সাম্প্রতিক সময়ে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া একযোগে সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। আর এতে সবেচেয়ে জটিল নিরাপত্তা সংকটে ভুগছে জাপান, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে গুরুতর নিরাপত্তা হুমকি বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেন নাকাতানি। খবর সিএনএন।

মঙ্গলবার জাপানের বার্ষিক প্রতিরক্ষা শ্বেতপত্র উপস্থাপনকালে নাকাতানি বলেন, বিশ্ব শান্তির প্রচলিত শৃঙ্খলা গুরুতরভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আর জাপান এখন যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে জটিল ও সংকটপূর্ণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে অবস্থান করছে।

শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, চীনের সামরিক কর্মকাণ্ড জাপানের জন্য ‘অভূতপূর্ব ও সবচেয়ে গুরুতর কৌশলগত হুমকি’ হয়ে উঠেছে। গুণগত ও পরিমাণগত উভয় দিক থেকেই দ্রুত সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে চীন। একযোগে বাড়াচ্ছে আঞ্চলিক কার্যক্রমও। বিশেষ করে, পূর্ব চীন সাগরের সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ ঘিরে উত্তেজনার কথা তুলে ধরেন জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

৩৪ পৃষ্ঠার এই শ্বেপত্রে আঞ্চলিক ভবিষ্যতের এক হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিশ্বের শক্তির ভারসাম্য নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতে আরো তীব্রতর হবে।

প্রতিবেদনটি আরো বলছে, গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত তাইওয়ানের আশপাশে চীনের সামরিক তৎপরতা নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি তৈরি করছে। দক্ষিণ চীন সাগরেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা জাপানের জন্য উদ্বেগজনক। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যায়।

এদিকে বুধবার জাপানের এ শ্বেতপত্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জিয়াং বিন। তিনি বলেন, ‘চীন হুমকি’ নিয়ে অতিরঞ্জন করছে জাপান। সেইসঙ্গে চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে গুরুতর হস্তক্ষেপ করছে।

জিয়াং বলেন, জাপান তার সামরিক বাধা শিথিল করার অজুহাত খুঁজছে, আর এর জন্য মিথ্যা গল্প তৈরি করছে। আমরা জাপানকে অনুরোধ করছি, ইতিহাস থেকে গভীর শিক্ষা গ্রহণ করুক এবং চীনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বন্ধ করুক।

প্রতিবেদনটিতে কেবল চীন নয়, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়াকেও নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি চীন-রাশিয়ার মধ্যকার সামরিক সহযোগিতা, যেমন যৌথ বোমারু বিমানের উড্ডয়ন ও সমুদ্র টহলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

জাপান বলছে, বারবার এই ধরনের যৌথ অভিযান সরাসরি জাপানের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। গত অর্থবছরে জাপানি ফাইটার জেটগুলো ৭০৪ বার স্ক্র্যাম্বল করেছে, যার মধ্যে ৪৬৪ বার চীনা এবং ২৩৭ বার রুশ বিমানকে লক্ষ্য করে।

এতে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির কথাও তুলে ধরা হয়েছে, বিশেষত জাপানের প্রতিবেশী হিসেবে দেশটির অবস্থানের কারণে। জাপান দাবি করেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন যে উত্তরাঞ্চলীয় দ্বীপগুলো দখল করেছিল, সেখানে রাশিয়া ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান ও সেনা মোতায়েন করছে। টোকিও ওই দ্বীপগুলোকে নিজস্ব ভূখণ্ড বলে মনে করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া আরো পারমাণবিক অস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা জাপানের পুরো ভূখণ্ডকে আঘাত হানতে সক্ষম। এতে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়ার সামরিক কর্মকাণ্ড আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি তাৎক্ষণিক ও গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই আশঙ্কাগুলোর সঙ্গে সঙ্গতি রেখেছে ইউএস ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল পাপারোর এক প্রতিবেদন। তিনি বলেন, চীন নজিরবিহীন সামরিক আধুনিকায়ন চালিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের আগ্রাসী আচরণ আমাদের মাতৃভূমি, মিত্র এবং অংশীদারদের হুমকির মুখে ফেলছে।

তিনি আরো বলেন, চীন-রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার মধ্যে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত সহযোগিতা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের জন্য হুমকি তৈরি করছে।