কোরীয় সংস্কৃতির বৈশ্বিক জয়যাত্রা এখন আর শুধু কে-পপ বা কে-ড্রামা’র মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দীর্ঘ চার দশক ধরে বিশ্বখ্যাত সব মার্কিন কার্টুন সিরিজের নেপথ্যে নিঃশব্দে কাজ করে গেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার অ্যানিমেটররা। ‘দ্য সিম্পসনস’, ‘ব্যাটম্যান: দ্য অ্যানিমেটেড সিরিজ’ কিংবা ‘পিঙ্কি অ্যান্ড দ্য ব্রেইন’—জনপ্রিয় এ চরিত্রগুলোকে দর্শকের চোখে সচল রাখতে কয়েক কোটি ফ্রেম এঁকেছেন সিউলের শিল্পীরা। তবে দীর্ঘকাল ‘আউটসোর্সিং’ বা ফরমায়েশি কাজের আড়ালে থাকা দেশটি এখন নিজস্ব মৌলিক অ্যানিমেশন বা ‘অ্যানি’ নিয়ে বিশ্বজয়ের পথে নেমেছেন। শতকোটি ডলারের সরকারি বিনিয়োগ আর আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে কোরিয়া এখন গ্লোবাল অ্যানিমেশন হাব হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

00213706-d2bc144b-20260324085104380-20260324085402394

পথপ্রদর্শক নেলসন শিন ও ‘সিম্পসনস’ সংযোগ

দক্ষিণ কোরিয়ার অ্যানিমেশন জগতের ‘গডফাদার’ বলা হয় ৮৯ বছর বয়সী নেলসন শিনকে। সত্তরের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়ে ‘স্টার ওয়ারস’ (১৯৭৭) ছবিতে লাইটসেবারের আলোড়ন সৃষ্টিকারী ইফেক্ট তৈরি করে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন তিনি। তার প্রতিষ্ঠিত স্টুডিও ‘একেওএম’ চার দশক ধরে ‘দ্য সিম্পসনস’-এর মতো বিশ্বজয়ী সিরিজের অ্যানিমেশন করে আসছে।

নেলসন শিন

পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে তিনি সিউলে ফিরে বড় পরিসরে স্টুডিও স্থাপন করেন। সেসময় কম মজুরি ও দক্ষ জনশক্তির কারণে মার্কিন স্টুডিওগুলো কোরিয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বর্তমানে দেশটির অ্যানিমেশন খাতের বাজারমূল্য প্রায় ৭৬০ মিলিয়ন ডলার। তবে কোরিয়ার দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মজুরি বৃদ্ধির ফলে এখন আর তারা কেবল ফরমায়েশি কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না।

নিজস্ব গল্পের খোঁজে তরুণ নির্মাতারা

কোরীয় অ্যানিমেশনের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের অনীহা অনেক পুরনো। ২০০৩ সালে ‘ওয়ান্ডারফুল ডেস’ নামের একটি উচ্চাভিলাষী প্রজেক্টের বাণিজ্যিক ব্যর্থতা এ শিল্পকে দীর্ঘ সময় থমকে দিয়েছিল। তবে নতুন আশা দেখাচ্ছেন তরুণ নির্মাতারা। নেটফ্লিক্সের প্রথম অরিজিনাল কোরিয়ান অ্যানিমেশন ‘লস্ট ইন স্টারলাইট’-এর পরিচালক জিওন হান জানান, ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর আগমনে এখন প্রেক্ষাগৃহের সফলতার ওপর নির্ভরতা কমে গেছে। এতে বড়দের উপযোগী অ্যানিমেশন তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

lost-in-starlight-n-01-25-11-16

তিনি বলেন, কোরিয়ায় দীর্ঘকাল একটি ধারণা ছিল যে অ্যানিমেশন কেবল শিশুদের জন্য। কিন্তু জাপানি নির্মাতা মাকোতো শিনকাইয়ের ছবিগুলোর জনপ্রিয়তা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। বর্তমানে অস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় কোরিয়ান অ্যানিমেশনের নাম আসা এ নতুন জাগরণেরই প্রমাণ।

প্রযুক্তির ব্যবহার ও ‘দ্য কিং অব কিংস’

২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে ৮৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করা অ্যানিমেটেড ছবি ‘দ্য কিং অব কিংস’ দক্ষিণ কোরিয়ার সক্ষমতাকে নতুন করে চিনিয়েছে। হলিউডের তুলনায় মাত্র ১০ ভাগের এক ভাগ বাজেটে এটি নির্মাণ করেছেন ছবিটির পরিচালক সং-হো জাং। এতে ভিডিও গেম তৈরিতে ব্যবহৃত প্রযুক্তি ‘আনরিয়াল ইঞ্জিন’ ব্যবহার করেছেন তিনি। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে অ্যানিমেশন তৈরির খরচ ও সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তার স্টুডিও ‘মোফ্যাক’ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অ্যানিমেশনের আধুনিক অবকাঠামো তৈরিতে কাজ করছে।

mofac-tkok-vp-making-still-cut-2

বিশাল বিনিয়োগ ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ

অ্যানিমেশন খাতকে চাঙ্গা করতে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার আগামী পাঁচ বছরের জন্য ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলারের একটি বিশাল তহবিল গঠন করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাতের রাজস্ব ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বর্তমানে বড় বড় প্রজেক্ট পাইপলাইনে রয়েছে। ‘প্যারাসাইট’ খ্যাত অস্কারজয়ী পরিচালক বং জুন-হো ২০২৭ সালের জন্য একটি বড় বাজেটের অ্যানিমেশন ছবি নির্মাণ করছেন। এছাড়া এলজি’র মতো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও এই খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসছে।

সিএনএন অবলম্বনে