শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহু শিল্পকর্মের প্রকৃত শিল্পী আড়ালেই থেকে গেছেন। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, বিখ্যাত অনেক চিত্রকর্মের শিল্পী ছিলেন নারী; কিন্তু সামাজিক বৈষম্য, লিঙ্গগত পক্ষপাত ও প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার কারণে সেসব কাজের কৃতিত্ব চলে গেছে পুরুষদের নামে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে শিল্পকলার ইতিহাসে তাদের অবদানের স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। তবে গবেষণা ও নতুন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব শিল্পকর্মের প্রকৃত শিল্পীদের পরিচয় সামনে এসেছে। এ লেখায় এমন কিছু শিল্পী ও শিল্পকর্মের পেছনের গল্প তুলে ধরার চেষ্টা করব।
১৯৯৩ সালের কথা। ভিয়েনার কুনস্তহিস্টোরিসেস মিউজিয়ামের একটি পরিত্যক্ত গুদামে গবেষণা করার সময় ‘দ্য ট্রায়াম্ফ অফ ব্যাকাস’ (১৬৫৫-৫৯) নামে এক বিশাল ক্যানভাসের সন্ধান পান শিল্প ইতিহাসবিদ ক্যাটলিজনে ভ্যান ডের স্টিগেলেন। প্রথম দেখাতেই তিনি স্তব্ধ হয়ে যান। এত নিখুঁত একটি চিত্রকর্ম, অথচ কোনো স্বাক্ষর ছাড়াই যুগের পর যুগ মিউজিয়ামের স্টোররুমে পড়েছিল। তার ওপর জমেছিল ধুলো। এ অবহেলার কারণ ছিল—এটি এঁকেছিলেন একজন নারী, মাইকেলিনা ওয়াটিয়া।
তৎকালীন সময়ে নারীদের সাধারণত ছবি আঁকার ক্লাসে অংশ নেয়ার অনুমতি দেয়া হতো না। সে কারণেই ধরে নেয়া হয়েছিল, চিত্রশিল্পটি মাইকেলিনার ভাই চার্লসের আঁকা। বেলজিয়ান এ শিল্প ইতিহাসবিদ দুঃখ করে বলেন, যখনই কোনো নারী শিল্পীর কাজ সামনে আসে, তখনই তার কৃতিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। নারীদের আঁকা ছবিগুলো প্রায়ই স্বাক্ষরবিহীন ও অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকে। সেগুলো পরিষ্কার করার উদ্যোগও নেয়া হয় না বললেই চলে। ফলে ক্যানভাসের নিচে লুকিয়ে থাকা আসল স্বাক্ষর খুঁজে পাওয়ার সুযোগ মেলা ভার। নারী শিল্পীদের কাজকে বরাবরই এভাবে খাটো করে দেখা হয়েছে, যার প্রমাণ মেলে লন্ডনের ন্যাশনাল গ্যালারিতে, যেখানে নারী শিল্পীদের কাজ মোট সংগ্রহের মাত্র এক শতাংশ।
এর প্রায় ১৫০ বছর পর, রয়্যাল একাডেমিতে মাইকেলিনা ওয়াটিয়ার প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। যুক্তরাজ্যে এ ফ্লেমিশ শিল্পীর এটাই প্রথম একক এবং তার কাজের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী। এটি ছিল নারী শিল্পীদের কাজের স্বীকৃতি দেয়া।
মাইকেলিনা ওয়াটিয়ারের আঁকা ‘দ্য ট্রায়াম্ফ অফ ব্যাকাস’ একসময় অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক লিওপোল্ড উইলহেমের সংগ্রহে ছিল। ছবিটির বিশালত্ব আর গভীরতা এতটাই চোখধাঁধানো ছিল যে, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মিউজিয়ামের ফ্লেমিশ পেইন্টিং কিউরেটর গুস্তাভ গ্লুক অবলীলায় দাবি করে বসেন, কোনো নারীর পক্ষে এমন ছবি আঁকা অসম্ভব। সম্ভবত এ ধরনের তুচ্ছতাচ্ছিল্যের কথা আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিলেন মাইকেলিনা। তাই ছবির ডান দিকে তিনি নিজেকে ফুটিয়ে তুলেছেন অন্যরূপে—উন্মুক্ত বক্ষ, চোখে যুদ্ধজয়ের চ্যালেঞ্জ আর সরাসরি দর্শকের দিকে তাকিয়ে থাকা এক নির্ভীক নারী। যেখানে তার ভাইকে এ কাজের কৃতিত্ব দেয়া হয়েছিল, সেখানে তার আরো কিছু কাজ ২০২০ সাল নাগাদ অ্যান্থনি ভ্যান ডাইকের মতো ফ্লেমিশ ওস্তাদদের নামে চালানো হচ্ছিল। ভ্যান ডের স্টিগেলেন যখন ভ্যান ডাইকের কাজ খুঁজতে গিয়ে এ চমকপ্রদ আবিষ্কারটি করেন। তখন থেকেই ওয়াটিয়ারকে এ শতাব্দীর সেরা শৈল্পিক পুনরাবিষ্কার হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। স্টিগেলেনের চোখে তিনি ছিলেন এক বহুমুখী প্রতিভাবান শিল্পী।
এমন আরেক শিল্পী ছিলেন আর্টেমিসিয়া জেন্টিলেস্কি। তিনি যখন কিশোরী ছিলেন, তখন থেকেই তিনি আবেগঘন ঐতিহাসিক ছবি আঁকা শুরু করেন। জীবদ্দশায় তার কাজের প্রচুর চাহিদা থাকলেও ১৭০০ শতকে বারোক শৈলীর (সপ্তদশ শতাব্দীতে প্রচলিত ইউরোপীয় একটি শৈলী) আবেদন কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার কাজগুলোও আড়ালে চলে যায়। এরপর তার কাজগুলোকে তার বাবা ওরাজিও বা বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কারভালাওয়ের কাজ বলে ধরে নেয়া হয়। ২০১৭ সালের আগে তার ‘সেলফ পোর্ট্রেট এজ সেন্ট ক্যাথরিন অব আলেকজান্দ্রিয়া’ চিত্রকর্মটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি। চিত্রকর্মটি তার নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি। তিনি তার মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন সেখানে ফুটিয়ে তুলেন। কেটি হেসেল তার ‘দ্য স্টোরি অফ আর্ট উইদাউট মে’ বইয়ে লিখেছেন, জেন্টিলেস্কির ছবিগুলো নারী চরিত্রের বীরত্বকে ফুটিয়ে তুলেছিল ও প্রতিশোধপ্রবণ নারীদের বিষয়টি তার ছবিতে বারবার ফিরে এসেছে।
আরেক চিত্রশিল্পী ছিলেন ডাচ চিত্রশিল্পী জুডিথ লেস্টার। তিনি জীবদ্দশায় বেশ সমাদৃত হলেও মৃত্যুর পর তার খ্যাতি পুরুষ সহকর্মীদের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যায়। তার কাজগুলো প্রায়ই তার স্বামী জ্যান মিয়েনস মোলেনার বা তার শিক্ষক ফ্রেঞ্চ হালসের নামে চালিয়ে দেয়া হতো। তার একটি ঘরোয়া ধাঁচের চিত্রকর্ম ‘দ্য ক্যারোজিং কাপল’। আনন্দ-উৎসব আর মদ্যপানের এ ছবিতে ফ্রেঞ্চ হালসের স্টাইলের হুবহু মিল পাওয়ায় সবাই এটিকে হালসের কাজ বলেই জানত। কিন্তু ১৮৯২ সালে একজন শিল্প ডিলার লক্ষ্য করেন, হালসের জাল স্বাক্ষরের ঠিক নিচেই আলতো করে লেখা রয়েছে 'JL' এবং পাশে একটি তারা—যা ছিল জুডিথের নামের গোপন প্রতীক। জুডিথের কাজ হালসের সমকক্ষ হওয়া সত্ত্বেও তাকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল, কারণ নিলামে একজন পুরুষ শিল্পীর নামের দাম সবসময়ই বেশি ছিল। অন্য অনেক নারী শিল্পীর মতোই জুডিথের ক্যারিয়ারও ছিল বেশ সংক্ষিপ্ত, কারণ পাঁচ সন্তানের লালন-পালন এবং স্বামীর কাজে সাহায্য করতেই তার জীবনের সিংহভাগ সময় কেটে গেছে। ধারণা করা হয়, তিনি স্বামীর অনেক ছবিতেও যৌথভাবে কাজ করেছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত স্বাক্ষরটি কেবল স্বামীরই থাকত।
নারী চিত্রশিল্পীদের একজন ছিলেন জার্মান ভাস্কর ও কবি ব্যারনেস এলসা ফন ফ্রেইটাগ-লোরিংহোভেন। তিনি কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস দিয়ে অদ্ভুত পোশাক বানাতেন। তার তৈরি করা ‘গড’ নামের একটি শিল্পকর্মকে প্রথম ঘরোয়া জিনিস দিয়ে তৈরি শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। কাস্টিং লোহার একটি প্লাম্বিং পাইপকে উল্টো করে বসিয়ে তৈরি করা শিল্পকর্মটি ২০০০ সালের গোড়ার দিক পর্যন্ত মার্কিন শিল্পী মর্টন শ্যামবার্গের নামে চালানো হতো। শত বছর পর যখন এলসার নাম এতে যুক্ত হয়। কিন্তু এর আগে দারিদ্র্যের মধ্যে তিনি পৃথিবী ছেড়েই চলে গেছেন। এমনকি মার্সেল ডিশ্যাম্পের বিখ্যাত উল্টানো ইউরিনাল বা ‘ফাউন্টেন’ শিল্পকর্মটিও আসলে এলসারই করা ছিল বলে অনেক গবেষক মনে করেন।
সবশেষে বলা যাক মার্গারেট কিনের কথা। ১৯৬০-এর দশকে তার আঁকা বড় বড় মায়াবী চোখের বিষণ্ণ শিশুদের ছবিগুলো পোস্টকার্ড ও প্রিন্ট হিসেবে হু হু করে বিক্রি হতো। কিন্তু সবাই জানত, এগুলো তার স্বামী ওয়াল্টার কিনের আঁকা। হেলেন গোরিল তার ‘হোয়াই উইমেন কান্ট পেইন্ট’ বইয়ের জন্য ৫ হাজারটি চিত্রকর্ম বিশ্লেষণ করে একটি সত্য তুলে ধরেন—যখন কোনো পুরুষ শিল্পী ছবিতে স্বাক্ষর করেন, তখন তার মূল্য বহুগুণ বেড়ে যায়, কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে ঘটে ঠিক তার উল্টোটা। মার্গারেটকে বছরের পর বছর ঘরের কোণে বন্দি রেখে ছবি আঁকাতে বাধ্য করা হয়েছিল, আর বাইরে তার স্বামী সেই ছবির স্বীকৃতি। অবশেষে আদালতে এক ঐতিহাসিক ‘পেইন্ট-অফ’ বা সরাসরি ছবি আঁকার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মার্গারেট প্রমাণ করেন এ ‘বিগ আইজ’ বা বড় চোখগুলোর আসল চিত্রকর তিনিই, কোনো পুরুষ নন।
-বিবিসির অবলম্বনে










