মহাবিশ্বের ইতিহাস অনেকটাই যুদ্ধ, সংঘর্ষ ও গ্রাস করার ইতিহাস। কোটি কোটি বছর ধরে ছোট গ্যালাক্সিগুলোকে নিজের ভেতরে টেনে নিয়ে বড় হয়েছে বৃহৎ গ্যালাক্সিগুলো। সে দীর্ঘ মহাজাগতিক ইতিহাসের এক নতুন প্রমাণ পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। তাদের দাবি, প্রায় ১০ বিলিয়ন বছর আগে আমাদের ছায়াপথ মিল্কিওয়ে বা আকাশগঙ্গা আরেকটি ক্ষুদ্র গ্যালাক্সিকে গ্রাস করেছিল। সম্প্রতি আবিষ্কৃত এক অস্বাভাবিক নক্ষত্রগুচ্ছ সেই হারিয়ে যাওয়া গ্যালাক্সির অবশিষ্টাংশ হতে পারে। বিজ্ঞানীরা এই প্রাচীন গ্যালাক্সির নাম দিয়েছেন ‘লোকি’। নর্স পুরাণের ধূর্ত দেবতার নামে নামকরণ করা হয়েছে এটি।
নতুন এ গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান সাময়িকী ‘মান্থলি নোটিসেস অব দ্য রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি’-তে। গবেষকদের মতে, এ আবিষ্কার মিল্কিওয়ের জন্ম ও বিবর্তন সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।
বর্তমানে মিল্কিওয়ে প্রায় এক লাখ আলোকবর্ষ বিস্তৃত এক বিশাল ছায়াপথ। এতে রয়েছে প্রায় ১০০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র। কিন্তু মহাবিশ্বের শুরুতে এটি এত বড় ছিল না। বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রায় ১২ বিলিয়ন বছর আগে থেকে একের পর এক ছোট বামন গ্যালাক্সিকে নিজের মধ্যে শোষণ করতে করতেই মিল্কিওয়ে ধীরে ধীরে বর্তমান রূপ নিয়েছে। কিন্তু শুরুতে এর আকার কত ছিল, কীভাবে এটি এত দ্রুত বড় হলো—এসব প্রশ্নের এখনো স্পষ্ট উত্তর নেই।
এ রহস্যের উত্তর খুঁজতেই বিজ্ঞানীরা মিল্কিওয়ের ভেতরে ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন নক্ষত্রগুলো বিশ্লেষণ করছেন। বিশেষ করে তারা খুঁজছেন এমন নক্ষত্র, যেগুলোতে ভারী মৌলের উপস্থিতি খুব কম। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় এগুলোকে বলা হয় ‘মেটাল-পুওর স্টার’।
মহাবিশ্বের একেবারে প্রথমদিককার নক্ষত্রগুলো মূলত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম দিয়ে তৈরি হয়েছিল। পরে এসব নক্ষত্রের কেন্দ্রে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মাধ্যমে ভারী মৌল সৃষ্টি হয়। বিশাল বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেই মৌলগুলো মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তী প্রজন্মের নক্ষত্রগুলো সমৃদ্ধ হয়। ফলে যেসব নক্ষত্রে ভারী মৌলের পরিমাণ কম, সেগুলো সাধারণত অনেক প্রাচীন বলে বিবেচিত হয়।
এ ধরনের নক্ষত্রকে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’ হিসেবেও দেখেন। কারণ এগুলোর রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে প্রাথমিক মহাবিশ্বের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কানেকটিকাটের পদার্থবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ড. কারা ব্যাটারসবির ভাষায়, খুব কম ধাতুযুক্ত নক্ষত্রগুলো মহাবিশ্বের প্রথম যুগের নক্ষত্র গঠনের ইতিহাস নিজের মধ্যে ধারণ করে রেখেছে। এসব নক্ষত্রের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য ও গতিবিধি বিশ্লেষণ করলে প্রাথমিক মহাবিশ্বের গতিশীলতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া সম্ভব।
এখন পর্যন্ত মিল্কিওয়ের বাইরে বিস্তৃত ‘স্টেলার হ্যালো’ অঞ্চলেই মূলত এসব প্রাচীন নক্ষত্র খোঁজা হয়েছে। স্টেলার হ্যালো হলো গ্যালাক্সির চারপাশে ছড়িয়ে থাকা বিশাল, মেঘের মতো এক অঞ্চল। কিন্তু কিছু বিজ্ঞানীর ধারণা ছিল, আরো প্রাচীন সংঘর্ষের চিহ্ন মিল্কিওয়ের গভীর অংশেও লুকিয়ে থাকতে পারে। বিশেষ করে এর ডিস্ক অঞ্চলে।
গ্যালাকটিক ডিস্ক হলো মিল্কিওয়ের ঘূর্ণায়মান প্যানকেকের মতো চ্যাপ্টা অংশ, যেখানে অধিকাংশ নক্ষত্র অবস্থান করে। কিন্তু এই অঞ্চল ধূলিকণা ও তরুণ, ধাতুসমৃদ্ধ নক্ষত্রে এতটাই ভরপুর যে সেখানে প্রাচীন ধাতু-স্বল্প নক্ষত্র খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।

গাইয়া টেলিস্কোপে ধারণ করা ১৮০ কোটির বেশি নক্ষত্রের তথ্য ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির এই মানচিত্র
ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ারের সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স রিসার্চের পোস্টডক্টরাল গবেষক ও গবেষণার প্রধান লেখক ড. ফেদেরিকো সেস্তিতো এবং তার সহকর্মীরা এই কঠিন কাজটিই করেছেন। তারা ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির ‘গাইয়া’ টেলিস্কোপের তথ্য ব্যবহার করে মিল্কিওয়ের ডিস্কের খুব কাছে অবস্থানরত ২০টি ধাতু-স্বল্প নক্ষত্র শনাক্ত করেন। ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে গাইয়া প্রায় ২০০ কোটি নক্ষত্রের গতিবিধি ও রাসায়নিক গঠন পর্যবেক্ষণ করেছে। এরপর গবেষক দল হাওয়াইয়ের মাউনাকেয়া পর্বতের কাছে অবস্থিত কানাডা-ফ্রান্স-হাওয়াই টেলিস্কোপের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্পেকট্রোগ্রাফ ব্যবহার করে নক্ষত্রগুলো বিশ্লেষণ করেন।
গবেষকদের মতে, নক্ষত্রগুলোর সুনির্দিষ্ট বয়স নির্ধারণ কঠিন হলেও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য দেখে ধারণা করা হচ্ছে, এগুলোর বয়স ১০ বিলিয়ন বা এক হাজার কোটি বছরেরও বেশি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সব নক্ষত্রের রাসায়নিক গঠন প্রায় একই ধরনের। অর্থাৎ এগুলোর উৎপত্তি একই উৎস থেকে হয়েছে।

গাইয়া টেলিস্কোপের মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে, সৌরজগতের ৩২৬ আলোকবর্ষের মধ্যে থাকা ৪০ হাজার নক্ষত্র আগামী ৪ লাখ বছরে কীভাবে অবস্থান পরিবর্তন করবে
সবগুলো নক্ষত্রই আমাদের সৌরজগত থেকে প্রায় ৭ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করছে। এর মধ্যে ১১টি নক্ষত্র গ্যালাকটিক ডিস্কের ঘূর্ণনের একই দিকে ঘুরছে, যাকে বলা হয় ‘প্রোগ্রেড অরবিট’। আর বাকি ৯টি উল্টো দিকে ঘুরছে, যাকে বলা হয় ‘রেট্রোগ্রেড অরবিট’।
এ বিপরীতমুখী গতিবিধিই বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে। কারণ সাধারণত একই উৎস থেকে আসা নক্ষত্রের গতিপথ একই হওয়ার কথা। কিন্তু গবেষকদের ধারণা, বহু প্রাচীন এক সংঘর্ষের সময় মিল্কিওয়ে অপেক্ষাকৃত ছোট ও দুর্বল ছিল। ফলে গ্রাস করা গ্যালাক্সির নক্ষত্রগুলো বিভিন্ন দিকে ছিটকে পড়ে যায়।
সেস্তিতোর মতে, যদি ‘লোকি’ তত্ত্ব সঠিক হয়, তাহলে বোঝা যাবে মিল্কিওয়ের শৈশবে ঘটে যাওয়া এক বড় সংঘর্ষের ফলেই এই নক্ষত্রগুলো আজ দুই ধরনের কক্ষপথে ঘুরছে। তার ভাষায়, এ ধরনের ঘটনা কেবল তখনই সম্ভব, যখন মিল্কিওয়ের মহাকর্ষীয় শক্তি বর্তমানের তুলনায় অনেক দুর্বল ছিল।
কসমোলজিক্যাল সিমুলেশন বা মহাজাগতিক কম্পিউটার মডেল অনুযায়ী, বিগ ব্যাংয়ের তিন থেকে চার বিলিয়ন বছরের মধ্যেই এ ধরনের সংঘর্ষ ঘটে থাকতে পারে।

এই চিত্রে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি ও এর চারপাশের নক্ষত্রবলয় বা হ্যালো দেখানো হয়েছে, যার কিছু নক্ষত্র অতীতের গ্যালাক্সি সংঘর্ষ ও একীভবনের মাধ্যমে এসেছে
জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোনমির গ্যালাক্সি ও কসমোলজি বিভাগের পরিচালক ড. হ্যান্স-ভালটার রিক্স বলেন, গবেষণাটির সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো রাসায়নিক মৌলের বিশদ বিশ্লেষণ ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা নক্ষত্রগুলোর অভিন্ন উৎস শনাক্ত করতে পেরেছেন। যদিও কিছু নক্ষত্র ডিস্কের দিকেই ঘুরছে, আবার কিছু উল্টো দিকে। তার মতে, এ রাসায়নিক ‘ফিঙ্গারপ্রিন্ট’ দেখাচ্ছে যে সব নক্ষত্রই একসময় একটি ক্ষুদ্র স্যাটেলাইট গ্যালাক্সির অংশ ছিল, যা পরে মিল্কিওয়ের মধ্যে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
গবেষকরা মনে করছেন, এ আবিষ্কার মিল্কিওয়ের প্রাথমিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ এতদিন ধারণা করা হতো, মিল্কিওয়ের ডিস্ক অঞ্চলে এত পুরোনো ও ধাতু-স্বল্প নক্ষত্র টিকে থাকার সম্ভাবনা খুব কম। কিন্তু ‘লোকি’র সম্ভাব্য অবশিষ্টাংশ দেখাচ্ছে আমাদের গ্যালাক্সির ভেতরেই হয়তো আরো অনেক হারিয়ে যাওয়া গ্যালাক্সির চিহ্ন লুকিয়ে আছে।
অর্থাৎ আমরা যে আকাশগঙ্গার অংশ হয়ে বেঁচে আছি, সেটি কেবল নিজস্বভাবে জন্ম নেয়া নক্ষত্রের সমষ্টি নয়; বরং কোটি কোটি বছরের মহাজাগতিক সংঘর্ষ, গ্রাস ও ধ্বংসের ফল। আজকের মিল্কিওয়ের ভেতরে হয়তো এখনো ছড়িয়ে আছে বহু মৃত গ্যালাক্সির স্মৃতি যাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে, কিন্তু নক্ষত্রগুলো এখনো আকাশে জ্বলছে।
সিএনএন অবলম্বনে










