'বহুদিন ধরে, বহু ক্রোশ দূরে,
বহু ব্যয় করি, বহু দেশ ঘুরে,
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা, দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া,
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া,
একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশিরবিন্দু।'
রবীন্দ্রনাথের এ কবিতার পঙক্তি অনেক ক্ষেত্রেই সত্য হয়ে ধরা দেয়। এই যেমন- বিদেশী ফলে ছেয়ে গেছে বাজার। অথচ ফলের দোকানগুলোয় খুঁজলে দেশী ফল পাওয়া দুস্কর। ওদের খুঁজতে হবে ফুটপাতে; ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ভ্যানে, ভাড়ে অথবা ঝাঁপিতে। অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে এই ফলগুলোর কোনোটাই পুষ্টিগুণে বিদেশী ফলের চেয়ে পিছিয়ে নেই। তবুও এত অনাদর...
আজ জানব ফুটপাতে সহজলভ্য ৫ ফলের পুষ্টিগুণ:
আমলকি:
আমলকি একটি ভেষজ ফল যা ভিটামিন সি, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অন্যান্য খনিজ পদার্থে ভরপুর। যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, ত্বক ও চুল সুস্থ রাখতে, হজম প্রক্রিয়া উন্নত করতে এবং রোগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। পুষ্টিবিদরা বলে থাকেন একটি আমলকিতে চারটি কমলালেবু বা দুইটি পেয়ারার সমপরিমাণ অ্যাসকরবিক অ্যাসিড বা ভিটামিন-সি থাকে। আধুনিক আর্য়ুবেদ চিকিৎসায় আমলকিকে বলা হয় মাদার অব ফ্রুট। স্বাদে তিতকুটে হলেও মৌসুমে রোজ একটি আমলকি সবার খাওয়া উচিৎ।

শালুক:
শালুক শাপলা গাছের গোড়ায় জন্মানো এক ধরনের সবজি জাতীয় খাদ্য। শাপলা গাছের গোড়ায় একাধিক গুটির জন্ম হয়, যা ধীরে ধীরে বড় হয়ে শালুকে পরিণত হয়। ভাটি বাংলার আদি ও জনপ্রিয় এ ফল একটা সময় হাওর এলাকায় গরিবের খাবার হিসেবে পরিচিত ছিল। এটি দ্রুত ক্ষুধা নিবারণ করে এবং শরীরে শক্তি যোগায়।
শালুকে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ভিটামিন, ক্যালসিয়াম রয়েছে, যা পিত্তের জন্য প্রশান্তিদায়ক ও পিপাসা নিবারণকারী। এছাড়া শালুকে ঔষধি গুণও রয়েছে। চুলকানি ও রক্ত আমাশয় নিরাময়ে শালুক বেশ উপকারী।

পানিফল:
জলাশয়ে চাষ হয় বলে এর নাম পানি ফল, অনেকে একে পানি শিঙাড়া নামেও চেনে। এ ফলে কোনো বীজ নেই। কাঁচা ও সিদ্ধ দুই উপায়েই খাওয়া যায়।
স্বাদে পানসে আর দামে সস্তা হলেও পানিফলের রয়েছে প্রচুর উপকারিতা। এটি শক্তিবর্ধক। এটি যকৃতের প্রদাহনাশক ও উদরাময় রোগ নিরাময় করে। ব্রঙ্কাইটিস ও অ্যানিমিয়া কমাতে পারে এই ফল। এছাড়া গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখে বলে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপাদেয়। পানিফলের শাঁস শুকিয়ে রুটি বানিয়ে খেলে অ্যালার্জি ও হাত-পা ফোলা রোগ কমে যায়। তলপেট ব্যথায় পানিফল খুব উপকারী।

ডেউয়া:
বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে খুবই পরিচিত একটি মৌসুমি ফল ডেউয়া। স্থানভেদে একে ডেওয়া, ডেউফল, বা বটবেলও বলা হয়। দেখতে এবড়োখেবড়ো এবং কিছুটা কাঁঠালের মতো এ ফলের ভেতরে হলুদ রঙের কোষ থাকে। পাকলে ফলটি অতি মোলায়েম হয়, স্বাদে টকও নয় আবার মিষ্টিও নয়। দেখতে কাঁঠালের মতো এ ফলের পুষ্টিগুণও কাঁঠালের মতোই।
ভিটামিস সি ও ক্যালসিয়ামের ভাণ্ডার বলা হয় ডেউয়া ফলকে। এতে থাকা প্রাকৃতিক আঁশ হজমে সহায়তা করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। ডেউয়া ফলে উচ্চমাত্রার আয়রন (লোহা) রয়েছে, যা হিমোগ্লোবিন তৈরি ও রক্তশূন্যতা প্রতিরোধে সহায়ক। ফলে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েড ও ভিটামিন সি দেহে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। এই উপাদানগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং সর্দি-কাশি, সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করে। হাঁড় ও দাঁতের ক্ষয় রোধে ডেউয়া ফল খুবই উপকারী।

টিপা ফল বা পানি আমলা:
এটি এক ধরনের টক মিষ্টি স্বাদের অপ্রচলিত ফল। বিভিন্ন অঞ্চলে ফলটি বইঁচি, লুকলুকি, পেলাগোটা, প্যালা, পায়েলা, ঝিটকি, টরফই, বেহুইসহ নানা নামে পরিচিত। লালচে বেগুনী রঙের ফলটি পাকার পর টিপে টিপে খেতে হয় বলে এই নাম।

টিপা ফল হৃদরোগীদের জন্য্ বিশেষভাবে উপকারি। এতে রয়েছে রক্ত তরল করার উপাদান। এছাড়া এটি লিভার ক্যান্সার দমনে সাহায্য করে। তবে এ ফলের বড় পরিচিতি এর ডায়রিয়া নিরাময় গুণ। টিপা গাছের কচি পাতা ও ফল ডায়রিয়ার জন্য খুব উপকারী।









