২০২০ সালে উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ৭৫তম বার্ষিকীতে পদার্পণ করছে বিশ্ব।
কিন্তু এ মুহূর্তে অধিকাংশই সম্মত হবে যে, জাতিসংঘ, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং অন্য বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত এ বৈশ্বিক কাঠামোকে জলবায়ু পরিবর্তন, বেড়ে চলা অসমতা এবং ধীর হয়ে আসা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অবশ্যই হালনাগাদ, আধুনিকায়ন করতে হবে।
তবে প্রথমে আরো সংহতিমূলক ও টেকসই সমাজ গঠন ছাড়া বৈশ্বিক পর্যায়ে সংস্কার আনা বা করা সম্ভব হবে না।
কাজটি করার একটি উপায় হলো, আয়ারল্যান্ড এবং অন্য কিছু দেশের সিটিজেন অ্যাসেম্বলির মতো জন-অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া উন্নয়ন করা।
সদ্যবিদায়ী ২০১৯ সালে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আবারো আজকের চ্যালেঞ্জগুলোর জন্য অপ্রস্তুত, অসজ্জিত ও অদক্ষ প্রমাণ হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের গোলযোগপূর্ণ ব্রেক্সিট প্রক্রিয়ার মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আটকে বা স্থবির (প্যারালাইজড) রয়ে গেছে।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন সংস্থাটির বিরোধ নিষ্পত্তি কাঠামোয় (বডি) নিজেদের প্রার্থী নিয়োগ বন্ধ করে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে কোণঠাসা করেছে।
একইভাবে জাতিসংঘ বড় বিপাকে পড়েছিল, যখন চিলি বিদায়ী বছরের কপ২৫ জলবায়ু সম্মেলন আয়োজন থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছিল।
এসব উদাহরণ ইঙ্গিত দেয় যে, প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর বিষয়ে আমাদের সামষ্টিক সাড়ার সামর্থ্য এখন হুমকির মুখে।
কিন্তু এটিও ঠিক, কোনো বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কারও সমস্যার সমাধান করতে পারবে না, যদি তার সদস্য রাষ্ট্রগুলো এবং তাদের প্রতিনিধিত্ব করা জনগোষ্ঠীগুলো রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে বিভাজিত থেকে যায়।
সর্বোপরি ব্রেক্সিট সংকট হলো, কেবলই ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপার নয়, উপরন্তু এটি যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক মেরুকরণেরও ব্যাপার।
এদিকে ডব্লিউটিওর সংকট বিস্তৃত হয়েছে ওয়াশিংটন ডিসিতে অচলাবস্থা এবং কীভাবে বাণিজ্য নীতিগুলো হালনাগাদ বা আধুনিকায়ন করা হবে, সে বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর মতদ্বৈধতা বা মতভিন্নতা থেকে।
আবার কপ২৫ সম্মেলনের আয়োজন শেষ মুহূর্তে বাতিল ছিল চিলিতে সামাজিক অস্থিরতার ফল; আন্তর্জাতিক নেতাদের উৎসাহ ঘাটতি নয়।
বৈশ্বিক শাসন বা পরিচালন ব্যবস্থার পিরামিডের চূড়ায় মনোযোগ দেয়ার চেয়ে আমাদের এর ভিত্তিতে ভাঙনের বিষয়ে অধিক মনোযোগ দেয়ায় উদ্যোগী হওয়া উচিত।
যদিও এটি সত্য, বিশ্বের অনেক দেশেই ভোটারদের মধ্যে বিভাজন সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন রাজনৈতিক নেতাদের জন্য অব্যাহতভাবে কঠিন করে তুলেছে।
ভোটাররা ক্রমবর্ধিষ্ণুভাবে বিভাজিত, মেরুকৃত (পোলারাইজড) এবং একটি সামষ্টিক ও যৌথ ভিত্তি অন্বেষণকারী রাজনীতিকরা বর্তমানে প্রায় ক্ষেত্রে ব্যালটভিত্তিক নির্বাচনে হেরে যাচ্ছে।
এ কূটাভাসিক পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য আয়ারল্যান্ড বিশ্ববাসীর কাছে একটি সম্ভাবনাময় মডেল হাজির করেছে।
কয়েক দশকজুড়ে আইরিশ নীতিনির্ধারকদের জন্য রাজনৈতিক উত্তেজনাময় বিষয় ছিল গর্ভপাত।
এর পরিপ্রেক্ষিত আয়ারল্যান্ড একটি সামাজিক-রাজনৈতিক নিরীক্ষণের চেষ্টা করল, যেটি আমাদের বিভাজনের যুগের জন্য উপযুক্ত।
দেশটিতে গর্ভপাত আইন প্রণয়নে একটি বৃহৎ নাগরিক সমাবেশ হয়েছিল, যেটি ব্যাপকতর ভোটার ভিত্তির সমর্থন অর্জন করেছিল।
আইরিশ সংসদ ৯৯ জন নাগরিক (এবং একজন চেয়ারপারসন) নির্বাচন করে একটি কমিটি গঠন করেছিল, যেটি বয়স, লিঙ্গ, সামাজিক শ্রেণী, আঞ্চলিকতা নির্বিশেষে সমাজের জন্য ব্যাপকভাবে প্রতিনিধিত্বমূলক ছিল।
এটিতে মতামতের ব্যাপকতর বৈচিত্র্য অর্জন সম্ভব হয়েছিল, যা সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দেখা যায় না।
তবে সংসদও কিছু নীতি অনুসরণ করেছিল, যা একতার পরিচর্যা/লালন করে।
অনেক সংসদের মতো আলোচ্য কমিটির ছায়া সংসদেও সব সদস্য কথা বলার সমান সুযোগ পেয়েছিল এবং সব বক্তব্যই ছিল জনগণের কাছে উন্মুক্ত।
কিন্তু শুরু থেকেই সদস্যরা একে অপরের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং যাদের সঙ্গে মতভিন্নতা আছে, তাদের পাশের টেবিলে বসার প্রতিজ্ঞা করেছিল।
উল্লিখিত ছায়া সংসদের কার্যবিবরণী জনগণ গভীরভাবে অনুসরণ করত।
এতে একটি ব্যাপকভিত্তিক রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বোধ তৈরি হয়েছিল।
তারা আলোচিত হওয়া বিষয়গুলো সম্পর্কে ব্যাপক মনোযোগ দিয়েছিল, কিন্তু একই সঙ্গে তারা টেবিলের অন্য পক্ষের মতামতের প্রশংসা করাও শিখেছিল।
চূড়ান্তভাবে সংসদ গর্ভপাত বৈধতা দেয়াসহ বিভিন্ন ইস্যুবিষয়ক সুপারিশ প্রকাশ করেছিল, যা পরে গণভোট আকারে জনগণের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
এর প্রস্তাবগুলোর অনেকটিই এখন দেশটির আইনে পরিণত হয়েছে।
আমরা যদি বিশ্বের যেকোনো জায়গায় রাজনৈতিক বিভাজনগুলো অতিক্রম করতে চাই, তাহলে আমাদের এই সিটিজেন-অ্যাসেম্বলি মডেলকে অনুসরণ ও এগিয়ে নেয়া উচিত।
প্রকৃতিগত বা নকশাগতভাবে সাধারণ নাগরিকের ইচ্ছামূলক সমাবেশগুলো—পুনর্নির্বাচিত হওয়ার চেয়ে যার প্রাথমিক উদ্দেশ্য সমঝোতায় পৌঁছা— রাজনৈতিক বিরোধ-বিদ্বেষ এড়াতে পারে এবং সুনির্দিষ্ট বিষয়ের বাস্তবসম্মত সমাধানে যাত্রা করতে পারে।
তারা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত আইন পরিষদকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না, তবে যখন প্রয়োজন তাদের পরিপূরক হতে পারে।
একই ধরনের ‘অংশীজন’ অ্যাপ্রোচগুলো অন্য ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় নির্বাচিত নেতাদের সাহায্য করেছে।
ফ্রান্সে ইয়োলো ভেস্ট আন্দোলনের প্রতিবাদকারীরা চলতি বছর তাদের সুর নরম করেছে, একবার যখন দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ দেশজুড়ে সরাসরি টাউন-হল ধরনের বৈঠকে নাগরিকদের সম্পৃক্তকরণে ‘গ্র্যান্ড ডিবেট’ আয়োজন করেছে।
বেলজিয়ামে দেশটির শহর এন্টওয়ার্পে আয়োজিত অংশীজনদের সাম্প্রতিক এক সমাবেশ কয়েক দশকের নিষ্ক্রিয়তার পর বৃহৎ একটি অবকাঠামো প্রকল্পের বিষয় মতভিন্নতা নিষ্পত্তিতে একটি প্রস্তাব এনেছে।
পোল্যান্ডে দেশটির শহর গদানস্কে আয়োজিত নাগরিক সমাবেশ এমন একটা বিষয় অর্জন করেছে ওপেন সোসাইটি ইনিশিয়েটিভ ফর ইউরোপের টিন গাজিভোদা, যাকে বর্ণনা করেছেন ‘বন্যা নিরসন, বায়ুদূষণ, নাগরিক সম্পৃক্ততা এবং এলজিবিটি লোকের সঙ্গে আচরণ-বিষয়ক নগর নীতিতে পরিবর্তনগুলোকে একসূত্রে বাঁধা’ হিসেবে।
অন্তত কিছু সামষ্টিক ও যৌথ ভিত্তিতে একবার আমাদের সমাজগুলো অধিকতরভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক সমস্যাগুলো সমাধানের মোমেন্টাম সৃষ্টি সহজতর হবে। যখন মানুষ ঘরে বা স্বদেশেই তাদের জীবনের
দিকনির্দেশনা বিষয়ে সন্তুষ্ট ও আশাবাদী থাকে, তখন তারা বৃহত্তর চ্যালেঞ্জ নিতে অধিক ইচ্ছুক থাকবে, যা তারা বিনিময় করে বিশ্বের সব জায়গার মানুষের সঙ্গে।
এখানেও আমাদের কিছু একই ধরনের নীতি প্রয়োগ করা উচিত।
আন্তর্জাতিক শাসন বা পরিচালন ব্যবস্থায় কেবল অভিজাত ও অন্য নির্বাচিত/ ভাগ্যবান গোষ্ঠী নয়; আন্তর্জাতিক সমাজের বৈচিত্র্যের প্রতিফলন থাকা উচিত।
২০২০ সালের জন্য এটিই আমার কামনা, ইচ্ছা।
আমার প্রত্যাশা এই যে, সিটিজেন অ্যাসেম্বলির মাধ্যমে অদূর ভবিষ্যতে আমরা যেন আমাদের জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভাজন নিরসন এবং আমাদের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় সমরূপ অংশীজন অ্যাপ্রোচ আনতে পারি, প্রতিষ্ঠা করতে পারি।
জলবায়ু পরিবর্তন, অসমতা, ধীর হয়ে আসা প্রবৃদ্ধি এবং ক্ষমতার নতুন কেন্দ্রীকরণের মতো প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান করতে চাই, তাহলে অবশ্যই দ্রুততার সঙ্গে আমাদের এগোতে হবে।
না হলে উল্লিখিত চ্যালেঞ্জগুলো বিশ্বের সর্বত্রই আমাদের নাগরিকদের কল্যাণ হুমকিতে ফেলবে।
ক্লাউস শোয়াব: প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী চেয়ারম্যান ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির





