গণনা করা সবকিছু যেমন গণনার মধ্যে ধরা যায় না, তেমনি সবকিছু গণনাও করা যায় না। ২০২০ সাল কিংবা এর পরের সময়ের দিকে যখন তাকাব, তখন এ পুরনো প্রবাদ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক অভিজাতদের বিরুদ্ধে এক ধরনের ক্রোধ সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে। অনেকে মনে করে, সাধারণ মানুষ কী চায়, অভিজাতরা সে দিকগুলোর প্রতি ঠিকভাবে নজর দেয় না। তবে যখন সর্বোচ্চ বাজার উৎপাদন ও মুনাফার কথা আসে, তখন এ অভিজাতদের বিকল্প এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।

বর্তমানে একটি দেশের অর্থনীতি কতটা সফল, তা নির্ভর করে জিডিপি হারের ওপর। দীর্ঘদিন ধরে একটি অর্থনীতির আকার ও সফলতার নির্দেশক হিসেবে এটি ব্যবহার হয়ে আসছে। অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে থাকে এ জিডিপি। রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা জিডিপি হারের ওপর কড়া নজর রাখেন। কিন্তু জিডিপি গভীরভাবে ত্রুটিপূর্ণ এবং এটি ক্রমেই স্পষ্টতর হয়ে উঠছে।

জিডিপি বিস্তৃতভাবে একটি নির্ভরযোগ্য ও বৈষয়িক মানদণ্ড। তবে এটি একটি জটিল পরিসংখ্যান এবং এর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে ত্রুটি, অমীমাংসিত বিতর্ক এবং পরিবর্তনশীল পদ্ধতি ও সংজ্ঞার দেখা পাওয়া যাবে। মূল সমস্যা হলো জিডিপি অর্থনৈতিক কল্যাণ পরিমাপ করে না, শুধু উৎপাদন আমলে নেয়। ১৯৩০ দশকে যখন অর্থনীতিবিদ সাইমন কুজনেটস জিডিপির প্রকৃত পদ্ধতি তুলে ধরেন, তখন এটি কল্যাণের ওপর বেশি জোর দিয়েছিল। তবে মার্কিন প্রশাসন তাকে এমন একটি নির্দেশক তৈরি করতে বলে, যা রাজস্ব নীতিকে নির্দেশনা দেবে, কর কতটা হওয়া উচিত তা নির্ধারণ করবে এবং ব্যয় সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে; সাইমন সেটাই করেন।

এর ফলাফল যেটি দাঁড়ায় সেটি বাজার কার্যক্রমের ওপর এককভাবে নজর দেয়। দ্বৈত গণনার ঝুঁকি এড়াতে কাঁচামাল বাদ দিয়ে এ হিসাবে চূড়ান্ত পণ্য ও সেবাকে আমলে নেয়া হয়। তথাপি বাজারবহির্ভূত কাজ যেমন গৃহকর্ম কল্যাণ হিসেবে গণ্য করা হয়। একইভাবে কিছু বাজার কার্যক্রম কল্যাণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যেমন দূষণের মতো উৎপাদনের নেতিবাচক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। এর ওপর মান-নির্ণায়ক বিবেচনায় কয়েক বছরে জিডিপির সংজ্ঞায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে সরকারি সেবা এবং পরে আর্থিক সেবাকে শেষ পর্যন্ত উৎপাদনশীল ও মূল্যবান মনে করা হয় এবং এটি জিডিপির সংজ্ঞায় যোগ করা হয়। উল্লেখযোগ্যভাবে এদের কেউই কল্যাণ পরিমাপক হিসেবে বিস্তৃতভাবে জিডিপির ব্যবহার বন্ধ করেনি।

তবে এখানেই সমস্যা শেষ হচ্ছে না। আরেকটি ইস্যু হলো, মূল্যস্ফীতিকে কীভাবে হিসাব করা হবে, কেননা বাড়তে থাকা মূল্য নামিক    (নমিনাল) জিডিপি বাড়াতে পারে, অথচ যখন উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ছে না। উৎপাদন পরিমাপ করা ক্রমবর্ধমান হারে জটিল হয়ে উঠছে; কেননা পণ্য ও সেবার মিশ্রণ ও বৈশিষ্ট্যে আরো দ্রুত হারে পরিবর্তন ঘটছে।

ডিজিটালাইজেশনের কারণে সৃষ্ট জটিলতাও আমলে নিতে হবে। এখনকার স্মার্টফোনে যা বেশ বোঝা যায়। মাত্র এক দশক আগে যে মোবাইল ফোন পাওয়া যেত, তার সঙ্গে এখনকার স্মার্টফোনের মিল অল্পই। মান পরিবর্তন হিসাবে নিয়ে মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিসংখ্যানবিদরা স্মার্টফোনের (এবং এটি আসার ফলে ক্যামেরা, ক্যালকুলেটর, পোর্টেবল মিউজিক প্লেয়ার ও অন্যান্য ডিভাইসের মৃত্যু) উপস্থিতি হিসাব করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় তারা বাজারমূল্য ও মানের (ভ্যালু) মধ্যে বিভেদ করছে, অথচ এ মান কল্যাণে অবদান রাখছে।

এ সংশ্লিষ্ট একটি সমস্যা হলো, বেশি অর্থ থাকলেই মানুষ সুখী হয় না। এর একটি কারণ হলো মানুষ নিজের অবস্থান বা মর্যাদা নিয়ে চিন্তিত থাকে এবং যত দিন তাদের মর্যাদা অন্যদের তুলনায় বেশি থাকে ততদিন হয়তো তারা কম অর্থ নিয়ে চিন্তিত হয় না। তাই জিডিপির বিন্যাস শুধু মোট সংখ্যার প্রকাশ নয়, বরং জাতীয় কল্যাণের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। অথবা যেমন একবার এক অর্থনীতিবিদ সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছিলেন, ব্রেক্সিট হলে যুক্তরাজ্যের উৎপাদন কতটা কমতে পারে। এর উত্তরে এক নারী বলেছিলেন, সেটা তো তোমাদের হতচ্ছাড়া জিডিপি; আমাদের নয়।

আরেকটি সমস্যা হলো ভবিষ্যতের উন্নতি আমলে নেয় না জিডিপি। যদি ভবিষ্যতের উৎপাদনকে জলাঞ্জলি দিয়ে বর্তমানের উৎপাদন বাড়ে, তবে ভবিষ্যতের কল্যাণ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এটা সত্যি যে, পরিসংখ্যানবিদরা নিট জাতীয় উৎপাদন (এনডিপি) হিসাব করে বাস্তব সম্পদের অবচয় আমলে নেন। তবে এনডিপি শুধু গল্পের একটা দিকই বলে। অর্থনৈতিক কার্যক্রমের টেকসইতার সম্পূর্ণ চিত্র পেতে হলে, মানবসম্পদে কী পরিমাণ বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং সম্পদ নিঃশেষকরণের নেতিবাচক প্রভাবও আমলে নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

যদি এটা সত্য হয় যে, ‘আপনি যা পরিমাপ করতে পারেন, তা-ই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন’, তবু বলব জিডিপিসংশ্লিষ্ট সমস্যার সমাধান এ মতের সঙ্গে যায় না। বরং জিডিপিসংশ্লিষ্ট সমস্যা বিশেষ করে যন্ত্রণাদায়ক, কেননা এগুলো সরকারের নীতি ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত বিকৃত করার জন্য দায়বদ্ধ। এর ওপর যদি আমরা ধরে নিই জিডিপি কল্যাণ পরিমাপ করে না, তবে আমাদের প্রশ্ন করতে হবে কার স্বার্থে জিডিপি কাজ করছে।

নিশ্চিত হওয়ার জন্য জিডিপি অন্তত পরিসংখ্যান সংকলনের একটি প্রতিষ্ঠিত কাঠামোগত রূপ এবং রাজস্ব নীতি সিদ্ধান্ত গ্রহণে এর বাজার বিশ্লেষণ বেশ উপকারী। এর ওপর যখন জিডিপি বহু পথে বিকৃত করা যায়, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিকৃত করার পরিমাণ বাড়ছে, এটা নিয়ে অনেক অর্থনীতিবিদ সন্দেহ প্রকাশ করছেন। তাদের মতে, জিডিপি ত্রুটিযুক্ত হতে পারে, তবে এটি এখনো আমাদের হাতে থাকা জাতীয় উন্নতির সবচেয়ে উত্তম নির্দেশক।

সার্বিকভাবে, জিডিপির প্রভাবশালী অবস্থানের জন্য বহুলাংশে দায়ী ভুলত্রুটি ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প না থাকা। অনেক বিকল্পের ধারণা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে, যেমন তারা প্রকৃতভাবে কী পরিমাপ করতে চায়। এটি কি পারিবারিক কল্যাণ পরিমাপ করতে চায়? টেকসই জাতীয় সম্পদে যে পরিবর্তন হয়, তা হিসাব করবে? অন্যান্য ইস্যু তো আরো বাস্তব: আমাদের হাতে কি সঠিক তথ্য রয়েছে? আমরা কি অধরা ও প্রাকৃতিক অনুগ্রহের মতো সম্পদ হিসাবের বাইরে রাখছি।

তা যে অপূর্ণতা থাকুন না কেন, জিডিপি সুস্পষ্ট ত্রুটিগুলো এবং জিডিপির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এবং এটি নিয়ে পড়ে থাকা অভিজাত শ্রেণী বলছে, একটি যথাযথ বিকল্পের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। মজার বিষয় হলো, যখন ডিজিটালাইজেশন জিডিপি পরিমাপ করা কঠিনতর করে তুলেছে, তখন এরই সহায়তায় বিকল্প তৈরি করা যেতে পারে। ডিজিটালাইজেশনের মধ্য দিয়ে যে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ চলছে, তা কাজে লাগিয়ে একটি নতুন পরিমাপক তৈরি করা যেতে পারে। করপোরেট পারফরম্যান্স পরিমাপ করে, এমন অনেকগুলো নির্দেশকের দেখা পাওয়া যাচ্ছে। একদা ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক মুনাফার সংখ্যা একটি মাত্র আকারে আসত। এখন বিভিন্ন আকারে পাওয়া যায় এবং বিভিন্ন অতিরিক্ত তথ্যও দেয়। এর ওপর মার্কিন সিইওদের সংগঠন বিজনেস রাউন্ডটেবিল ঘোষণা দিয়েছে, তারা এখন থেকে তাদের মুনাফার অংশ শুধু শেয়ারহোল্ডারদের দেবে না বরং গ্রাহক, কর্মী, সরবরাহকারী ও গোষ্ঠীকেও দেবে।

এবার প্রথম নয়, এর আগেও করপোরেট খাত স্বল্পমেয়াদি মুনাফার বাইরে কিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু আমরা ২০২০ সালে প্রবেশ করতে যাচ্ছি এমন একটি সময়, যখন পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। এ বছর ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতারা সামাজিক কল্যাণ পরিস্থিতির উন্নতি করার জন্য বড় চাপে থাকবেন। আর এ কাজে সফল হওয়ার জন্য তাদের অবশ্যই প্রথমে নির্ধারণ করে নিতে হবে তারা কীভাবে হিসাব করবেন এবং কী হিসাব করবেন।

 

মার্ক ক্লিফ: হেড অব গ্লোবাল রিসার্চ, আইএনজি গ্রুপ

ভাষান্তর: সাঈদ সরকার