পুঁজিবাদের ওপর অনেকেই আস্থা হারিয়ে ফেলছে বলে অনুমেয়, এর পাশাপাশি অর্থনীতিবিদ, যাদের কিনা আত্মপক্ষ সমর্থনকারী বা কৈফিয়তদাতা হিসেবে মনে করা হয়, তাদের ওপর সাধারণ মানুষের যতটুকু ভরসা ছিল, তাও যেন ফুরিয়ে যেতে শুরু করেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদক বিনিয়ামিন অ্যাপলবামের নতুন গ্রন্থ ‘দ্য ইকোনমিস্টস’ আওয়ার’ অনেক অস্বস্তিকর প্রশ্ন উত্থাপন করে। যেমন অর্থনীতি কি একটি ভুল বাঁক নিয়েছে? আমার মধ্যে যারা শিকাগোর নিওক্ল্যাসিক্যাল স্কুলে নাম লেখাইনি, তারা কি নিজেদের জোর করে অন্যদিকে নিয়ে যাচ্ছি? শিকাগোর অর্থনীতিবিদদের তুলনায় কেমব্রিজের অর্থনীতিবিদরা যদি আরো বেশি প্রভাব অর্জন করতে সমর্থ হতেন, তবে কি বিশ্ব একটি উত্তম জায়গায় পরিণত হতো? উল্লেখ্য, কেমব্রিজ বলতে আমি ইংল্যান্ডের কেমব্রিজকেই বুঝিয়েছি।

পঞ্চাশ বছর আগে কেমব্রিজে আমি যখন একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে তৈরি হচ্ছি, তখন দেখতাম অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিকরা একে অন্যের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলছেন। তাছাড়া সেখানে কল্যাণ অর্থনীতির বিভিন্ন দিক গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণপূর্বক সে বিষয়ে শিক্ষাদান করা হতো। ১৯৭১ সালে জন রোলসের যুগান্তকারী ‘আ থিওরি অব জাস্টিস’ গ্রন্থে বিষয়গুলো বিস্তৃতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। অমর্ত্য সেন, অ্যান্থনি অ্যাটকিনসন কিংবা জেমস মিরলিজ তখন কেমব্রিজে, তাদের সবাই ন্যায্যতা ও আয়বৈষম্যের সম্পর্ক নিয়ে ভাবছেন।

কেনেথ অ্যারোর ‘সোস্যাল চয়েস অ্যান্ড ইনডিভিজুয়াল ভ্যালুস’ নামক গ্রন্থটি দিয়ে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন অমর্ত্য সেন। কলকাতায় স্নাতক শিক্ষার্থী হিসেবে পাঠরত অবস্থায় বইটিতে তিনি সামাজিক পছন্দ তত্ত্ব, আপেক্ষিক ও পরম দারিদ্র্য, উপযোগবাদ এবং এর বিকল্প সম্পর্কে পড়েছিলেন। প্রণোদনা চাহিদার সঙ্গে সমতার জন্য কীভাবে অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করতে হয়, জেমস মিরলিজ সে প্রশ্নের সমাধান করে দেখিয়েছিলেন। অ্যাটকিনসন দেখিয়েছিলেন, পরিমাপের সঙ্গে বৈষম্য-বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকে কীভাবে একীভূত করা যায়।

ততদিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো স্কুল অন্যপথে হাঁটছে। যদিও অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতিতে মিল্টন ফ্রিডম্যান, জর্জ স্টিগলার, জেমস বুচানন এবং রবার্ট লুকাসদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান নিয়ে কারো বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। পাশাপাশি আইন ও অর্থনীতিতে রোনাল্ড কোয়েস আর রিচার্ড পসনারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা সর্বজনবিদিত। তবুও বৈষম্য ও ন্যায্যতা প্রসঙ্গে বিস্তৃত পরিসরে কাজ করার বিষয়গুলো কল্পনা করা কঠিন। প্রকৃতপক্ষে চূড়ান্ত সংস্করণগুলোতে, অর্থমানসম্পন্ন জীবনের মাপকাঠি হয়ে ওঠে, আর ন্যায্যতার বিষয়টি মূলত নেহাত একটি গুণ হিসেবে থেকে যায়। ১৯৮৩ সালে আমি যখন যুক্তরাষ্ট্রে আসি, তখন বৈষম্য বিষয়ে কথা বলায় আমাকে ‘অপেশাদার’ উপাধি দেয়া হয়েছিল। সম্প্রতি স্টিগলারের ১৯৫৯ সালের যুক্তিগুলো পড়তে বসে আমি আমার নিজের প্রতিক্রিয়াগুলো নিয়ে চিন্তা করেছি। যেমন ‘অর্থনীতির পেশাদারি অধ্যয়ন ব্যক্তিকে রাজনৈতিকভাবে রক্ষণশীল করে তোলে’। আমি ভাবতাম এটি বোধ হয় ছাপার ভুল; কেননা আমার জীবনে আমি কোনো রক্ষণশীল অর্থনীতিবিদের দেখা পাইনি।

শিকাগো অর্থনীতি এবং ফ্রিডম্যানের নিজস্ব যুক্তির প্রভাবগুলো এখনো ব্যাপকভাবে রয়ে গেছে। ভিন্ন ভিন্ন রুচিসম্পন্ন লোকের পছন্দের ভিন্নতার ওপর আলোকপাত করে বেশির ভাগ বৈষম্যকে তিনি প্রাকৃতিক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি সুযোগের সমতাতে বিশ্বাসী ছিলেন, তবে সম্পত্তি করকে (এস্টেট ট্যাক্স) ‘খারাপ কর’ যা কিনা ‘ত্রুটিযুক্ত’ এবং ‘বাজে খরচকে উৎসাহিত করে’ বলে তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। সাতশজনের বেশি অর্থনীতিবিদ সম্প্রতি ওই দাবিগুলোকে সমর্থন করেছেন এবং আজ আমরা সম্পদ করের (ওয়েলথ ট্যাক্স) বিপরীতে ঠিক একই ধরনের যুক্তির কথা বলতে শুনছি। ফ্রিডম্যান, যিনি দেশগুলোর মধ্যে করের প্রতিযোগিতার পক্ষে ছিলেন, মনে করতেন ফলাফলের বৈষম্য সীমাবদ্ধ করার প্রচেষ্টা কেবল স্বাধীনতা হ্রাস করবে না, বরং আরো বেশি বৈষম্যের কারণ হতে পারে। মুক্তবাজারগুলো সমতা ও স্বাধীনতা দুটিই উৎপাদন করে। তবে পরিস্থিতি দেখে মনে হয় না যে বিষয়গুলো সেভাবে কাজ করছে।

বরং এর বিপরীতে আমরা এমন একটি পৃথিবী পেয়েছি, যেখানে স্যাকলার পরিবারের মালিকানাধীন পারডিউ কোম্পানি কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ওপিওয়েড উপাদানযুক্ত ওষুধ সেবনের ফলে লাখ লাখ আমেরিকানের (প্রায় চার লাখ) প্রাণহানি ঘটে। যার ক্ষতিপূরণ বাবদ তারা ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ প্রদান করে। আমেরিকার সেনাবাহিনী যখন আফগানিস্তানের হেলমান্দ প্রদেশে তালেবানদের আফিম উৎপাদন ক্ষেত্রগুলোকে লক্ষ্য করে বোমা হামলা চালাচ্ছিল, তখন কিন্তু বেবি পাউডার ও ব্র্যান্ড-এইড প্রস্তুতকারক আমেরিকান কোম্পানি জনসন অ্যান্ড জনসন তাসমানিয়ায় পপি উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধির ইন্ধন জুগিয়েছে। ব্রিটিশরা ১৮৩৯ সালে চীনে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছিল ব্রিটিশ (এবং ভারতীয়) আফিম চোরাচালানকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। আমাদের বেসরকারি ইকুইটি সংস্থাগুলো অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা ক্রয়ের পাশাপাশি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিজস্ব চিকিৎসক রাখছে, কারণ কোনো রোগীর বীমা যদি সেই সুনির্দিষ্ট হাসপাতালের আওতায় না পড়ে, তবে তারা ওই ব্যক্তির ওপর ‘অতিরিক্ত’ চার্জ আরোপ করতে পারবে।

সত্যিকার অর্থে আমরা যেমনটা প্রত্যাশা করি অনিয়ন্ত্রিত বাজারগুলো কিন্তু ঠিক সেভাবেই কাজ করবে যেমন—স্থানীয় একচেটিয়াত্ব প্রতিষ্ঠা করো এবং অসচেতন (কখনো কখনো আক্ষরিক অর্থে তা-ই) গ্রাহকের অস্থিতিস্থাপক চাহিদার বিপরীতে একটি উচ্চমূল্য আরোপ করো। অতীত পর্যালোচনা করলে আমরা দেখি এবং এতে বিস্মিত হওয়ারও কিছু নেই যে, মুক্তবাজারগুলোতে যেখানে সরকার ধনীদের মাশুল আদায়ের অনুমতি দেয়, সেখানে সমতা নয় একটি নিষ্ক্রিয় অভিজাত শ্রেণী তৈরি হয়। সর্বোপরি এটাই কিন্তু প্রথম নয় যে, স্বাধীনতা প্রসঙ্গে ইউটোপীয় (কাল্পনিক আদর্শ রাষ্ট্র অর্থে) বাগাড়ম্বরপূর্ণ বিবরণ কিন্তু অন্যায্য সামাজিক ডিসটোপিয়া (বিচ্ছৃঙ্খল পৃথিবী) তৈরি করে।

ফ্রিডম্যানের সবচেয়ে অহংকারী অর্জনটি ধরেই বিনিয়ামিন অ্যাপেলবাম তার সেরা উদাহরণটি টেনেছেন: একটি সম্পূর্ণ-স্বেচ্ছাসেবক সামরিক বাহিনীর প্রবর্তন—আজ বেশির ভাগ অর্থনীতিবিদই এটি সমর্থন করেন বলেই আমি সন্দেহ প্রকাশ করছি। কিন্তু স্বল্পশিক্ষিত এবং যাদের হাতে কম সুযোগ রয়েছে, তাদের সামরিক বাহিনীতে যোগদানের জন্য আকর্ষণ করার বিষয়টি কি সত্যিকার অর্থেই একটি ভালো ধারণা? ২০১৪ সালের জরিপ অনুসারে, ৮৪ শতাংশ অফিসারের তুলনায় তালিকাভুক্ত সৈনিকদের মধ্যে স্নাতক ডিগ্রিধারীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৭ শতাংশ।

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান কেস এবং আমি আমাদের একটি গবেষণায় আমেরিকার উচ্চশিক্ষিত ও কম শিক্ষিত নাগরিকদের মধ্যে বড় ধরনের অসমতার বিষয়টি চিহ্নিত করি। আমাদের গবেষণাতে ক্রমবর্ধমান মজুরিবৈষম্য, জোরপূর্বক শ্রম, বিবাহ, সামাজিক একাকিত্ব, মানসিক যন্ত্রণা, মদে আসক্তি, মাদকজনিত মৃত্যু এবং আত্মহত্যার মতো বিষয়গুলো উঠে এসেছে। আর এখন শিক্ষিত উচ্চবিত্তরা কোথায়, কখন, কার সঙ্গে লড়াই করবে তার জন্য স্বল্পশিক্ষিতদের নিজ জীবনের ঝুঁকি নিতে বলা হচ্ছে।

আমরা মূলত পারস্পরিকভাবে একত্র হয়ে দায়িত্ব পালনের সামাজিক সংযোগগুলোকে হারিয়ে ফেলেছি। এ পর্যায়ে শুনুন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ রবার্ট সলো কী বলেছেন। ১৯৪১ সালে জাপান কর্তৃক যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি পার্ল হারবার আক্রমণের সূত্র ধরে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সেনাবাহিনীতে কাজের ওই সময়কে তিনি তার জীবনের সবচেয়ে সেরা ও গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের কাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেন কিংবা দোষী সাব্যস্ত ও অভিশংসিত হওয়ার পর তিনি যদি হোয়াইট হাউজ ছাড়তে রাজি না হন, সেক্ষেত্রে ব্যক্তি ও স্থানভেদে নির্বাচিত ও তালিকাভুক্ত সামরিক বাহিনী যদি ঐকান্তিকভাবে ট্রাম্পকে সমর্থন করে, তখন আমরা হয়তো আমাদের সামাজিক বিভক্ত অবস্থার জন্য আফসোস করতে পারি। শিকাগো অর্থনীতি আমাদের বাজার প্রসঙ্গে একটি সুনির্দিষ্ট ধারণা দিয়েছে, তবে বাজারের সীমাবদ্ধতা, এর মন্দ দিক কিংবা আদৌ এখানে কী ধরনের কাজ করার আহ্বান জানানো উচিত নয়, সেগুলো সম্পর্কে খুব সামান্যই বিবেচনার সুযোগ দেয়। দার্শনিকরা কখনই এটি গ্রহণ করেননি যে, অর্থই কল্যাণের একমাত্র পরিমাপক। যদিও অর্থনীতিবিদরা তাদের রচনা পড়তে ও তাদের কথা শুনতে সামান্য সময়ই ব্যয় করেন। জেমস মিরলিজের দীর্ঘকালীন সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ পিটার ডায়মন্ড, তিনি ইমানুয়েল সায়েজের সঙ্গে যৌথভাবে ধনীদের ওপর উচ্চ প্রান্তিক করহার পুনর্নির্ধারণে মার্কিন সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেনের পরিকল্পনা প্রস্তুতে সহায়তা করেছেন। উল্লেখ্য, এলিজাবেথ ওয়ারেন হলেন, ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ প্রদানকারী শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা। ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, আমরা যদি কেমব্রিজের অর্থনীতিবিদদের মতামতগুলোকে অধিক হারে গ্রহণ করতে শিখি, তাহলে শুধু ধনতন্ত্র নয়, স্বয়ং অর্থনীতির ওপরও আমরা নিজেদের হারানো বিশ্বাস ফিরে পেতে পারি।

 

আঙ্গাস ডিটন: নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস