ইরানে চলমান সরকার-বিরোধী আন্দোলন ঘিরে দেশটিতে মার্কিন হামলার শঙ্কা বাড়ছে। পরস্পরের ওপর হামলা-পাল্টা হামলার হুমকি, নিজ নিজ নাগরিকদের ইরান ত্যাগে নানা দেশের পরামর্শ, কাতারের উদেইদ মার্কিন ঘাঁটি থেকে সেনা সরানোর পরামর্শ- সবকিছুই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আসন্ন সহিংসতার দিকে নির্দেশ করছে। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার মতে, ট্রাম্প ইরানে হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে অভিযানের সময় ও পরিধি এখনো অনিশ্চিত। এ পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো সময় ইরানে হামলা করতে পারে। ইরানের দাবি, তারাও পাল্টা হামলার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
মূল্যস্ফীতির জেরে শুরু হওয়া এ বিক্ষোভ গত তিন বছরে ইরানি কর্তৃপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। গত বছর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার পর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ার প্রেক্ষাপটে এ অস্থিরতা দেখা দেয়। মূলত গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে এ বিক্ষোভ শুরু হয় এবং খুব দ্রুত তা দেশটির ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক ব্যাপক আন্দোলনের রূপ নেয়।
গতকাল মঙ্গলবার তেহরানের বিক্ষোভ থেকে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) যে ছবি প্রকাশ করেছে, তাতে খামেনির মৃত্যুর আহ্বান জানিয়ে গ্রাফিতি ও স্লোগান দেখা গেছে—যা ইরানে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ বলে ধরা হতে পারে।
আন্দোলন শুরুর পর এদিনই দেশটির সরকারি এক কর্মকর্তা জানান, বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ অন্তত ২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এ সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে বলেও জানান তিনি। তবে তিনি এ ঘটনার জন্য অজ্ঞাত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে দায়ী করেছেন।
নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেখেন, ইরানি দেশপ্রেমিকরা, বিক্ষোভ চালিয়ে যাও—তোমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করে নাও। বিক্ষোভকারীদের নির্বিচার হত্যাকাণ্ড বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব বৈঠক বাতিল করেছি। সহায়তা আসছে।
শুধু তাই নয়, এ অস্থিরতার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের ওপর চাপ আরো বাড়ানো হয়েছে। ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, যারা ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করবে, তাদের পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। ইরান একটি বড় তেল রফতানিকারক দেশ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তে চীন, তুরস্ক, ইরাক ও ভারতের মতো অংশীদার দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এরই মধ্যে চীন এ শুল্ক আরোপের তীব্র সমালোচনা করেছে।
তবে এর কয়েক ঘণ্টা পরই ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার আগে তার প্রশাসন বিক্ষোভে নিহতদের সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, আমার কাছে মনে হচ্ছে তারা খুবই খারাপ আচরণ করেছে, কিন্তু তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আক্রমণ করলে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোয় হামলা চালানো হবে বলে ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক মিত্রদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ এক নিরাপত্তা বৈঠকে জানান, হামলাকারী শত্রুদের জন্য তাদের কাছে অনেক 'চমক' রয়েছে।
ট্রাম্পের হুমকির জবাবে তিনি বলেন, ইরান শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে নিজেদের দেশ রক্ষা করবে এবং সেই প্রতিরোধ হবে ‘অত্যন্ত বেদনাদায়ক’। এছাড়া যেসব দেশ ইরানবিরোধী হামলায় সহায়তা করবে, তারাও ইরানের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য হবে।
ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আরো বলেন, গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে যে ক্ষতি হয়েছিল, তা এরই মধ্যে পূরণ করা হয়েছে। বর্তমানে ইরানের সামরিক সক্ষমতা আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশী হস্তক্ষেপ মোকাবেলায় তারা পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
বর্তমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বিমান ঘাঁটি আল উদাইদ থেকে সেনা সদস্যদের সরিয়ে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন কূটনীতিকরা।
ইরানের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে তেহরানে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস তাদের নাগরিকদের দ্রুত দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে তাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে ও বিক্ষোভ এলাকাগুলো এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াসহ বেশ কিছু দেশ সহিংসতার আশঙ্কায় তাদের নাগরিকদের ইরান ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছে।















