মানবসভ্যতায় চিকিৎসার ইতিহাসে এমন অসংখ্য পদ্ধতির দেখা মিলেছে, যেগুলো একসময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও পরবর্তীকালে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় টেকেনি। সম্মোহন থেকে শুরু করে মানবদেহের ওপর চাঁদের প্রভাবজনিত কার্যকারিতা এধরণের নানা বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষ রোগ নিরাময়ের চেষ্টা করেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এ বিতর্কিত ধারাগুলোর মধ্যে অন্যতম হোমিওপ্যাথি।

জার্মানিতে জন্ম, বিশ্বজুড়ে বিস্তার

হোমিওপ্যাথির সূচনা ১৭৯৬ সালে জার্মানিতে। সে সময়ের প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিকে অত্যন্ত কঠোর ও অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিকর বলে মনে করতেন জার্মান চিকিৎসক ড. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান। এ পরিস্থিতিতে তিনি অপেক্ষাকৃত কোমল ও বিকল্প এক চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রস্তাব দেন। তিনিই প্রথম ‘হোমিওপ্যাথি’ শব্দটির প্রবর্তন করেন। ১৮১০ সালে তিনি প্রকাশ করেন এ চিকিৎসা পদ্ধতির ভিত্তিমূল গ্রন্থ ‘দ্য অর্গানন অব দ্য হিলিং আর্ট’।

AA1RMV55

উনবিংশ শতাব্দীতে হোমিওপ্যাথি দ্রুত আন্তর্জাতিকভাবে বিস্তার লাভ করে। ১৮২৫ সালে এটি যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে। শতাব্দীর শেষ নাগাদ দেশটিতে হোমিওপ্যাথির ব্যাপক প্রসার ঘটে। ১৯০০ সালের মধ্যে কেবল আমেরিকাতেই ২২টি হোমিওপ্যাথিক কলেজ ও ১৫ হাজার নিবন্ধিত চিকিৎসক গড়ে ওঠেন ।

তবে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ে। ১৯২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শেষ হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৯৭০-এর দশকে বিকল্প স্বাস্থ্যচর্চার প্রতি নতুন আগ্রহ সৃষ্টি হলে হোমিওপ্যাথি আবারও কিছুটা পুনরুজ্জীবন লাভ করে।

‘সদৃশে সদৃশ নিরাময়’—হোমিওপ্যাথির মূল দর্শন

হোমিওপ্যাথির কেন্দ্রীয় নীতি হলো ‘লাইক কিউরস লাইক’ বা ‘সদৃশে সদৃশ নিরাময়’। এ ধারণা অনুযায়ী, কোনো সুস্থ মানুষের শরীরে যে পদার্থ নির্দিষ্ট কিছু উপসর্গ সৃষ্টি করে, সে পদার্থের অত্যন্ত ক্ষুদ্র মাত্রা অসুস্থ ব্যক্তির একই ধরনের উপসর্গ নিরাময় করতে পারে।

AA1RMV5q

হোমিওপ্যাথদের আরেকটি মৌলিক বিশ্বাস, কোনো পদার্থ যত বেশি পাতলা করা হয়, তার চিকিৎসাগত ক্ষমতা তত বৃদ্ধি পায়। এ কারণে অনেক হোমিওপ্যাথিক ওষুধ এতবার পাতলা করা হয় যে শেষ পর্যন্ত মূল পদার্থটির কার্যত কোনো অণুই অবশিষ্ট থাকে না।

কোনো ওষুধের কার্যকারিতা নির্ধারণে হোমিওপ্যাথরা ‘প্রুভিংস’ নামে পরিচিত একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এতে সুস্থ স্বেচ্ছাসেবকদের একটি পদার্থ গ্রহণ করতে দেয়া হয় এবং এর ফলে তাদের শরীরে যে সব উপসর্গ দেখা দেয়, সেগুলো বিস্তারিতভাবে নথিবদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে রোগীদের মধ্যে একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে সে তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ওষুধ প্রয়োগ করা হয়।

ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা পদ্ধতি

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যক্তিনির্ভর। সাধারণত একজন হোমিওপ্যাথ রোগীর সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে বিস্তারিত সাক্ষাৎকার নেন। রোগীর বর্তমান উপসর্গ, পূর্ববর্তী রোগের ইতিহাস, জীবনযাপন পদ্ধতি ও ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে তার জন্য একটি নির্দিষ্ট ওষুধ নির্বাচন করা হয়। অর্থাৎ একই রোগে আক্রান্ত দুই ব্যক্তির জন্য ভিন্ন ভিন্ন ওষুধ নির্ধারণ করা হতে পারে।

হ্যানিম্যান বিশ্বাস করতেন, রোগের মূল কারণ হলো শরীরের ‘ভাইটাল ফোর্স’ বা প্রাণশক্তির ভারসাম্যহীনতা। তার মতে, হোমিওপ্যাথিক ওষুধ শরীরের স্বাভাবিক আত্ম-নিরাময় ক্ষমতাকে উদ্দীপিত করে এবং সেই ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।

AA1RMZQB

কোন কোন রোগে ব্যবহারের দাবি

হোমিওপ্যাথির সমর্থকেরা দাবি করেন, এটি অ্যালার্জি, হজমজনিত সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, উদ্বেগ, ত্বকের রোগ এবং শিশুদের বিভিন্ন অসুস্থতাসহ বিস্তৃত পরিসরের রোগে কার্যকর। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর রোগের ক্ষেত্রেও উপকারের দাবি করা হয়, যদিও এসব দাবির পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

বিশ্বজুড়ে ব্যবহার

বৈজ্ঞানিক বিতর্ক সত্ত্বেও হোমিওপ্যাথির ব্যবহার বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। ধারণা করা হয়, প্রায় ২০ কোটি মানুষ নিয়মিত হোমিওপ্যাথিক ওষুধ ব্যবহার করেন। ফলে এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতিগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।

বিশেষ করে ভারত হোমিওপ্যাথির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দেশটিতে আনুমানিক ১০ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবার জন্য একমাত্র হোমিওপ্যাথির ওপর নির্ভর করেন। এছাড়া সেখানে নিবন্ধিত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের সংখ্যা দুই লাখেরও বেশি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় ১০ কোটি নাগরিক অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৯ শতাংশ তাদের স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ ব্যবহার করেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে এর ব্যবহার তুলনামূলকভাবে সীমিত। একটি জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২ শতাংশ কোনো না কোনো হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন।

AA1RNjpo

বর্তমানে বহু হোমিওপ্যাথিক পণ্য প্রেসক্রিপশন ছাড়াই বাজারে পাওয়া যায়। অনেকেই সর্দি, কাশি বা শরীর ব্যথার মতো সাধারণ সমস্যায় নিজে থেকেই এসব ওষুধ ব্যবহার করেন। আবার জটিল স্বাস্থ্যসমস্যার ক্ষেত্রে কেউ কেউ পেশাদার হোমিওপ্যাথের পরামর্শ নেন।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে হোমিওপ্যাথি

মূলধারার বিজ্ঞান ও আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্র হোমিওপ্যাথিকে অযৌক্তিক মনে করে এবং একে ‘ছদ্মবিজ্ঞান’ হিসেবে গণ্য করে। রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের মৌলিক সূত্রগুলোর সঙ্গে হোমিওপ্যাথির তত্ত্ব সাংঘর্ষিক; কারণ ওষুধগুলো এত বেশি পাতলা করা হয় যে সেগুলোয় কোনো সক্রিয় উপাদানের অস্তিত্বই থাকে না।

বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও গবেষণায় দেখা গেছে, হোমিওপ্যাথিক ওষুধের কার্যকারিতা মূলত "প্লাসেবো ইফেক্টের চেয়ে বেশি কিছু নয়। অর্থাৎ, কোনো ছদ্ম ওষুধকে আসল ওষুধ ভেবে খেলে মানুষের মনে যে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্বাসের জন্ম হয়, এর নিরাময় ক্ষমতা ঠিক ততটুকুই। বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগ ভালো হওয়ার পেছনে দুটি কারণ থাকে—হয় প্লাসেবো ইফেক্ট (রোগীর বিশ্বাস), না হয় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার স্বাভাবিক নিয়মেই রোগটি নিজে থেকে সেরে যায়। এর সঙ্গে হোমিওপ্যাথিক ওষুধের নিজস্ব কোনো ভূমিকা নেই।

বিজ্ঞানের এ আপত্তিকে পাশ কাটাতে কিছু হোমিওপ্যাথি সমর্থক দাবি করেন, পানির এক ধরনের ‘স্মৃতিশক্তি’ আছে, যার মাধ্যমে লঘুকৃত ওষুধ কাজ করে। তবে এ তত্ত্বের সপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেলেনি।

AA1RNgUl

বিভিন্ন দেশের নীতি ও অবস্থান

বিশ্বের বড় বড় স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশেষজ্ঞ প্যানেল একযোগে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় কোনো কার্যকারিতা নেই। ফলে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো এ চিকিৎসার পেছনে সরকারি তহবিল বরাদ্দ বন্ধ করার পদক্ষেপ নিয়েছে। অন্যদিকে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যে হোমিওপ্যাথিকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। দেশটিতে সরকারি সহায়তায় হোমিওপ্যাথিক হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। এমনকি ঐতিহ্যবাহী ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা তদারকির জন্য পৃথক একটি মন্ত্রণালয়ও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

নিরাপত্তা ও ঝুঁকি

অত্যধিক লঘুকরণের কারণে বেশিরভাগ হোমিওপ্যাথিক ওষুধই নিষ্ক্রিয় ও ক্ষতিকারক উপাদানমুক্ত থাকে। তবে ক্ষেত্রবিশেষে ওষুধ তৈরিতে ত্রুটি বা সনাক্তযোগ্য বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতির কারণে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার নজিরও রয়েছে।

AA1RMY1n

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, প্রমাণিত আধুনিক চিকিৎসা বাদ দিয়ে হোমিওপ্যাথির ওপর নির্ভর করা। ম্যালেরিয়া, এইচআইভি কিংবা ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগে কার্যকর চিকিৎসা না নিয়ে হোমিওপ্যাথির আশ্রয় নিলে তা রোগীর জীবনকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। সমালোচকদের মতে, হোমিওপ্যাথি অনেক সময় অসহায় রোগীদের জন্য একটি ‘নিষ্ঠুর প্রতারণা’ হয়ে দাঁড়ায়। ভিত্তিহীন দাবি করে সংকটাপন্ন রোগীদের বিভ্রান্ত করা ও প্রয়োজনীয় মূলধারার চিকিৎসা থেকে দূরে রাখার অপরাধে বিভিন্ন দেশে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকদের শাস্তির মুখোমুখিও হতে হয়েছে।

তথ্যসূত্র: ব্রিটানিকা, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ, সোসাইটি অব হোমোপ্যাথস, এনএইচএস, হোমোপ্যাথি রিসার্চ ইনস্টিটিউট