রাশিয়া, তার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সমার্থক নয়, এমনকি তার ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির বা সিরিয়া ও পূর্ব ইউক্রেনে ক্রেমলিনের ইচ্ছা পূরণকারী বেসরকারি সামরিক কোম্পানির প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোঝিনেরও সমার্থক নয়। বরং বলা যায়, রাশিয়া তার ১৪ কোটি ৬০ লাখ নাগরিকের সমষ্টি, যাদের সিংহভাগই কেবল একটি সভ্য বিশ্বে বসবাস করতে চান। তারা এমন একটি দেশে বাস করতে চান, যেখানে স্বাধীনতা ও মানবাধিকারকে সম্মান দেয়া হয় এবং যোগ্য ও আস্থাভাজন স্বাধীন সরকার যার পৃষ্ঠপোষক।

কিন্তু দেশ ও বিদেশ, কোনো জায়গায়ই রাশিয়ার প্রকৃত কণ্ঠস্বর সবসময় শ্রুতিগোচর হয় না। বহিরাগত পর্যবেক্ষকরা ভাবতে পারেন বর্তমান সরকারের প্রতি হয়তো জনসমর্থন রয়েছে। কিন্তু এটা প্রকৃত সত্য নয়। এবারের গ্রীষ্মে মস্কো ও অন্যান্য শহরে যে গণবিক্ষোভ হয়েছে, সে আন্দোলন মূলত পুতিন ও তার দলের হাতে আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা থাকলেও, রুশ জনতা নিজেদের অধিকার ও গণতন্ত্রের দাবি তুলতে প্রস্তুত, সে বিষয়টি তুলে ধরেছে।

বিশ্বমঞ্চের কাছে, আমাদের অজুহাত দিয়ে পুতিন তার হাইব্রিড যুদ্ধ পরিচালনা করে যাচ্ছেন। অথচ কখনই আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়া হয়নি। এদিকে ক্রেমলিনও ইউক্রেনে সামরিক অভিযান চালানোর কথা অব্যাহতভাবে অস্বীকার করে আসছে। কারণ ক্রেমলিন জানে, ডোনবাস ও ক্রাইমিয়ায় রুশ সেনার উপস্থিতি অবৈধ বলে বিবেচিত হবে।

বরং পুতিনের শাসনামলকেই একটি হাইব্রিড শাসনামল হিসেবে দেখা যেতে পারে। আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার একটি সংবিধান রয়েছে, যেখানে আইনের শাসনের নিশ্চয়তা, ক্ষমতার বিভাজনের পৃষ্ঠপোষকতা, একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা ও জনগণের হাতে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব সমর্পণের কথা বলা আছে। কিন্তু বাস্তবতায় কর্তৃপক্ষগুলোর ওপর রুশ জনগণের কোনো প্রভাবই নেই। সরকারের সব শাখা পুতিন ও তার অভ্যন্তরীণ চক্রের কাছে জবাবদিহি করে থাকে।

একইভাবে রাশিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের সরকারই নির্বাচিত করে থাকে। স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী আঞ্চলিক সরকারগুলোও মূলত কেন্দ্রীয় প্রশাসনের ওপরই নির্ভরশীল। প্রয়োজনে সরকার নির্বাচনের প্রকৃত প্রতিযোগিতা বন্ধের জন্য নানা পন্থাও অবলম্বন করে। বিরোধী প্রার্থীদের দাঁড়াতে বাধা দেয়া, গণমাধ্যমে বিরোধীদের প্রচারণা করতে না দেয়া এবং নির্বাচন জালিয়াতিতে জড়ানোর মতো ঘটনা ঘটানো হয়।

এক্ষেত্রে দুর্নীতিবিরোধী আইনজীবী অ্যালেক্সেই নাভালনির ঘটনাটি উদাহরণ হিসেবে দেখতে পারি। ২০১৮ সালের মার্চে নাভালনি রাশিয়ার গণতন্ত্রকামী সক্রিয় বিরোধী নেতা ছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট পদের জন্য নির্বাচনে দাঁড়াতে তাকে বাধা দেয়া হয়। আর সে সুযোগ পুতিন খুব সহজে ক্রেমলিনের বাছাই করা প্রার্থীদের নিয়ে পুনর্নির্বাচন করে ফেলেন।

কিন্তু ওই বছরেরই শেষদিকে আঞ্চলিক নির্বাচনের সময় ভোটবিরোধী ব্যাপক গণবিক্ষোভ মূলত ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি রুশদের অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ ছিল। প্রশাসন ও রাজ্যের প্রপাগান্ডামূলক প্রচারের সব শক্তি নিজেদের পক্ষে থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনে ইউনাইটেড রাশিয়ার বহু প্রার্থীকে নির্বাচনে পরাজিত হতে দেখা যায়, বিশেষ করে তারা পরাজিত হন নির্বাচনের আগে, যাদের পুতিনের সঙ্গে হাত মেলানোর ছবি প্রকাশ পেয়েছিল। ভ্লাদিমির ওব্লাস্টে ইউনাইটেড রাশিয়ার সভেত্লানা অরলোভা পরাজিত হন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপিআর) ভ্লাদিমির সিপইয়াগিনের কাছে। কেন তাকে ভোট দিয়েছেন, সাংবাদিকরা জানতে চাইলে বহু মানুষই উত্তর দেয়, তারা এমনকি সিপইয়াগিনকে না চিনলেও অরলোভার বাদে অন্য আর যে কাউকে নির্বাচিত করতে চেয়েছেন।

চলতি বছর, বিশেষ করে সমস্যাপূর্ণ অঞ্চলগুলোয় গণতন্ত্রপন্থী বিরোধী প্রার্থীদের নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ নির্বাচনকেন্দ্রিক নিজেদের আগের ‘ভুলগুলো’ ‘সংশোধন’ করে নেয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে, এমনকি ‘পকেট’বিরোধী প্রার্থীদেরও (দুমার আসনবিহীন দলগুলোর প্রার্থী, যারা মূলত ক্রেমলিনের ছদ্মবেশ নিয়ে নির্বাচন করে) নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ট্রান্সবৈকালের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোয়ও এ কাজ করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও, খবারভস্ক টেরিটোরির আইনসভা নির্বাচনে ইউনাইটেড রাশিয়ার বদলে এলডিপিআর জয় পায়। অথচ খবারভস্ক টেরিটোরির আইনসভা নির্বাচনে ‘পকেট’ প্রার্থীদেরও অনুমোদন ছিল।

আমি নিজে মস্কো সিটি দুমা নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম। যেখানে স্বতন্ত্র, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের পিটিশনের স্বাক্ষর জাল করার মতো অযৌক্তিক, বানোয়াট অভিযোগের ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দেয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে নির্বাচনী এলাকাগুলো থেকে আমাদের উল্লেখযোগ্য সমর্থন ছিল এবং আমরা এসব অবৈধ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে আপিল করেছিলাম। কিন্তু বিচার বিভাগও ক্রেমলিনের পদানত থাকায়, ন্যায়বিচার পাওয়া যায়নি। আর নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের প্রার্থিতা প্রত্যাখ্যান হওয়ার প্রতিবাদে হাজার হাজার মস্কোবাসী রাস্তায় নেমে পড়ে।

এক ঝাঁক আগ্রাসী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ জনগণের বিক্ষোভের প্রতিক্রিয়া দেখায়। কয়েক হাজার মানুষকে আটক এবং গণতন্ত্রপন্থী দলগুলোর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়। এ সময় রাতে আমাদের বাসাবাড়িতে অভিযান চালায়। কয়েক ডজন মানুষকে তারা কারাগারে পাঠায়। এমনকি স্বতন্ত্র অ্যান্টি-করাপশন ফাউন্ডেশনকে বিদেশী এজেন্ট হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আমাদের ব্যাংক হিসাবগুলো জব্দ করে রাখে। ৩০ দিন সরকারি হেফাজতে থাকাকালীন জুলাইয়ের শেষদিকে নাভালনির ওপর অজানা বিষ প্রয়োগ করা হয়।

মস্কোর নির্বাচন নিয়ে পুতিন এতই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন যে, গণতন্ত্রকামী বিরোধীদের ছত্রভঙ্গ করতে তিনি আদালত, পুলিশ, প্রসিকিউটর, আইন মন্ত্রণালয়, রসকোমনেজারসহ (সরকারি সেন্সরশিপ সংস্থা) অন্যান্য সব সংস্থার পূর্ণ শক্তি মাঠে নামান। আর এ পূর্ণ শক্তি মোতায়েনেরও যথেষ্ট কারণ রয়েছে। রাজধানীর মতো আসনে বিরোধী পক্ষের জয় ‘পুতিন ও তার দলের প্রতি রুশদের প্রকৃত সমর্থন’ নিয়ে প্রচলিত মিথ ও গণতন্ত্রকামী বিরোধী পক্ষ কেবল জনগোষ্ঠীর ক্ষুদ্র একটি অংশের প্রতিনিধি, এমন ধারণা ধ্বংস করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।

এ মিথের ওপরই ব্যাপকভাবে নির্ভর করে আছেন পুতিন। দীর্ঘদিন ধরে ঘরে ও বাইরে প্রপাগান্ডা চালানোর মূল উপজীব্যও এ মিথ। ফলে মস্কোর স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচনকে পুতিন যে বৈধতার দাবি করে আসছেন, সেটি মিথ্যা প্রমাণ করতে পারে। একই সঙ্গে সারা রাশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলেও রাজধানীতে কী হচ্ছে, তার প্রভাব পড়তে পারে।

আর ক্রেমলিন কখনই এমন একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপনের অনুমোদন দেবে না। পুতিন চান, বিশ্ব ভাবুক তিনি রুশ জনতার প্রতিনিধি। কিন্তু নিজেদের প্রতিনিধিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের দাবি জানানো, যারা পুতিনের এ ক্ষমতাকেই একটি স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরীক্ষায় দাঁড় করাতে চান, সেই রুশদের ওপর চালানো সহিংস অভিযানই পুতিনের মিথ্যাচারের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

 

ল্যুবভ সোবোল: অ্যান্টি-করাপশন ফাউন্ডেশনের আইনজীবী ও মস্কোর আন্দোলনের অন্যতম নেতা

ভাষান্তর: ইসরাত জাহান পপি