নাইজেরিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদ আয়েতোরো এক সময় ‘হ্যাপি সিটি’ নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু আজ সেই জনপদ ধীরে ধীরে আটলান্টিক মহাসাগরের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে।

দ্য গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দুই দশকে সমুদ্রের আগ্রাসনে শহরটির অর্ধেকেরও বেশি এলাকা বিলীন হয়ে গেছে। শত শত বাড়িঘর, স্কুল, গির্জা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং মানবসৃষ্ট পরিবেশগত হস্তক্ষেপের ফলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।

‘আমার সবকিছু নিয়ে গেছে সমুদ্র’

৬০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত ধাত্রী অ্যারোও ভিক্টোরিয়ার জীবন বদলে যায় ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ভোরে। প্রতিবেশীদের চিৎকারে ঘুম ভাঙার পর তিনি জানতে পারেন, সমুদ্রের পানি উপকূলবর্তী ভবনগুলো গ্রাস করতে শুরু করেছে।

নিজের ছোট দোকানে পৌঁছে তিনি দেখেন, সেটি ইতোমধ্যেই আটলান্টিকের ঢেউয়ে ভেসে গেছে। বাঁচানোর মতো কিছুই অবশিষ্ট ছিল না, সমুদ্র সবকিছু কেড়ে নিয়েছে, বলেন তিনি।

অবসরের পর ধার করা অর্থ দিয়ে তিনি দোকানটি চালু করেছিলেন। কিন্তু এখন ব্যবসা নেই, আয় নেই, অথচ ঋণের কিস্তি এখনও দিতে হচ্ছে। তিনি জানান, যে জিনিস আর অস্তিত্বই নেই, তার জন্য টাকা শোধ করতে হচ্ছে। প্রতি মাসেই তারা টাকা নিতে আসে।

হ্যাপি সিটি থেকে বিপর্যস্ত নগরী

১৯৪০-এর দশকে একটি খ্রিস্টান সম্প্রদায় আয়েতোরো প্রতিষ্ঠা করেছিল। তারা কমিউনধর্মী সামাজিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে একটি আদর্শ সমাজ গড়তে চেয়েছিল। সেই স্বপ্নের শহর এখন জোয়ার-ভাটার আঘাতে ধ্বংসের মুখে।

স্থানীয়দের মতে, গত এক দশকে জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে সমুদ্র ইতোমধ্যে জনপদটির অর্ধেকের বেশি অংশ গ্রাস করেছে।

হারিয়ে গেছে খেলার মাঠ, হারিয়ে যাচ্ছে স্মৃতি

৩৫ বছর বয়সী ইমানুয়েল আরালু স্মরণ করেন, শৈশবে তারা বিশাল খোলা মাঠে ফুটবল খেলতেন।

সেই সব জায়গা এখন আর নেই। মনে হয় পুরো জনপদটাকেই ধীরে ধীরে মুছে ফেলা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

তার চাচার বাড়ি এখন সমুদ্রের একেবারে কাছে। তিনি বলেন, প্রতিবার পানি বাড়লে বাড়িটি আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। আমরা জানি, আরেকটি বড় জোয়ার হয়তো এটি টিকতে দেবে না।

বারবার নতুন করে শুরু

২৮ বছর বয়সী মোটুনরায়ো আসাকাসিকি এখনও মনে করতে পারেন, কীভাবে সমুদ্রের সৃষ্ট বন্যায় তার মায়ের মুদি দোকান ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেন, পানি খুব দ্রুত এসেছিল। মানুষ যা পারছিল বাঁচানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু অনেক কিছু ইতোমধ্যেই ভেসে গিয়েছিল।

পরে পরিবারটি অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মনে করে আলাবা স্ট্রিটে নতুন দোকান স্থাপন করে। কিন্তু সেখানেও সমুদ্র থাবা এগিয়ে আসছে।

সমুদ্রের সঙ্গে লড়াই

৭৯ বছর বয়সী লরেন্স লেমানু ২০২৩ সালে তার ১০ কক্ষবিশিষ্ট বাড়িটি হারান। সারাজীবনের সঞ্চয় ও পরিশ্রমে গড়া সেই বাড়িটি ঢেউয়ের আঘাতে ধসে পড়ে। তিনি বলেন, আমি আমার সন্তানদের সেখানে বড় করেছি। আমার জীবনের সব পরিশ্রম সেই বাড়ির ভেতরেই ছিল। সমুদ্রের ঢেউ যখন বাড়িটি ভেঙে ফেলছিল, তখন অসহায়ের মতো তা দেখেছেন তিনি।

বিপর্যস্ত মৎস্যজীবী জীবন

আয়েতোরোর অর্থনীতির প্রাণ ছিল মাছ ধরা। কিন্তু এখন সেটিও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্থানীয় জেলে এগবা তাইও বলেন, এখন জোয়ার-ভাটা অনেক বেশি উত্তাল। অনেক সময় মাছ ধরতে যেতে ভয় লাগে, কারণ সমুদ্র খুব বিপজ্জনক হয়ে গেছে।

স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা ব্যবস্থাও হুমকিতে

আয়েতোরো প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হান্নাহ ওলানরেওয়াজু জানান, সমুদ্র এখন স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তিনি জানান, পেছনের দরজা খুললেই সরাসরি সমুদ্র দেখা যায়। ২০১৬ সালে যখন এখানে এসেছিলাম, তখন এমন ছিল না।

কাঠের সেতুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় টিকাদান কর্মসূচি ও ম্যালেরিয়া পরীক্ষা পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে ‘হ্যাপি সিটি কলেজ’-এর অধ্যক্ষ ওগুনবুরে আইজ্যাক বলেন, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা প্রতিনিয়ত আশঙ্কায় থাকেন যে একদিন সমুদ্র পুরো স্কুলটিই গ্রাস করবে।

জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন

পরিবেশবিদদের মতে, আয়েতোরো নাইজেরিয়ার জলবায়ু-ঝুঁকির অন্যতম স্পষ্ট উদাহরণ।

হেলথ অব মাদার আর্থ ফাউন্ডেশনের পরিচালক নিম্মো বাসেই বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনায় ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণের কথা বলা হয়। কিন্তু আয়েতোরোর মতো কিছু সম্প্রদায় ইতোমধ্যেই প্রায় পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। এসব জনপদের স্বার্থই আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিৎ।

এটাই আমাদের বাড়ি

সবকিছুর পরও অনেক বাসিন্দার কাছে আয়েতোরো ছেড়ে চলে যাওয়া সহজ সিদ্ধান্ত নয়। ইমানুয়েল আরালু বলেন, এটাই আমাদের বাড়ি। আমরা আর কোথায় যাব?