মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে বহুবার বহু বিবৃতি এসেছে ইতিহাসের পাতায়। তবে ২০২৩ সালের নভেম্বরে টোকিওতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা বিশেষভাবে ছিল নজর কাড়ার মতো। সেদিন তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন জি-৭ সম্মেলনে ‘গাজা যুদ্ধের পরবর্তী দিনের’ একটি রূপরেখা উপস্থাপন করেন।

ব্লিঙ্কেনের পাঁচ দফা নীতিমালায় ছিল— ফিলিস্তিনিদের বলপূর্বক বাস্তুচ্যুতি থাকবে না, গাজায় পুনরায় ইসরায়েলি দখল চলবে না, গাজা অবরোধ করা হবে না, ভবিষ্যতের প্রশাসন হবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বে এবং সেখানে হামাসের কোনো ভূমিকা থাকবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় ও আরব মিত্রদের সমর্থন পেতে এ ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। তবে ইসরায়েল সে বিষয়ে তখন দ্বিমত পোষণ করে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় এসে ওই ‘টোকিও নীতি’ একেবারে বাতিল করে দেয়।

এই সপ্তাহে নিউইয়র্কে ফরাসি-সৌদি আয়োজিত এক সম্মেলনে ইউরোপের কিছু দেশ ও কানাডা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার পরিকল্পনার কথা জানায়। প্রথমে ফ্রান্স, পরে যুক্তরাজ্য এবং সর্বশেষে কানাডা জানায়, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে তারা ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে।

এই পদক্ষেপটি যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান থেকে বড় বিচ্যুতি তৈরি করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন সম্মেলনটি বর্জন করে একে ‘ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অপমানজনক এক প্রচারমূলক কার্যক্রম’ হিসেবে অভিহিত করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এই অপমানজনক উদ্যোগে অংশ নেবে না।‘

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও টেকসই শান্তির বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কি কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা আছে? এ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হলে মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস বলেন, ‘আমাদের আঞ্চলিক অংশীদাররা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আহ্বানে নতুন কিছু পরিকল্পনা তৈরি করছে।‘ তবে তিনি সেগুলো খোলাসা করেননি।

ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, গাজা দখল করে সেখানে ‘মধ্যপ্রাচ্যের রিভিয়েরা’ গড়ে তুলবেন এবং ফিলিস্তিনিদের সেখানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী এই পরিকল্পনাকে পরবর্তীতে ‘স্বেচ্ছায় প্রস্থান’ বলে প্রচার করা হয়। তবে বাস্তবে তা আদৌ সম্ভব নয়। আরব দেশগুলোর প্রত্যাখ্যানে পরিকল্পনাটি বড়সড় ধাক্কা খায় এবং ধীরে ধীরে আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে যায়।

এরপর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন মূলত তাদের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হিসেবে যুদ্ধবিরতি ও জিম্মিদের মুক্তির দিকেই মনোযোগ দিচ্ছে।

সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পরিবর্তে নেতানিয়াহুর দিকে তাকিয়ে উত্তর দিতে বলেন। অর্থাৎ, ওয়াশিংটনের নীতিগত অবস্থান এখন অনেকাংশেই ইসরায়েলের সঙ্গে সমান্তরাল। নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে গাজায় প্রশাসনের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করেছেন। তার সরকারের কট্টর ডানপন্থীরা গাজায় স্থায়ী সামরিক দখল, ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও বসতি স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছে।

ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্ল্যাসিফিকেশন (আইপিসি) বলছে, গাজায় মারাত্মক অপুষ্টি ও দুর্ভিক্ষের প্রমাণ মিলছে। শিশুরা খাবারের খোঁজে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হচ্ছে—এমন দৃশ্য ইউরোপজুড়ে সৃষ্টি করেছে নৈতিক ক্ষোভ। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেন, ‘এই দুঃসহ দৃশ্য বিশ্ববাসীকে মর্মাহত করেছে।‘

এই মানবিক সংকট ইউরোপকে কূটনৈতিকভাবে ভিন্ন পথে যেতে বাধ্য করেছে। ট্রাম্পের অস্পষ্টতা এবং ইসরায়েল ঘেঁষা অবস্থানের বিপরীতে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও সৌদি আরব মিলে এক যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে—যেখানে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে শক্তিশালী করা, মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং দুই-রাষ্ট্র সমাধান পুনরুজ্জীবনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এই সম্মেলন ও উদ্যোগ ঐতিহ্যগতভাবে চলে আসা কূটনৈতিক চর্চাকে ভেঙে দিয়েছে—যেখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি কেবল শান্তিচুক্তির শেষ ধাপ হিসেবেই বিবেচিত হতো। এবার সৌদি আরবও সরাসরি হামাসের নিন্দা করে তাদের নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

তবে মূল প্রশ্ন রয়ে যায়—যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ছাড়া কি এই কূটনৈতিক প্রয়াস সফল হবে?

আগামী সেপ্টেম্বর নতুন করে সম্মেলন ডাকা হয়েছে। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত কূটনৈতিক চাপ আর মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে গাজার ভবিষ্যৎ অনেকটাই অনিশ্চিত রয়ে যাবে।

বিবিসি অবলম্বনে