জুন মাসের তৃতীয় রোববার এলেই এখন বাবা দিবসের কথা মনে পড়ে। সন্তানদের দেয়া ছোট্ট উপহার আর ভালোবাসার প্রকাশ আমার মন ভরে দেয়। কিন্তু এমন একটি সময় ছিল, যখন বাবা দিবস নামে কোনো বিশেষ দিন ছিল না। তাই বাবাকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুভেচ্ছা জানানো বা উপহার দেয়ার সুযোগও আমার হয়নি।
এখন আমি ৭৬ বছর বয়সে পা রেখেছি। বাবা দিবস মানেই আমার কাছে স্মৃতির দরজা খুলে যাওয়া। এখন আমার ছেলে-মেয়েরা প্রতি বছর বই উপহার দিয়ে দিনটি উদযাপন করে। গত বছর তারা আমাকে ম্যালকম গ্ল্যাডওয়েল, চার্লস ডুহিগ এবং কিথ ফেরাজ্জির লেখা তিনটি বিখ্যাত বই উপহার দিয়েছিল। সেই উপহার যেমন আমাকে আনন্দ দিয়েছে, তেমনি মনে করিয়ে দিয়েছে আমার নিজের বাবার কথাও।
আমার বাবা ছিলেন গম্ভীর ও রাগী স্বভাবের মানুষ। তাই ছোটবেলায় মা-ই ছিলেন আমাদের ভাইবোনদের সবচেয়ে কাছের মানুষ। সরকারি চাকরিজীবী বাবার সামনে যাওয়ার চেয়ে দূরে থাকতেই আমরা বেশি স্বস্তি পেতাম।
১৯৬০ সালে আমি তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। মফস্বল শহরের একটি ভাড়া বাসায় ভাইবোনদের নিয়ে আমাদের সংসার। ঘরে বিদ্যুৎ ছিল না। হারিকেনের আলোয় চলত পড়াশোনা।
আমাদের শৃঙ্খলার মধ্যে রাখার জন্য বাবার ছিল কয়েকটি কঠোর নিয়ম। মাগরিবের আজানের সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে বাসায় ফিরতে হতো। স্কুল বাদে অন্য কোথাও যাওয়ার হিসাব বাবা না নিলেও শুক্রবার ছুটির দিনে সিনেমা দেখার সুযোগ আমি হাতছাড়া করতাম না।
খাতার ক্ষেত্রেও ছিল আলাদা নিয়ম। বাঁধাই খাতা ব্যবহার করা যেত না। বাবা দিস্তা কাগজ কিনে দিতেন। সেগুলো সেলাই করে খাতা বানিয়ে লিখতে হতো। অঙ্কের খসড়া প্রথমে পেন্সিলে লেখা, পরে বাঁশ বা কঞ্চি কেটে বানানো কলম দিয়ে কালিতে লেখা ছিল বাধ্যতামূলক। কালি তৈরির জন্যও তিনি ট্যাবলেট এনে দিতেন। কখনো দোয়াতের কালি উল্টে খাতায় পড়ে গেলে বকুনি খেতেও হয়েছে।
আরেকটি নিয়ম ছিল আরো মজার। ভাইবোনদের মধ্যে যার পড়া আগে শেষ হবে, তাকেই হাতপাখা দিয়ে বাবাকে বাতাস করতে হবে। তাই আমরা কেউই সবার আগে পড়া শেষ করতে চাইতাম না।
চুল কাটার বিষয়েও বাবার আপস ছিল না। একবার একটু বড় করে চুল কাটিয়ে বাড়ি ফেরার পর তিনি আবার আমাকে সেলুনে নিয়ে গিয়ে ছোট করে চুল কেটে আনেন।
একদিন বাবা রিকশায় করে দুটি বড় কার্টন নিয়ে বাসায় ফিরলেন। সঙ্গে ছিলেন একজন লোক। কার্টন খুলে দেখা গেল বিশাল আকৃতির একটি মারফি রেডিও এবং তার সমান বড় একটি ব্যাটারি। লম্বা বাঁশে তার বেঁধে সংযোগ দেয়ার পর রেডিওটি বেজে উঠল। সেই মুহূর্ত আজও স্পষ্ট মনে আছে। কলকাতা কেন্দ্র থেকে ভেসে এসেছিল সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘মা আমার সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল’ গানটি।
শৈশবের সেই কঠোর মানুষটিকে বড় হওয়ার পর নতুন করে চিনেছি। এখন আমার বিশ্বাস, বাবার কঠোর শাসন না থাকলে হয়তো আমরা ভাইবোনেরা কেউই জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারতাম না।
মায়ের ভালোবাসা যেমন স্নেহের স্পর্শে ধরা দেয়, বাবার ভালোবাসা তেমন প্রকাশ পায় দায়িত্ব, শাসন আর নীরব যত্নে। সময়ের সঙ্গে সেই কঠোর মুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্নেহই সবচেয়ে বড় স্মৃতি হয়ে থাকে। বাবা দিবসে তাই আমি ফিরে যাই সেই মানুষটির কাছে, যিনি ভালোবাসতেন নিজের মতো করেই।
লেখক: ইফতিখার আহমেদ। লেখালেখির পাশাপাশি দীর্ঘসময় তিনি ফার্মাসিউটিক্যালস খাতেও চাকরি করেছেন।










