প্যাকম্যান—শুধু একটি গেম নয়, চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের শৈশবকে স্মরণীয় করে রেখেছে এটি। হলুদ রঙের ছোট্ট এক গেম চরিত্র, যে একের পর এক ছোট গোলক খেতে খেতে এগিয়ে চলে গোলকধাঁধার ভেতর দিয়ে। আর তাকে থামাতে পিছু নেয় চারটি ভূত—ব্লিঙ্কি (লাল), পিঙ্কি (গোলাপি), ইনকি (সায়ান) ও ক্লাইড (কমলা)। সরল এ ধারণাই প্যাকম্যানকে করেছে ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় ভিডিও গেমগুলোর অন্যতম।

গেমটির শুরু সত্তরের দশকের শেষ দিকে। জাপানি গেম ডিজাইনার তোরু ইওয়াতানি একদিন পিৎজা খাওয়ার সময় লক্ষ্য করেন, একটি টুকরো (স্লাইস) সরানোর পর বাকি অংশটি দেখতে মুখের মতো লাগছে। সেখান থেকেই জন্ম নেয় প্যাকম্যান। ১৯৮০ সালে এটি আর্কেড মেশিনে প্রকাশ পায় এবং দ্রুতই বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলে। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী, প্যাকম্যান এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সফল কয়েন-চালিত আর্কেড গেম।

প্রথম দিকে প্যাকম্যানের গেমপ্লে ছিল অত্যন্ত সহজ—গোলক খাওয়া আর ভূত এড়িয়ে চলা। কিন্তু গেমটি ধীরে ধীরে আরো রঙিন ও আকর্ষণীয় হয়েছে। ‘মিস প্যাকম্যান’ থেকে শুরু করে সর্বশেষ সংস্করণ ‘শ্যাডো ল্যাবিরিন্থ’—প্রতিটি নতুন গেম প্যাকম্যানকে নতুন প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে।

Pac-Man

পপ কালচারের ক্ষেত্রেও প্যাকম্যানের প্রভাব যথেষ্ট, ছবি: নামকো

প্যাকম্যানের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি সবার জন্য। অর্থাৎ শুটিং গেমের মতো অত জটিল নিয়ম নেই। তাই নারী-পুরুষ, শিশু কিংবা বয়স্ক—সবাই সমানভাবে এটি খেলতে পারে। অনেকেই আবার কৌশল শিখে টুর্নামেন্টে অংশ নেন, যেখানে সেরা খেলোয়াড়রা গোলকধাঁধার শত শত পথ মুখস্থও করে ফেলে।

গেমটি দীর্ঘ সময় জনপ্রিয় থাকার পেছনে বড় কারণ এর নস্টালজিয়া অনুভূতি। আশির দশকের আর্কেড গেম খেলার অভিজ্ঞতা আজও অনেকের মনে রয়ে গেছে। সেই সময়ের মতো প্যাকম্যান এখনো সহজে খেলা যায়। তবু প্রতিবারই পাওয়া যায় নতুন চ্যালেঞ্জের রোমাঞ্চকর স্বাদ।

প্যাকম্যান কেবল বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গেমটিকে ব্যবহার করা হয়েছে বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও। ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষকরা এমনকি খেলোয়াড়দের মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্য এটি ব্যবহার করেছেন। বানর নিয়েও এ গেমের মাধ্যমে গবেষণা হয়েছে।

পপ কালচারের ক্ষেত্রেও প্যাকম্যানের প্রভাব যথেষ্ট। সিনেমা, বিজ্ঞাপন এমনকি পণ্য বিপণনেও এর ব্যবহার দেখা যায়। বিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোও প্যাকম্যানকে নিয়ে প্রচারণা চালিয়েছে। গেমটির নির্মাতা বান্দাই নামকো এখনো নতুন সংস্করণ তৈরি করছে, যাতে এটি তরুণ প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে আকর্ষণীয় থাকে।

প্যাকম্যান প্রমাণ করেছে, সহজ ধারণা দিয়েও দীর্ঘদিন মানুষের মন জয় করা সম্ভব। চার দশক পেরিয়ে আজ এটি শুধু একটি ভিডিও গেম নয়, বরং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে যাওয়া এক সাংস্কৃতিক প্রতীক।

বিবিসি অবলম্বনে