হাঁটার সময় ক’জনই বা জুতার দিকে নজর রাখেন। কিন্তু হঠাৎ যদি চোখে পড়ে ফিতা খুলে গেছে; কারো কারো মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে ওঠে। আর যদি বৃষ্টির দিনে বা টয়লেটের মতো নোংরা জায়গায় এমনটা ঘটে, তা হলেও কথাই নেই।

জুতার ফিতা খুলে যাওয়াকে একেবারে তুচ্ছ দৈনন্দিন ঘটনা মনে হয়। কিন্তু একটু গভীরে গেলে বোঝা যায়, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে পদার্থবিদ্যা, মানবদেহের মেকানিকস, এমনকি আধুনিক প্রযুক্তির কল্পনাও। কীভাবে?

আমরা যখন হাঁটি, তখন মনে হয় সবকিছু স্বাভাবিক ছন্দে চলছে। কিন্তু সেই ‘স্বাভাবিক’ ছন্দটাই ধীরে ধীরে একটা গিঁটকে ভেঙে ফেলতে সক্ষম।

মানুষের হাঁটা নিখুঁতভাবে অস্থিতিশীল এক ধরনের গতি। প্রতিবার পা মাটিতে পড়ার সময় শরীরের ওপর একটি তীব্র ক্ষণস্থায়ী চাপ তৈরি হয়। এই চাপ শুধু নিচের দিকে নয়, বরং পুরো শরীরজুড়ে কম্পন আকারে ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে হাত-পায়ের দোল, কোমরের সামান্য ঘূর্ণন, আর শরীরের ভারসাম্য রক্ষার জন্য যে স্বাভাবিক সামান্য ঝুঁকে চলা—সব মিলিয়ে একটি জটিল গতিশীল সিস্টেম তৈরি হয়। এ সিস্টেমের মাঝখানে থাকে জুতার ফিতা, যেটা আসলে খুবই সাধারণ একটি গিঁট।

ফিতার গিঁটটি দেখতে শক্ত মনে হলেও এর ভেতরের কাঠামো অনেকটাই ‘অর্ধ-স্থায়ী লক’ ধরনের। অর্থাৎ এটা চাপ ধরে রাখতে পারে, কিন্তু বারবার পরিবর্তনশীল টান ও ঘূর্ণনের মুখে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। বিষয়টি প্রথম খুব স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলের একদল গবেষক। তাদের গবেষণা প্রকাশিত হয় ‘প্রিসিডিংস অব দ্য রয়্যাল সোসাইটি এ’ জার্নালে। তারা হাই-স্পিড ক্যামেরা দিয়ে হাঁটা পর্যবেক্ষণ করে দেখেন, ফিতা খুলে যাওয়ার ঘটনাটা কোনো একক মুহূর্তের ফল নয়—এটা একটি ধীর প্রক্রিয়া, যেখানে প্রথমে গিঁটের ভেতরের ফাইবারগুলো সরে যায়, তারপর লুপ ধীরে ধীরে ঢিলে হতে থাকে এবং শেষে হঠাৎ করে পুরো কাঠামো ভেঙে পড়ে।

আমরা এখনো এমন এক পুরোনো ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছি, যেটা মানবদেহের স্বাভাবিক গতির সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খায় না। জুতার ফিতা খুলে যাওয়া তাই কোনো ‘ভুল’ নয়, বরং এটা এক ধরনের অনিবার্য ফলাফল—মানুষের হাঁটা আর একটি সাধারণ গিঁটের মধ্যে চলা নীরব টানাপোড়েন
shoe_lech1

ছবি: ফ্রিপিক

গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল, এ প্রক্রিয়ায় দুই ধরনের শক্তি একসঙ্গে কাজ করে। একদিকে আছে মাটিতে পায়ের আঘাতে তৈরি হওয়া তীব্র কম্পন, অন্যদিকে আছে পায়ের দোলনের কারণে তৈরি হওয়া টান ও ঘূর্ণন। এই দুই শক্তি একসঙ্গে গিঁটের ওপর এমন একটি চাপ তৈরি করে, যা বাইরে থেকে টের পাওয়া না গেলেও ভেতরে ভেতরে গিঁটকে ধীরে ধীরে আলগা করে দেয়। গবেষকদের ভাষায়, এ মিলিত শক্তি এমনভাবে কাজ করে যেন কোনো ‘অদৃশ্য হাত’ ধীরে ধীরে গিঁট খুলে দিচ্ছে।

প্রক্রিয়াটি আরো আকর্ষণীয় কারণ এটি ধীরে ধীরে হলেও শেষ পর্যন্ত হঠাৎ ঘটে। অনেকক্ষণ পর্যন্ত ফিতা স্বাভাবিক থাকে, কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন হয় না। কিন্তু এক পর্যায়ে গিয়ে খুব ছোট একটি স্লিপ পুরো গঠনটাকে অস্থিতিশীল করে দেয় এবং মুহূর্তের মধ্যে গিঁট খুলে যায়। এ ধরনের আচরণকে গবেষকরা অনেকটা ‘অ্যাভালাঞ্চ ইফেক্ট’ বা ধসের মতো আচরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন—যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা ছোট পরিবর্তন একসময় বড় ব্যর্থতায় রূপ নেয়।

বিষয়টি নিয়ে গবেষণার সময় এক গবেষক নিজেই দৌড়ানোর মাধ্যমে পরীক্ষা করেছিলেন, যাতে বাস্তব হাঁটার চাপ ও গতির প্রভাব সরাসরি ধরা যায়। সেই পর্যবেক্ষণ থেকেই বোঝা যায়, গিঁট খুলে যাওয়ার পেছনে মানুষের তেমন কোনো ভূমিকা নেই—এটা সম্পূর্ণভাবে শরীরের স্বাভাবিক গতির ফলাফল। অর্থাৎ আমরা যত স্বাভাবিকভাবে হাঁটি, ততই এই প্রক্রিয়া কাজ করে।

এই বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার পাশে আবার দাঁড়িয়ে আছে মানুষের কল্পনা। কারণ এত পুরোনো ও পরিচিত একটি সমস্যাকে প্রযুক্তি ও সংস্কৃতি কখনোই উপেক্ষা করতে পারেনি। সিনেমায়, বিশেষ করে ‘ব্যাক টু দ্য ফিউচার পার্ট টু’র মতো সাই-ফাই গল্পে আমরা দেখি এমন জুতা যা নিজে নিজে ফিতা বাঁধতে পারে। বাস্তবেও সেই ধারণা আংশিকভাবে এসেছে স্মার্ট জুতার মাধ্যমে। যেখানে মোটর ও সেন্সরের সাহায্যে ফিতা নিজে থেকেই টাইট বা ঢিলা হয়। যেমন নাইকি অ্যাডাপ্ট বিবি ও নাইকি অ্যাডাপ্ট অটো ম্যাক্স। কিন্তু এসব প্রযুক্তি এখনো সীমিত, ব্যয়বহুল এবং দৈনন্দিন জীবনে পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। তবে আপাতত সমাধান হিসেবে ডাবল নট গিট্টু দেয়ার পরামর্শ দেন অনেকে। এছাড়া ফিতার ব্যবহার নেই এমন জুতা কার্যকর সমাধান, যদিও এমন জুতা কারো কারো পছন্দ নয়।

আমরা এখনো এমন এক পুরোনো ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছি, যেটা মানবদেহের স্বাভাবিক গতির সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খায় না। জুতার ফিতা খুলে যাওয়া তাই কোনো ‘ভুল’ নয়, বরং এটা এক ধরনের অনিবার্য ফলাফল—মানুষের হাঁটা আর একটি সাধারণ গিঁটের মধ্যে চলা নীরব টানাপোড়েন।

এ ছোট্ট ঘটনাটা আসলে বড় একটা সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে—প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে সাধারণ জিনিসগুলোর ভেতরেও এখনো লুকিয়ে আছে জটিল বিজ্ঞান। আর জুতার ফিতা সেই বিজ্ঞানের সবচেয়ে সাধারণ, কিন্তু সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণগুলোর একটি।