বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১৫ লাখের বেশি মুসল্লি সৌদি আরবের মক্কায় এবার হজ পালন করছেন। পাঁচদিনের হজের আনুষ্ঠানিকতার অন্যতম কাবা শরিফকে কেন্দ্র করে তাওয়াফ। কাবা কালো রঙের ‘কিসওয়াহ’ নামের কাপড়ে আবৃত থাকে, যার ওপর সোনালি সুতোয় কোরআনের আয়াতের সূচিকর্ম রয়েছে। আর নিদর্শনটি ঘিরে বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের মধ্যে রয়েছে কৌতূহল।
কিসওয়াহ শব্দের মূল উৎপত্তি আরবি শব্দ ‘ক্বাফ-সিন-ওয়া’ থেকে, যার অর্থ ঢেকে রাখা বা আচ্ছাদিত করা। প্রাচীনকালে এ শব্দ দিয়ে যেকোনো ধরনের পোশাক বা আবরণ বোঝানো হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বিশেষভাবে কাবার গিলাফের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। হজের সময় বিপুল সংখ্যক মানুষ পুণ্যলাভের আশায় কাবা শরিফ স্পর্শ করতে চান। এ কারণে কাপড়টির সুরক্ষায় এর নিচের অংশটিকে কিছুটা ওপরে তুলে রাখা হয়।
কিসওয়াহ মূলত প্রাকৃতিক রেশম বা সিল্কের তৈরি একটি কালো কাপড়। যার উচ্চতা ১৪ মিটার। এর দেয়ালের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ উঁচুতে আনুমানিক ৯৫ সেন্টিমিটার চওড়া এবং ৪৭ মিটার দীর্ঘ একটি নকশা করা বেল্ট বা হিজাম থাকে। কাবার দরজার ওপরে ঝোলানো পর্দাটিকে সিতারা বা বোরকা বলা হয়, যা কিসওয়াহর সবচেয়ে সুসজ্জিত অংশ।
ঐতিহাসিকদের মতে, কাবাকে রক্ষা, সম্মান ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করার জন্য এটি ঢেকে রাখার ঐতিহ্য প্রাক-ইসলামী যুগ থেকেই চলে আসছে। সবচেয়ে প্রচলিত মত অনুযায়ী, ৪০০ খ্রিস্টাব্দে ইয়েমেনের রাজা তুব্বা আসাদ কামিল ইয়েমেনি কাপড় দিয়ে সর্বপ্রথম কাবা ঢেকেছিলেন। অন্য একটি মত অনুযায়ী, হযরত ইসমাইল (আ.) নিজেই প্রথম কাবা ঢেকেছিলেন। তবে এর পক্ষে কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। গবেষকদের ধারণা, তিনি যদি কাবার ওপর কোনো আবরণ দিয়েও থাকেন, তবে তা পুরো কাঠামোর পরিবর্তে কাবার একটি নির্দিষ্ট অংশে সীমাবদ্ধ ছিল।
কিসওয়াহর জন্য ব্যবহৃত উপাদান এবং এটি তৈরির স্থানগুলো যুগে যুগে মুসলিম শাসকদের প্রভাব ও পছন্দের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। শুরুর দিকে কিসওয়াহ লিনেন, তুলা ও উল দিয়ে তৈরি হতো এবং প্রাক-ইসলামী যুগে চামড়ার ব্যবহারের কথাও জানা যায়। ইসলামের প্রাথমিক যুগে খিলাফতের কেন্দ্র আরবে হলেও কিসওয়াহ তৈরি হতো উন্নত বস্ত্রশিল্পের কেন্দ্র মিসরে। সেখানে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাষ্ট্রীয় কারখানায় এটি বুনে হজের মাস জিলহজের শুরুতে আনুষ্ঠানিক কাফেলার মাধ্যমে মক্কায় পাঠানো হতো।
পরবর্তীতে উমাইয়া আমলে দামেস্কে, আব্বাসীয় আমলে বাগদাদে এবং ইয়েমেনেও কিসওয়াহ তৈরি হয়েছে। এরপর আইয়ুবী, মামলুক ও অটোমান আমল পেরিয়ে খেলাফতের অবসানের পর এ দায়িত্ব সৌদি রাজপরিবারের কাছে হস্তান্তরিত হয়।
বর্তমানে কিসওয়াহ তৈরিতে প্রায় ৬৭০ কেজি প্রাকৃতিক রেশম ব্যবহৃত হয়, যা প্রায় ১২০ কেজি ২৪-ক্যারেট স্বর্ণের সুতা এবং ১০০-১২০ কেজি রৌপ্যের সুতা দিয়ে সূচিকর্ম করা। মক্কার কিসওয়াহ কারখানায় ২৪০ জনেরও বেশি কারিগর আধুনিক প্রযুক্তি, ঐতিহ্যবাহী তাঁত এবং আরবি ক্যালিগ্রাফির সমন্বয়ে এটি তৈরি করেন।
ইতালি থেকে আমদানি করা রেশম প্রথমে বিশেষ ডিটারজেন্ট ও জলপাই তেলের সাবান দিয়ে ঠান্ডা পানিতে ধোয়া হয় যাতে এর প্রাকৃতিক মোম দূর করা যায়। এরপর প্রায় ৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার গরম পানিতে কয়েকবার ধুয়ে এর আসল রঙ ফিরিয়ে এনে কালো রঙ করা হয়। কিসওয়াহর গায়ে শাহাদার বাণীসহ হজের গুরুত্ব, কাবার পবিত্রতা ও কুরআনের বিভিন্ন আয়াত খোদাই করা থাকে। আধুনিক কিসওয়াহ তৈরিতে আনুমানিক আড়াই কোটি সৌদি রিয়াল বা প্রায় ৬৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার ব্যয় হয়।
ইতিহাসে কিসওয়াহর রঙে অনেক বৈচিত্র্য দেখা গেছে এবং বিভিন্ন সময়ে সাদা, সবুজ, হলুদ ও কালো রঙ ব্যবহার করা হয়েছে। সিরিয়ায় তৈরি কিসওয়াহগুলো লাল, সবুজ, হলুদ ও সাদা রঙের হতো, যা ইসলামী শিল্পকলার দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ। আব্বাসীয় আমলে কালো রঙ কিসওয়াহর প্রধান পরিচিতি হিসেবে রূপ নেয়, আর প্রাক-ইসলামী যুগে ইয়েমেনি কিসওয়াহ ছিল লাল ও সবুজের ডোরাকাটা কাপড়ের।
প্রতি বছর হজের সময় একটি বিশেষ কর্মীদল কাবার পুরোনো গিলাফটি সরিয়ে নতুন কিসওয়াহ স্থাপন করে। পুরোনো কিসওয়াহটি কারখানায় ফিরিয়ে নিয়ে সংরক্ষণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর স্বর্ণ-রৌপ্যের সুতা ও কুরআনের আয়াত সম্বলিত সবচেয়ে মূল্যবান অংশগুলো সাবধানে কেটে জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয় বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উপহার দেয়া হয়। অন্যান্য অংশগুলো ছোট ছোট টুকরো করে সরকারি কর্মকর্তা, সংস্থা ও বিদেশি দূতাবাসগুলোতে বিতরণ করা হয়।










