২অক্টোবর বিশ্ব আধুনিক যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ ভারতীয় মহাত্মা মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধীর ১৫০তম জন্মবার্ষিকী পালন করেছে। এ উপলক্ষে নিউইয়র্ক টাইমসের মতামত বিভাগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, যিনি বর্তমানে সবচেয়ে ক্ষমতাধর জীবিত ভারতীয়, যথাযথভাবে তার দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতার প্রশংসা করেছেন। গান্ধীর প্রতি মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, নেলসন ম্যান্ডেলা, অ্যালবার্ট আইনস্টাইনসহ অন্যদের প্রশংসাবাক্য স্মরণ করার সঙ্গে সঙ্গে মোদি স্যানিটেশন এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যাপারে তার নিজের সরকারের প্রতিশ্রুতির কথা বর্ণনা করেছেন।
তার সব কথা লিখতে গেলে অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। তবুও পাঠকদের জন্য যা জানা জরুরি, তা হলো বক্তব্যের মধ্যে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত কথাটা তিনি বলেননি। সেটি হলো গান্ধী যে কারণে বেঁচে ছিলেন এবং আত্মত্যাগ করেছিলেন—আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি। বক্তব্যে এ বিষয়ে একটি শব্দও নেই। ১৮৯০ সাল থেকে, যখন তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রবাসী ভারতীয়দের একটি ক্ষুদ্র সম্প্রদায়ের সংগঠক ছিলেন, ১৯৪৮ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের মধ্যে তিনি ৩০ কোটিরও বেশি মানুষের একটি জাতির ‘পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন। গান্ধী হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি গড়ে তোলার কাজ করেছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকাকালীন বৈষম্যমূলক আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য তিনি বেশ কয়েকটি সভা করেছিলেন, যেগুলো মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি যখন ভারতে ফিরে এসেছিলেন, তখন তিনি হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিশ্বাস বাড়াতে রোজা রেখেছিলেন এবং বেশ কয়েকটি দীর্ঘ তীর্থযাত্রা করেছিলেন।
গান্ধী একটি স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ ভারতের জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অহিংসতার সঙ্গে লড়াই করেছিলেন। স্বাধীনতা অর্জন করতে পারলেও শেষ পর্যন্ত তিনি ঐক্য অর্জন করতে পারেননি। অবশেষে ১৯৪৭ সালের আগস্টে ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ছেড়ে গেলে এটিকে বিভক্ত করে দিয়ে যায়। পাকিস্তান স্পষ্টত মুসলমানদের আবাসভূমি হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল। তবে গান্ধীর প্রচেষ্টার কারণে ভারত একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। নতুন সংবিধানে ধর্মীয় কারণে বৈষম্যকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল; যেসব মুসলমান ভারতে থেকে গিয়েছিল, তাদের সমান নাগরিক হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছিল।
স্বাধীনতার পর প্রথম দুই দশকে ভারতে সংখ্যালঘুদের অধিকার সতর্কতার সঙ্গে সুরক্ষিত রাখা হয়েছিল। দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর দৃঢ় সংকল্পের কারণেই মূলত ভারতকে হিন্দু পাকিস্তান হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা গিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বেশির ভাগ মুসলিম সংখ্যালঘু, যাদের অধিকংশই দরিদ্র, ক্রমবর্ধমানভাবে আক্রমণের শিকার হচ্ছে। এর আংশিক কারণ, নেহরুর মৃত্যুর পর ক্ষমতাসীন কংগ্রেস পার্টি ভোটের জন্য প্রগতিশীল মুসলিম কণ্ঠস্বরগুলোকে পরিত্যাগ করে ওলামাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল। তবে এটিও অন্যতম কারণ যে, ঐতিহ্যবাহী বিরোধী দল মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) গভীরভাবে গান্ধী ও নেহরুর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বহুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে দেশটি একের পর এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জর্জরিত হয়ে পড়েছিল, যেখানে হিন্দু জনতা ‘পাকিস্তান ইয়া বাবরিস্তান’ (পাকিস্তান
চলে যাও, নতুবা কবরে পাঠানো হবে) স্লোগান দিয়ে তাদের মুসলিম স্বদেশীদের তিরস্কার করেছিল। সবচেয়ে ভয়াবহ দাঙ্গাটি হয়েছিল ২০০২ সালে গুজরাটে, মোদি তখন সেখানে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ পর্বটি মোদির ইমেজকে খারাপভাবে চিত্রিত করেছে এবং এর ফলে তাকে কিছুকালের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল।
তবে নিজেকে একজন উন্নয়নের কারিগর হিসেবে চিহ্নিত করে এবং অব্যাহত প্রবৃদ্ধির গল্প শুনিয়ে মোদি একটি প্লাটফর্ম তৈরি করেন, যার ফলে ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হন। এ ফলাফল মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা চর্চার আরো বন্যা বইয়ে দেয়, যা মোদি আটকাতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক বলে প্রমাণ হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম মেয়াদে অর্থনীতিতে কোনো উন্নয়ন হয়নি, তাই তিনি এবং বিজেপি উগ্র জাতীয়তাবাদের প্লাটফর্মে ২০১৯ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। পাকিস্তানকে ‘বহিঃশত্রু’ এবং ভারতীয় মুসলমান ও ধর্মনিরপেক্ষ উদারপন্থীদের ‘ভেতরের শত্রু’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছিল।
পশ্চিমা খবরের কাগজের পৃষ্ঠায় মোদির মুখোশ প্রকাশ হয়ে পড়লেও তিনি এবং তার দল হিন্দু রাষ্ট্রের পক্ষে (হিন্দুদের জন্য এবং হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র) প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রয়েছেন। লোকসভায় (ভারতীয় সংসদের নিম্নকক্ষ) বিজেপির ৩০০ সদস্যের মধ্যে বর্তমানে কেবল একজন মুসলিম রয়েছেন। সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো, বিজেপির প্রবীণ নেতারা নিয়মিতভাবে বিনা উসকানিতে ভারতীয় মুসলমানদের অপমান ও ভয় দেখান মাতৃভূমির প্রতি তাদের ‘আনুগত্য’ প্রমাণের কথা বলে।
এটা কোনো দুর্ঘটনা নয় যে মোদি গান্ধীর প্রশংসা করার সময়ও হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির কথা উল্লেখ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তার নীরবতাই সব কথা বলে দেয়। এরই মধ্যে ১ অক্টোবর মোদির ডানহাত, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বর্তমান বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ ভারতীয় মুসলমানদের প্রতি ইঙ্গিতবহ একটি বার্তা দিয়েছেন, ‘আমি
আজ হিন্দু, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান শরণার্থীদের আশ্বাস দিতে চাই, আপনাদের কেন্দ্রের পক্ষ থেকে ভারত ত্যাগ করতে বাধ্য করা হবে না।’ এটি তিনি কলকাতায় এক ভাষণে বলেছিলেন। তিনি আরো বলেছিলেন, ‘গুজবে
বিশ্বাস করবেন না। আমরা একটি নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল আনব, যা এ লোকেরা ভারতীয় নাগরিকত্ব পাবে তা নিশ্চিত করবে।’
এ কথাগুলোয় মুসলিমদের জন্য, যাদের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থীরাও আছে, কোনো আশ্বাস ছিল না। এর আগে অমিত শাহ এদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তার বক্তব্যের উদ্দেশ্য স্পষ্ট ছিল, ভারতীয় মুসলমানদের উচিত তাদের কথাবার্তায় সতর্কতা অবলম্বন করা, নতুবা তাদের নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নিয়ে নির্বাসিত করা হবে।
গান্ধীর জীবনীকার এবং বহুত্ববাদী ভারতীয় নাগরিক হিসেবে আমি আমার মুসলিম স্বদেশীদের প্রতি ক্রমবর্ধমান পৈশাচিকতা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত। গান্ধী যে গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছিলেন, তা হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রে রূপান্তর হচ্ছে।
তবুও একজন ঐতিহাসিক হিসেব আমরা কিসের সাক্ষী হচ্ছি, সে সম্পর্কে আমার কোনো বিভ্রান্তি নেই। একসময় ব্যতিক্রম থাকলেও ভারত এখন দক্ষিণ এশীয় রীতির দিকে যাত্রা শুরু করেছে। শ্রীলংকা ও মিয়ানমার উভয়ই বৌদ্ধপ্রধান দেশ এবং তাদের সংখ্যালঘু জনসংখ্যা তথা তামিল হিন্দু ও রোহিঙ্গা মুসলমানরা যথাক্রমে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে গণ্য হয় (বরং আসল অবস্থা এর চেয়েও খারাপ)। একইভাবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান মুসলিমপ্রধান দেশ, যেখানে হিন্দুরা (কখনো কখনো খ্রিস্টানরাও) ঐতিহাসিকভাবে নির্যাতিত হয়েছে।
আমরা একটি নতুন দশকে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে এটি স্পষ্ট হয়ে গেছে যে মোদি, অমিত শাহ এবং বিজেপি নৃতাত্ত্বিক-জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের ঘরে নাম লেখানোর জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সে লক্ষ্যেই তারা আধুনিক ভারতের ইতিহাসে একটি অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা করতে গান্ধী ও নেহরুর আদর্শিক উত্তরাধিকারকে নির্মমভাবে অস্বীকার করেছে।
রামচন্দ্র গুহ: বেঙ্গালুরুর একজন ঐতিহাসিক
ভাষান্তর: হাসান তানভীর





