ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসায়েলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলায় অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে বিশ্ব জ্বালানি বাজার। হামলার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বড়ছে। মূলত হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় এ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে জলপথটির গুরুত্বকে আবারো সামনে এনেছে এ যুদ্ধ।
পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত সরু হরমুজ প্রণালি দিয়েই বিশ্বের মোট উৎপাদিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। প্রণালির উত্তর দিকে ইরানের সীমান্ত অবস্থিত। সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, কাতার, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো উৎপাদিত জ্বলানি তেল ও গ্যাস এ পথেই বিশ্ববাজারে পাঠায়। উল্লেখ্য, এ অপরিশোধিত তেলের সিংহভাগেরই গন্তব্য এশিয়ার দেশগুলো।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান নিউবার্জার বারম্যানের সিনিয়র পোর্টফোলিও ম্যানেজার হাকান কায়া বলেন, ‘পরিস্থিতিটির গুরুত্ব এত বেশি যে সেটিকে অতিরঞ্জিত বলার সুযোগ নেই। ঝুঁকির মাত্রা সত্যিই বড়।’
তিনি আরো জানান, এক-দুই সপ্তাহের জন্য আংশিক সরবরাহ কমে গেলে তেল কোম্পানিগুলো তা সামাল দিতে পারবে। কিন্তু যদি এ পথ এক মাস বা তার বেশি সময় পূর্ণ বা প্রায় পূরণ বন্ধ থাকে, তবে বর্তমানে ৭০ ডলারের আশপাশে থাকা অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ২০২২ সালের জ্বালানি সংকটের স্তরকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান জলপথ
বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহনের (বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও গ্যাস) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্তকারী সরু জলপথটি আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও জ্বালানি অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে অবস্থিত হলেও এটি একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে স্বীকৃত, যার নিকটেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহর অবস্থিত। ঐতিহাসিকভাবেই হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীনকালে এ পথ দিয়ে চীন থেকে চীনামাটির বাসন, হাতির দাঁত, রেশম ও বস্ত্র বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যেত। আধুনিক যুগে এটি সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, কাতার, বাহরাইন ও আমিরাতের সুপারট্যাংকার চলাচলের প্রধান রুট।
ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের মতে, সৌদি আরব ও আমিরাতের কিছু পাইপলাইন থাকলেও এ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী অধিকাংশ জ্বালানি পরিবহনের আর কোনো বিকল্প পথ নেই। ফলে এ রুটে যেকোনো বিঘ্ন বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের দামকে আকাশচুম্বী করে তোলে, যা গত জুনে ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের সময়ও দেখা গিয়েছিল।
হরমুজ প্রণালি কি বন্ধ?
ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে সম্প্রতি। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং (আইআরআইবি) এবং দেশটির অন্যান্য রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত এক বার্তায় আইআরজিসির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইব্রাহিম জাবারি এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘এ প্রণালি এখন থেকে বন্ধ। যদি কেউ এটি দিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করে, তবে রেভল্যুশনারি গার্ডের বীর সদস্য ও নিয়মিত নৌবাহিনী সে জাহাজগুলোকে অগ্নিসংযোগে ভস্মীভূত করে দেবে।’
যদিও ইরানে হামলার পর থেকেই হরমুজে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজের চলাচল নাটকীয়ভাবে কমেছে। ডেটা ও অ্যানালিটিকস প্রতিষ্ঠান কেপলারে গত রোববার জানিয়েছে, স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম বা জিপিএস সংকেত বিঘ্নিত হওয়ায় জাহাজ চলাচল কমে গেছে। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার প্রণালির উভয় পাশে বেশ কয়েকটি জাহাজে হামলার খবর নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে তারা ওই এলাকায় ইলেকট্রনিক ইন্টারফারেন্স বা জাহাজ শনাক্তকারী সিস্টেমে বিঘ্ন ঘটার বিষয়ে উচ্চতর সতর্কতা জারি করেছে। তবে আজ তেহরানের প্রতি বেইজিংয়ের সমর্থনের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ হরমুজ প্রণালি দিয়ে কেবল চীনা জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান।
শিপিং কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম স্থগিত
হরমুজ প্রণালিতে চরম উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বড় বড় শিপিং কোম্পানিগুলো ওই এলাকায় কার্যক্রম স্থগিত করার ঘোষণা দিয়ে ‘সার্ভিস অ্যালার্ট’ জারি করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম শিপিং কোম্পানি ডেনমার্কের মায়েরস্ক গত রোববার জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের জাহাজ চলাচল স্থগিত রাখা হনে। হ্যাপাগ-লয়েড, সিএমএ-সিজিএম ও এমএসসির মতো অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় সমুদ্রগামী পণ্য পরিবহন সংস্থাও একই ধরনের ঘোষণা দিয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব টেনেসির সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট বিভাগের লজিস্টিকস চেয়ারম্যান টম গোল্ডসবি বলেন, ‘বর্তমানে কেউ এ পথে জাহাজ চালাতে চাইছে না। পাশাপাশি কোনো বীমাকারী প্রতিষ্ঠানও এ মুহূর্তে প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী পরিবহনের দায়ভার নিতে রাজি নয়। যেসব জাহাজ পারস্য উপসাগরে আটকা পড়েছে, সেগুলো কোথাও যেতে পারছে না।’
এপি অবলম্বনে














