দক্ষিণ কোরিয়ার গুমি শহরের নোংশিম কারখানার ভেতরে ঢুকলে মনে হবে, কোনো যান্ত্রিক ঐকতান চলছে। গম পিষে ময়দা তৈরি, রোলারের ঘর ঘর শব্দ, আর সবশেষে স্বয়ংক্রিয়া ব্লেডের ছন্দে আটা থেকে তৈরি হচ্ছে নুডলস। স্টিমিং আর ফ্রাইংয়ের ধাপ পেরিয়ে চোখের পলকে সে নুডলস প্যাকেটজাত হয়ে কনভেয়ার বেল্ট দিয়ে বেরিয়ে আসছে।
গুমি শহরের ৪২ হাজার ২৬৬ বর্গমিটারের বিশালাকার কারখানাটি দক্ষিণ কোরিয়ার বৃহত্তম ইনস্ট্যান্ট নুডলস কারখানা। এখানে প্রতিদিন তৈরি হয় ৬০ লাখ প্যাকেট নুডলস। প্রতি মিনিটে প্রায় ৬০০ প্যাকেট র্যামিউন (কোরিয়ান ইনস্ট্যান্ট নুডলস) স্বয়ংক্রিয় লাইনে তৈরি হয়ে রোবটের মাধ্যমে লোডিং বে-তে চলে যায়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন
কারখানা ব্যবস্থাপক সাং হুন কিম জানান, গত বছর তারা ৮৮৪ বিলিয়ন ওন (প্রায় ৫৯৮ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের ১২৩ কোটি ইউনিট নুডলস উৎপাদন করেছেন। মাত্র ৬০০ জন কর্মী নিয়ে এ বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্ভব হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত সেন্সর ও স্মার্ট ক্যামেরার কল্যাণে। প্রতিটি ধাপে গুণমান নিশ্চিত করতে যে প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নোংশিমের নিজস্ব কর্মীদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ফসল। দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে ব্যবহৃত ‘শিন র্যামিউন’-এর ৮০ শতাংশ এবং ‘চাপাগেত্তি’র ৯০ শতাংশই উৎপাদিত হয় গুমি কারখানায়।
শিল্পনগরীর নতুন পরিচয়: র্যামিউন উৎসব
রাজধানী সিউল থেকে ২৭০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত গুমি শহরটি আগে টেক্সটাইল ও ইলেকট্রনিক্স হাব হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু ‘একঘেয়ে’ শিল্পনগরীকে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করতে ২০২২ সালে শুরু হয় ‘র্যামিউন ফেস্টিভ্যাল’।

শহর কর্তৃপক্ষের এ উদ্যোগ অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে। ২০২৫ সালের উৎসবে রেকর্ড ৩ লাখ ৫০ হাজার দর্শনার্থী অংশ নেন। উৎসবের মূল আকর্ষণ ছিল ৪৭৫ মিটার দীর্ঘ একটি রাস্তা, যাকে আয়োজকরা ‘বিশ্বের দীর্ঘতম র্যামিউন রেস্টুরেন্ট’ হিসেবে অভিহিত করেন। এখানে র্যামিউন স্যান্ডউইচ থেকে শুরু করে ধোঁয়া ওঠা আসাদো পর্ক নুডলস স্যুপ সবই পাওয়া যায়।
অভাব থেকে জাতীয় প্রতীকে রূপান্তর
১৯৬০-এর দশকে ‘কোরিয়া যুদ্ধ’ পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় চালের তীব্র সংকট দেখা দেয়। তখন মার্কিন সেনাবাহিনীর সরবরাহ করা গমের আটা দিয়ে নুডলস তৈরির সংস্কৃতি শুরু হয়। ১৯৬৩ সালে কোরিয়ার প্রথম ইনস্ট্যান্ট নুডলস প্রস্তুতকারক হিসেবে যাত্রা শুরু করে ‘সামইয়াং ফুডস’। জাপানি নুডলসের ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হলেও তারা কোরিয়ানদের স্বাদের কথা মাথায় রেখে এতে গরুর মাংসের ব্রোথ এবং লাল মরিচ যুক্ত করে। এর দুই বছর পর ১৯৬৫ সালে বাজারে আসে নোংশিম।

সাং হুন কিম স্মৃতিরোমন্থন করে বলেন, ১৯৮৬ সালে যখন ‘শিন র্যামিউন’ প্রথম বাজারে আসে, তখন তিনি কলেজে পড়তেন। মাত্র ২০০ ওন দামের খাবারটি ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য সস্তা ও ভারী খাবার। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, কোরিয়ানরা বছরে জনপ্রতি গড়ে ৭৭টি করে মোট ৪০০ কোটিরও বেশি প্যাকেট নুডলস খেয়েছেন।
বিশ্বজুড়ে কোরিয়ান স্বাদের জয়গান
কোরিয়ান পপ কালচার বা ‘কে-কালচার’-এর জনপ্রিয়তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে র্যামিউনের রফতানি। ২০২৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার নুডলস রফতানি ২২ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘প্যারাসাইট’-এর বিখ্যাত ‘র্যাম-ডন’ দৃশ্য বা নেটফ্লিক্সের ‘কে-পপ ডেমন হান্টার্স’-এর মতো জনপ্রিয় শো’গুলো বিশ্বজুড়ে কোরিয়ান নুডলসের চাহিদা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

চাহিদা মেটাতে নোংশিম এখন বুসানে ১৯১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ওন ব্যয়ে কেবল রফতানির জন্যই নতুন একটি কারখানা নির্মাণ করছে। তবে গুমি শহরই নোংশিমের উৎপাদনের মূল কেন্দ্র হিসেবে থাকবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
যান্ত্রিকতার আড়ালে মানবিক গল্প
র্যামিউন কারখানার চরম যান্ত্রিকীকরণের মাঝেও প্রতিটি প্যাকেটের গায়ে একটি মানবিক গল্প লেখা থাকে। শিন র্যামিউনের প্রতিটি প্যাকেটে মেয়াদের তারিখের নিচে তিনটি কোরিয়ান অক্ষর থাকে—এটি মূলত সেই কর্মীর নাম যিনি নুডলসটি প্যাকেটজাত করেছেন। সাং হুন কিম গর্বের সঙ্গে বলেন, আমি যখন ফিল্ড ম্যানেজার ছিলাম, আমার নামও এভাবে ছাপা হতো। যখন ৫০ কোটি প্যাকেট বিক্রি হতো, তখন মনে হতো দেশের সবাই বুঝি আমার নাম জেনে গেছে।
সিএনএন অবলম্বনে










