পরিবেশে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা বাড়ছে। বেড়ে চলেছে তাপমাত্রাও। যুক্তরাজ্যভিত্তিক লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটিতে পরিচালিত এক গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে উঠে এসেছে, এতে উদ্ভিজ্জ খাদ্যপণ্যের আকার ও আয়তন বাড়লেও কমছে পুষ্টিমান। নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মানুষের স্বাস্থ্য ও কল্যাণে। খবর সায়েন্স ডেইলি।

এখন পর্যন্ত খাদ্য উৎপাদনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে যত গবেষণা হয়েছে, তার অধিকাংশেরই মূল আলোচ্য বিষয় হলো ফসলের উৎপাদনশীলতা। কিন্তু ফসলের খাদ্যমানে এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে তুলনামূলক কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুষ্টিমান না বেড়ে খাদ্যশস্য ও শাকসবজির শুধু আকার বা আয়তন বাড়লে তা খুব একটা কাজের কিছু নয়।

বিশ্বব্যাপী উদ্ভিদজগতে মারাত্মক ও অমোচনীয় ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে জলবায়ু পরিবর্তন। লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটিতে পরিচালিত গবেষণাটিতে অনুসন্ধানের মূল বিষয়বস্তু হলো প্রতিবেশে কার্বন ডাই অক্সাইড ও তাপমাত্রা বেড়ে গেলে তা খাদ্যশষ্যের পুষ্টিগত উপাদানগুলোয় কী মাত্রায় পরিবর্তন আনে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির পিএইচডি শিক্ষার্থী এবং গবেষক জিয়াতা উগওয়াহ একেলে বলেন, ‘আমরা যা খাচ্ছি, সেটির পরিমাণের পরিবর্তে গুণগত মান বিশ্লেষণই আমাদের গবেষণাটির মূল লক্ষ্য। কার্বন ডাই অক্সাইড ও তাপমাত্রার বৃদ্ধির মধ্যেকার পারস্পরিক সংযোগ খাদ্যশস্যের গুণগত ও পুষ্টিমানে যে প্রভাব ফেলে প্রাথমিকভাবে আমাদের মনযোগ সেখানেই নিবদ্ধ রয়েছে। প্রতিবেশগত এত পরিবর্তন উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ থেকে শুরু করে শস্যে পুষ্টিগুণের মজুদ পর্যন্ত সবকিছুতেই প্রভাব ফেলে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এ প্রভাব বুঝতে পারাটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা আসলে যা খাই সেটিই আমাদের গড়ে তোলে। বাস্তুতন্ত্রের প্রাথমিক উৎপাদনকারী হিসেবে আমাদের খাদ্য নেটওয়ার্কের ভিত্তি তৈরি করে উদ্ভিদ। সুতরাং এসব সংযোগকে বুঝতে পারলে জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের খাদ্যব্যবস্থায় পুষ্টি উপাদানের ল্যান্ডস্কেপটিকে কিভাবে প্রভাবিত করতে পারে সেটিকে আরো ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারব। পাশাপাশি এসব প্রভাব প্রশমনে কাজও করতে পারবো।’

মূলত তিন ধরনের শাকের ওপর এ গবেষণাটি পরিচালিত হচ্ছে। এগুলো হলো কেইল (বাঁধাকপি ও ব্রকলি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত এক ধরনের উদ্ভিদের পাতা), রকেট বা আরগুলা (পুদিনা বা সরিষা পাতার মতো ঝাঁঝওয়ালা একধরনের উদ্ভিদের পাতা) এবং পালং শাক। গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টির নিয়ন্ত্রিত পরিবেশযুক্ত গ্রোথ চেম্বারে এগুলো ফলানো হয়। ভবিষ্যতে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য চিত্রগুলো অনুধাবনের জন্য এসব গ্রোথ চেম্বারে তাপমাত্রা ও কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা কমানো বাড়ানো হয়। জিয়াতা উগওয়াহ একেলে বলেন, ‘এজন্য ফসলের বৃদ্ধির সঙ্গে এর ক্লোরোফিল ফ্লুরোসেন্স ও আলোক শোষণের মাত্রা বিশ্লেষণ করা হয়। আর কর্তন পর্যায়ে ফলন ও বায়োমাসের তথ্য (ওজন, আকৃতি ইত্যাদি) রেকর্ড করা হয়।’

হাই-পারফরমেন্স লিকুইড ক্রোমাটোগ্রাফি (এইচপিএলসি) এবং এক্স-রে ফ্লুরোসেন্স প্রোফাইলিং পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতিতে এসব উদ্ভিদের পুষ্টি ও গুণগত মান নির্ধারণ করা হয়। পরিমাপ করা হয় উদ্ভিদে শর্করা, প্রোটিন, ফেনোলিকস, ফ্ল্যাভোনয়েডস, ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উপস্থিতির মাত্রা।

এর ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উচ্চমাত্রায় কার্বন ডাই অক্সাইডের উপস্থিতির কারণে এসব উদ্ভিদ বড় হয় খুব দ্রুত। আকারেও বড় হয়। কিন্তু এগুলোর পুষ্টিমান থাকে খুব কম। জিয়াতা উগওয়াহ একেলে জানান, এক পর্যায়ে এসব উদ্ভিদে ক্যালসিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং নির্দিষ্ট কিছু অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদানের মাত্রা কম হতে দেখা গেছে।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এসব উদ্ভিদের পুষ্টিমান আরো কমে যেতে দেখা যায়। এ বিষয়ে জিয়াতা উগওয়াহ বলেন, ‘বর্ধিত কার্বন ডাই অক্সাইড ও তাপমাত্রা একযোগে আরো জটিল হতে দেখা গেছে। এক্ষেত্রে ফসল এতটা বড় আকারের হয় না বা ফলনও এত দ্রুত হয় না। কিন্তু এগুলোর পুষ্টিমান কমে যাওয়ার বিষয়টি আরো মারাত্মক আকার ধারণ করতে দেখা গেছে।’