২০০৯ সাল। নিউইয়র্কের ম্যানহাটন। আবাসন ব্যবসার জগতে উদীয়মান নক্ষত্র অ্যানা চ্যাপম্যান। বয়স বিশের কোঠায়, মাথায় উজ্জ্বল লাল চুল ও মগজে তুখোড় বুদ্ধিমত্তা। খুব অল্প সময়েই এ তরুণী শহরের অভিজাত রাজনৈতিক মহলে নিজের জায়গা করে নিলেন। বড় বড় পার্টি, চ্যারিটি গালা আর প্রভাবশালীদের আড্ডায় চ্যাপম্যান ছিলেন মধ্যমণি। কিন্তু এ লাবণ্যময়ী রিয়েল এস্টেট এজেন্টের পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ছিল ক্রেমলিনের গোপন তৎপরতা। যাকে ব্রিটেনের বিখ্যাত কেমব্রিজ ফাইভ গুপ্তচর চক্রের কিম ফিলবির সঙ্গে তুলনা করা হয়। আর অ্যানা চ্যাপম্যান নিজেকে ভাবতেন লেডি জেমস বন্ড।

ম্যানহাটনের বাকি আট-দশজনের মতো সাধারণ কোনো অভিবাসী ছিলেন না অ্যানা চ্যাপম্যান। তিনি ছিলেন রাশিয়ার বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা এসভিআরের তুখোড় ‘ইললিগ্যাল’ অফিসার। গোয়েন্দা পরিভাষায় ‘ইললিগ্যাল’ বলতে বোঝায় সেসব কর্মকর্তা, যাদের কোনো কূটনৈতিক সুরক্ষা থাকে না এবং দীর্ঘমেয়াদে ভিনদেশের নাগরিক সেজে ঘাপটি মেরে থাকেন। তাদের লক্ষ্য ছিল মার্কিন নীতিনির্ধারকদের অন্দরমহলে ঢুকে পড়া। কিন্তু তারা জানত না, এক দশক ধরে এফবিআই তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজর রাখছে। এ ছায়া তদন্তের কোড নেম ছিল ‘অপারেশন ঘোস্ট স্টোরিজ’।

ছদ্মবেশের আড়ালে এক দশক

এফবিআই যখন চক্রটির খোঁজ পায়, তখন দলটির ছয় সদস্য মৃত মার্কিনদের পরিচয় নিয়ে বাস করছিল। এ কারণেই অপারেশনটির নাম দেয়া হয়েছিল ‘ঘোস্ট স্টোরিজ’ বা প্রেতাত্মার গল্প। এই রুশ চররা কোনো অন্ধকার গুহায় থাকত না। তারা থাকত শহরতলির ছিমছাম বাড়িতে। স্ত্রী বা স্বামী-সন্তানসহ সাধারণ মধ্যবিত্ত মার্কিন জীবন যাপন করত। তাদের লক্ষ্য ছিল দীর্ঘ সময় নিয়ে সমাজের উচ্চস্তরে মিশে যাওয়া, যাতে তারা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

দলটি এতটাই সুসংগঠিত ছিল, তাদের কার্যক্রম বিখ্যাত টিভি সিরিজ ‘দ্য আমেরিকানস’-এর অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। এফবিআইয়ের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের তৎকালীন অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর ফ্র্যাঙ্ক ফিগ্লিউজি জানান, এরা ছিল রাশিয়ার ইন্টেলিজেন্স একাডেমির সেরা মেধাবী বা ‘ক্রিম অব দ্য ক্রপ’। সাবলীল ইংরেজি ভাষা ও মার্কিন সংস্কৃতিতে মিশে যাওয়ার অদম্য ক্ষমতা ছিল তাদের প্রধান হাতিয়ার।

প্রযুক্তির খেলা ও ধরা পড়া

অ্যানা চ্যাপম্যানের প্রধান অস্ত্র ছিল তার বিশেষ ল্যাপটপ। সাধারণ চোখে তাকে কোনো ক্যাফেতে বসে কাজ করতে দেখা গেলেও গোপনে সেই ল্যাপটপের মাধ্যমে একটি ব্যক্তিগত ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক তৈরি করতেন। এফবিআইয়ের নজরদারি ক্যামেরায় ধরা পড়ে চ্যাপম্যান নিউইয়র্কের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে বসে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা তার রুশ হ্যান্ডলার বা নিয়ন্ত্রককে এনক্রিপ্টেড কোড পাঠাতেন।

এফবিআই একসময় এই কোড ভাঙতে সক্ষম হয়। এরপর তারা এক নাটকীয় চাল চালেন। গোয়েন্দারা চ্যাপম্যানের ল্যাপটপে কারিগরি সমস্যা তৈরি করেন। এরপর একজন ছদ্মবেশী এফবিআই এজেন্ট রুশ কর্মকর্তার পরিচয় দিয়ে চ্যাপম্যানের সঙ্গে দেখা করেন এবং ল্যাপটপটি ঠিক করে দেয়ার প্রস্তাব দেন। চ্যাপম্যান সরল বিশ্বাসে ল্যাপটপটি তার হাতে তুলে দেন, যা ছিল তার গুপ্তচরবৃত্তির অকাট্য প্রমাণ।

anna chapman

যুক্তরাষ্ট্রে অ্যানা চ্যাপম্যান

তথ্য চুরির কৌশলে অ্যানা ছিলেন অতুলনীয়। তিনি কোনো ফাইল পেনড্রাইভে নিতেন না। ম্যানহাটনের কোনো স্টারবাকস বা বার্নস অ্যান্ড নোবেল বুকশপে কফি খেতে বসতেন। তার ল্যাপটপটি এমনভাবে মডিফাই করা ছিল যে দোকানটির বাইরে দিয়ে যখন কোনো রুশ হ্যান্ডলার গাড়ি চালিয়ে যেতেন, অ্যানার ল্যাপটপ থেকে অটোমেটিক এনক্রিপ্টেড ডেটা সেই গাড়ির রিসিভারে চলে যেত।

এফবিআই একবার অবাক হয়ে দেখেছিল, অ্যানা চ্যাপম্যান একটি বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কেনাকাটা করছেন আর তার ল্যাপটপ ব্যাগ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক রুশ কর্মকর্তার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। প্রযুক্তিটি তখন এতটাই নতুন ছিল, এফবিআইকে এটি ধরতে অনেক বেগ পেতে হয়েছিল।

বর্তমানে ল্যাপটপটি ও চ্যাপম্যানের বিশেষ নেটওয়ার্ক কার্ডটি ওয়াশিংটনে এফবিআই মিউজিয়ামে ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে রাখা হয়েছে।

ব্রাশ পাস ও লুকানো অর্থ

পরবর্তী সময়ে এফবিআইয়ের প্রকাশ করা ভিডিওগুলোতে এ গুপ্তচর চক্রের পেশাদারত্ব ওঠে আসে। জনাকীর্ণ জায়গায় হাঁটার সময় তারা অতি দ্রুততার সঙ্গে একে অন্যের হাতে গোপন নথিপত্র বা অর্থ বিনিময় করতেন, যাকে গোয়েন্দা ভাষায় বলা হয় ‘ব্রাশ পাস’। এছাড়া বনের ভেতরে মাটির নিচে অর্থ লুকিয়ে রাখা কিংবা ব্রিজের নিচে সংকেত রেখে যাওয়ার মতো ক্ল্যাসিক স্পাই টেকনিকও তারা ব্যবহার করতেন।

দলটি একজন মার্কিন ক্যাবিনেট মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছিল। এফবিআইয়ের মতে, তারা ক্ল্যাসিফায়েড নথিপত্র হাতিয়ে নেয়ার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। ঠিক ওই মুহূর্তেই ২০১০ সালের ২৭ জুন এফবিআই সারা দেশ থেকে অ্যানা চ্যাপম্যানসহ ১০ রুশ এজেন্টকে গ্রেফতার করে।

সেই কফি শপ ও ছদ্মবেশী ‘রোমান’

২০১০ সালের ২৬ জুন। চ্যাপম্যান তখন কানেকটিকাটে সপ্তাহান্তের ছুটি কাটাচ্ছিলেন। হঠাৎ তার কাছে ‘রোমান’ নামে একজনের ফোন আসে, যে নিজেকে নিউইয়র্কের রুশ দূতাবাসের কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেয়। সাধারণত তিনি কখনই সরাসরি দেখা করতেন না, সব যোগাযোগ হতো ল্যাপটপের ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কে। কিন্তু রোমান তাকে জানান যে একটি ‘জরুরি’ কাজ আছে।

ম্যানহাটনের একটি কফি শপে তাদের দেখা হয়। ছদ্মবেশী এফবিআই এজেন্ট রোমান অ্যানাকে একটি জাল মার্কিন পাসপোর্ট দিয়ে সেটি অন্য এক রুশ চরের কাছে পৌঁছে দিতে বলেন। তখনই বুঝতে পারেন কিছু একটা ঠিক নেই। কারণ সামনাসামনি এমন বিপজ্জনক কাজ দেয়ার প্রটোকল তাদের ছিল না।

anna chapman2

ফ্যাশন শো-তে অ্যানা চ্যাপম্যান

অ্যানার পালানোর চেষ্টা

পাসপোর্টটি নিয়ে অ্যানা সরাসরি ডেলিভারি করতে যাননি। পুলিশ যাতে কল ট্র্যাক করতে না পারে এ ভাবনা থেকে তিনি ব্রুকলিনের একটি দোকানে গিয়ে একদম নতুন মোবাইল ফোন কেনেন। দুটি আন্তর্জাতিক কলিং কার্ডও কেনেন। তিনি মস্কোয় থাকা পদস্থ রুশ কর্মকর্তা বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বাবা পরামর্শ দেন,"‘পাসপোর্টটি নিয়ে এখনই থানায় জমা দিয়ে দাও এবং বলো কেউ তোমাকে এটি দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।’"

অ্যানা চ্যাপম্যান পরদিন পুলিশের কাছে পাসপোর্টটি জমা দেন। তার পরিকল্পনা ছিল, পুলিশকে ধোঁকা দিয়ে নিজেকে ‘নির্দোষ’ প্রমাণ করবেন এবং খুব দ্রুত প্রথম ফ্লাইট ধরে মস্কোয় পালিয়ে যাবেন। কিন্তু এফবিআই তার এক কদম আগেই ছিল। তিনি থানা থেকে বের হওয়ার আগেই গ্রেফতার হন।

বেশি দিন মার্কিন জেলে থাকতে হয়নি অ্যানা চ্যাপম্যানের

গ্রেফতারের ১১ দিন পর চাঞ্চল্যকর এক মোড় আসে। ২০১০ সালের ৮ জুলাই ভিয়েনা বিমানবন্দরে এক নাটকীয় বন্দি বিনিময় ঘটে। স্নায়ুযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় স্পাই সোয়াপ। হেফাজতে থাকা ১০ রুশ এজেন্টকে রাশিয়ার হাতে তুলে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। বিনিময়ে রাশিয়া নিজেদের কারাগারে থাকা চার বন্দিকে মুক্তি দেয়, যাদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করার অভিযোগ ছিল।

অ্যানা চ্যাপম্যান রাশিয়ায় ফেরার পর বীরের সম্মান পান। ভ্লাদিমির পুতিন নিজে তাদের সঙ্গে দেখা করেন এবং দেশপ্রেমের প্রশংসা করেন। পরে এক গ্ল্যামারাস সেলিব্রিটিতে পরিণত হন চ্যাপম্যান।

জীবনের নতুন ইনিংস

গুপ্তচরবৃত্তি থেকে অবসর নেয়ার পর চ্যাপম্যান নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেন। হয়ে ওঠেন টেলিভিশন উপস্থাপিকা, ফ্যাশন ডিজাইনার ও অন্তর্বাস মডেল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার লাখ লাখ অনুসারী। তিনি পুতিনের রাজনৈতিক দলের যুব শাখার নেত্রী হিসেবেও কাজ করেছেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর তিনি ‘বন্ডিয়ানা’ নামে একটি স্মৃতিকথা প্রকাশ করেন। যেখানে তিনি দাবি করেন সাবেক ব্রিটিশ স্বামী তাকে ড্রিল মেশিন দিয়ে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন। চ্যাপম্যান নিজেকে বর্ণনা করেছেন ‘জেমস বন্ডের নারী সংস্করণ’ হিসেবে।

৪৪ বছর বয়সী অ্যানা চ্যাপম্যান এখন অ্যানা রোমানোভা নামেও পরিচিত। বিভিন্ন রিপোর্টে জানা যায়, মস্কোর মিউজিয়াম অব রাশিয়ান ইন্টেলিজেন্সের প্রধানের দায়িত্ব পেয়েছেন। গোর্কি পার্কের কাছের এ জাদুঘরটি গোয়েন্দা সংস্থা এসভিআরের ইতিহাস ও সাফল্য প্রদর্শন করে।

অপারেশন ঘোস্ট স্টোরিজ প্রমাণ করে, স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হলেও পর্দার আড়ালের লড়াই কখনো থামেনি। অ্যানা চ্যাপম্যানের গল্প শুধু মোহময়ী এক রূপসীর কাহিনী নয়, বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার দলিল। একজন ‘ইললিগ্যাল’ এজেন্ট থেকে শুরু করে রাশিয়ার গোয়েন্দা ইতিহাসের কিউরেটর হওয়া পর্যন্ত—অ্যানা চ্যাপম্যানের জীবন যেন বাস্তবের কোনো স্পাই থ্রিলারকেও হার মানায়।