তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা জানিয়েছেন, তার মৃত্যুর পর একজন উত্তরসূরি শতশত বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যকে বজায় রাখবেন। নিজের ৯০তম জন্মদিন উপলক্ষে ভারতের ধর্মশালায় চলমান উৎসবের সময় তিনি এই ঘোষণা দেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত অনুসারীরা এরইমধ্যে উত্তর ভারতের ধর্মশালায় জড়ো হয়েছেন। খবর আল জাজিরা।

তিনি জানান, তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতৃবৃন্দ, নির্বাসিত তিব্বতী পার্লামেন্ট ও সরকারের সদস্য এবং সারা বিশ্ব থেকে বৌদ্ধরা প্রতিষ্ঠানটি চালুর জন্য তার কাছে লিখিতভাবে আবেদন করেছেন। তাদের অনুরোধের ভিত্তিতে দালাই লামা প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি।

তবে এই ঘটনাটি শুধু ধর্মীয় নয়, এর কূটনৈতিক গুরুত্বও গভীর। পরবর্তী দালাই লামা কে হবেন, কীভাবে এবং কোথায় তাকে বেছে নেয়া হবে—এসব সিদ্ধান্ত বিশ্ব রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

বৌদ্ধ ধর্মমতে, দালাই লামা হলেন করুণার অবতার অবলোকিতেশ্বরের পুনর্জন্ম। প্রচলিত রীতিতে, বর্তমান দালাই লামার মৃত্যুর পর উচ্চপদস্থ লামারা বিভিন্ন আধ্যাত্মিক সংকেতের মাধ্যমে উত্তরসূরির সন্ধান শুরু করেন। নির্বাচিত সেই শিশুকে বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে চিহ্নিত করে দীর্ঘ ধর্মীয় ও দার্শনিক শিক্ষায় দীক্ষিত করা হয়।

বর্তমান দালাই লামা, তেনজিন গিয়াস্তো, ১৯৩৫ সালে চীনের কুইংহাই প্রদেশে এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র দুই বছর বয়সে তিনি পূর্ববর্তী দালাই লামার পুনর্জন্ম হিসেবে চিহ্নিত হন। ১৯৫৯ সালে চীনের দমন নীতির বিরুদ্ধে ব্যর্থ বিদ্রোহের পর তিনি তিব্বত থেকে পালিয়ে ভারতে আসেন। এরপর থেকে তিনি ধর্মশালায় বসবাস করছেন এবং তিব্বতের স্বাধীনতার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

তার মতে, একজন দালাই লামার পুনর্জন্মের উদ্দেশ্য হল পূর্বসূরির কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া। তবে নতুন দালাই লামার জন্ম চীনে নয় বরং অন্য কোথাও জন্ম হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। তার ভয়েজ ফর দ্য ভয়েজলেস বইয়ে লিখেছেন, ‘নতুন দালাই লামার জন্ম হবে মুক্ত বিশ্বে।’ অর্থাৎ, তার মতে, ভবিষ্যতের দালাই লামার জন্ম চীনের নিয়ন্ত্রিত তিব্বতে নয়, বরং ভারতের মতো কোনো স্বাধীন দেশে হবে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রতিষ্ঠান ইতিহাসে বহু ঝড়-ঝাপটা টিকে থেকেছে এবং ভবিষ্যতেও তা তিব্বতী জাতিসত্তার প্রতীক হিসেবে টিকে থাকবে।

এদিকে, চীন সরকার দাবি করে, দালাই লামার পুনর্জন্ম নির্ধারণের একমাত্র অধিকার তাদেরই আছে। ২০০৭ সালে পাস হওয়া এক আইনে বলা হয়েছে, তিব্বতী ধর্মগুরুদের পুনর্জন্ম সরকারের অনুমতি ছাড়া অবৈধ। চীন এই প্রক্রিয়ায় কুইং রাজবংশের সময়কার গোল্ডেন আর্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করতে চায়, যেখানে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম সোনার পাত্রে রেখে লটারি করা হয়। তবে দালাই লামা এই পদ্ধতির বিরোধিতা করে একে ‘আধ্যাত্মিকতা-বিরুদ্ধ’ বলেছেন।

১৯৯৫ সালে দালাই লামা একজন ছয় বছর বয়সী তিব্বতী শিশুকে পঞ্চেন লামা হিসেবে ঘোষণা দেন। এরপরই চীন তাকে আটক করে এবং নিজের মনোনীত প্রার্থীকে পঞ্চেন লামা হিসেবে ঘোষণা করে। সত্যিকারের পঞ্চেন লামা তখন থেকেই নিখোঁজ। এই ঘটনার ফলে তিব্বতী নির্বাসিত জনগণ ভবিষ্যতে চীনের নিয়ন্ত্রিত তিব্বতে পুনর্জন্ম চিহ্নিত করার ঝুঁকি নিতে চান না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন দুই দালাই লামার একটি দ্বৈত পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে—একজন চীন মনোনীত এবং অন্যজন তিব্বতী নির্বাসিত নেতাদের দ্বারা নির্বাচিত।

ভারতের জন্য এই উত্তরসূরি নির্ধারণের প্রশ্নটি কেবল ধর্মীয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও সীমান্ত সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মশালায় নির্বাসিত তিব্বতী সরকার ভারতের জন্য একটি কৌশলগত সম্পদ। যুক্তরাষ্ট্রও তিব্বতী জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের সমর্থক। ২০২০ সালে ট্রাম্প প্রশাসন তিব্বতী পলিসি অ্যান্ড সাপোর্ট অ্যাক্ট আইন পাস করে। যেখানে বলা হয়, দালাই লামা তার উত্তরসূরি নির্ধারণে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করেন এবং এতে চীনা হস্তক্ষেপ হলে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরবর্তী দালাই লামাকে ঘিরে এই লড়াই শুধু ধর্মীয় নয়, এটি আসলে চীনের সঙ্গে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার আরেকটি স্তর।