য তৈরি হয়, যা রেদফাকে ইরাকের বাইরে এক নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখাতে শুরু করে। লিসা যখন রেদফাকে মানসিকভাবে প্রভাবিত করছিলেন, ঠিক ওই সময়ই জর্জ বেকন রেদফার চাচা জোসেফের মাধ্যমে টেকনিক্যাল বিষয়গুলো গুছিয়ে নিচ্ছিলেন।

এমনও গল্প আছ, ১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণে যায় ১৫ জন ইরাকি পাইলট, যাদের একজন রেদফা। নারী এজেন্টদের ব্যবহার করে তাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে মোসাদ। প্রথম চেষ্টায় একজন রাজি না হলে তাকে হত্যা করা হয়। তবে পাইলট হত্যার পর ইরাক তার পাইলটদের দেশে ডেকে নিয়ে যায়। কিন্তু ফেরার সময় তিনজন পাইলটের সঙ্গে ফেরে তিন বান্ধবী, যারা মূলত মোসাদ এজেন্ট।

লিসা ব্রাট সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানা যায় না। তার একটি ছবি পাওয়া যায় অবশ্য। আরো বলা হয়, রেদফার আগে অন্য দুই পাইলটকেও রাজি করানোর চেষ্টা করে তাদের সঙ্গে আসা এজেন্টরা। কিন্তু তাদের কেউই রাজি না হওয়ায় হত্যা করা হয় দুজনকেই। এক্ষেত্রে রেদফা স্বেচ্ছায় কিংবা ভয়ে রাজি হন এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

১৯৬৬ সালের জুলাইয়ের দিকে লিসা বাগদাদ ত্যাগ করেন। এর ঠিক পরপরই রেদফা তার পরিবারকে নিয়ে ‘ছুটি কাটাতে’ ইউরোপ যান, যেখানে লিসার মাধ্যমেই মোসাদ প্রধান মীর অমিতের সঙ্গে তার ঐতিহাসিক গোপন বৈঠকটি সম্পন্ন হয়। গর্ডন টমাসের মতে, লিসা ব্রাট যদি ১৯৬৫ সালে বাগদাদে না আসতেন এবং রেদফার আস্থা অর্জন না করতেন, তবে হয়তো রেদফা কখনই দেশ ছাড়ার মতো চরম ঝুঁকি নিতেন না।

১৬ আগস্ট, ১৯৬৬

ইরাকি বিমান বাহিনী জানত যে পাইলটরা পক্ষত্যাগ করতে পারে, তাই তারা বিমানে সবসময় অর্ধেক জ্বালানি রাখত। ১৯৬৬ সালের ১৬ আগস্ট সকালে একটি রুটিন ট্রেনিং সর্টির অছিলায় মুনির রেদফা তার মিগ-২১ এফ-১৩ নিয়ে ইরাকের আকাশসীমা ত্যাগ করেন।

Stolen MiG-21- munir redfa

মুনির রেদফা

তিনি প্রথমে তুরস্কে অবতরণ করেন, যেখানে মার্কিন বিমান বাহিনীর ফ্যান্টম জেটের পাহারায় তার যুদ্ধবিমানে জ্বালানি পূর্ণ করা হয়। এরপর ১ ঘণ্টার উড়ান শেষে তিনি উত্তর ইসরায়েলের একটি বিমান ঘাঁটিতে অবতরণ করেন।

মিগ-২১ নিয়ে রেদফা জর্ডনের আকাশে ঢুকতেই তার জেট চিহ্নিত করে ফেলে সেখানকার বিমান বাহিনী। ওই সময়ে নিজেকে সিরিয়ার পাইলট বলে পরিচয় দেন তিনি। বলেন, ‘প্রশিক্ষণ মিশন চলাকালীন রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে তার জেট। ফলে তাকে তাড়া করা থেকে বিরত থাকে জর্ডানের বিমান বাহিনী।

বিশ্বাসঘাতকতার পর মুনির রেদফার জীবন

রেদফার স্ত্রী ও সন্তানদের কুর্দি গেরিলাদের সহায়তায় পাহাড়ি পথে ইরাক থেকে বের করে নেয় ইসরায়েল। পরে তার বর্ধিত পরিবারের আরো প্রায় ৪৩ জন সদস্যকে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে ইসরায়েলে নিয়ে যাওয়া হয়।

নিরাপত্তার খাতিরে রেদফা ও তার পরিবারকে ইসরায়েলে নতুন পরিচয় দেয়া হয়। তবে তিনি সেখানে খুব বেশি দিন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেননি পরবাস মনে হওয়ায় কয়েক বছর পর তিনি সপরিবারে ইউরোপের একটি দেশে (ধারণা করা হয় ইতালি বা সুইজারল্যান্ড) চলে যান। সেখানেই তিনি তার বাকি জীবন অতিবাহিত করেন। ১৯৯৮ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মুনির রেদফার মৃত্যু হয়।

০০৭ ও প্রজেক্ট হ্যাভ ডোনাট

ইসরায়েলিরা চুরি করা যুদ্ধবিমানের নাম দেয় ‘০০৭’, যা কাল্পনিক স্পাই জেমস বন্ডের প্রতি এক অনন্য সম্মান। এ যুদ্ধবিমানের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে সোভিয়েত প্রযুক্তির নাড়িনক্ষত্র। ইসরায়েলি ইঞ্জিনিয়াররা এর রাডার, এভিওনিক্স ও ইঞ্জিন নিয়ে গবেষণা করে দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করেন। এ তথ্যের ভিত্তিতেই ১৯৬৭ সালের ছয়দিনের যুদ্ধে এবং ১৯৭৩ সালের ইয়ম কিপুর যুদ্ধে আকাশপথে অভাবনীয় সাফল্য পায় ইসরায়েল।

১৯৬৮ সালে ইসরায়েল যুদ্ধবিমানটি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়। মার্কিন নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী শুরু করে ‘প্রজেক্ট হ্যাভ ডোনাট’। এ গবেষণার ফলাফল এতটাই সুদূরপ্রসারী ছিল যে এর মাধ্যমেই ১৯৬৯ সালে সান ডিয়েগোতে প্রতিষ্ঠিত হয় বিখ্যাত ‘টপ গান’ একাডেমি। মার্কিন পাইলটদের শেখানো হয় কীভাবে মিগ-২১’র মতো চটপটে যুদ্ধবিমানের মোকাবেলা করতে হয়, যা ভিয়েতনাম যুদ্ধে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল।

গবেষণা শেষ হওয়ার পর ১৯৮২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিমানটি ইসরায়েলকে ফেরত দেয়। বর্তমানে ইসরায়েলের নেগেভ মরুভূমির হাতজেরিম জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে সেই ‘০০৭’ মিগ-২১।