নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মারা যাওয়ার দিক থেকে উপরের দিকে রয়েছে এশিয়ার দেশ ইরান। গতকাল রোববার পর্যন্ত ইসলামী এ প্রজাতন্ত্রে কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন ৫৫ হাজার ৭৪৩ জন, এদের মধ্যে মারা গেছেন ৩ হাজার ৬০৩ জন। অবরুদ্ধ এ দেশটির বর্তমান ভীতিকর পরিস্থিতি নিয়ে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে লিখেছেন ইরানের খ্যাতিমান নারী ফটোসাংবাদিক নিউশা তাভাকোলিয়ান:
তেহরানে আমাকে করোনাভাইরাস সংকট নিয়ে ছবি তুলতে হয়েছে। ইরানে আমরা সংকট নিয়ে অভ্যস্ত এবং নতুন বাস্তবতাও দ্রুত মানিয়ে নিতে পারি। আমি লেটেক্স গ্লাভস পরে নিলাম, মুখ ও নাক ঢেকে দিলাম মাস্ক দিয়ে, আর ক্যামেরা ব্যাগের মধ্যে নিয়ে নিলাম একটি জীবাণুনাশক। এটা হলো নতুন ‘স্বাভাবিক’ জীবন। যেসব রাস্তা সচরাচর মানুষ ও গাড়িতে ব্যতিব্যস্ত থাকে তা এখন একেবারেই ফাঁকা। মাস্কের ভেতর দিয়ে আমি শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু এটা যেন শ্বাসরোধী। প্রতিটি পদক্ষেপে মনে হতে থাকে, আমি অন্ধকার ও অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
মাস্কটি খুলে ফেললাম। বসন্তের মৃদুমন্দ বাতাস দোলা দিয়ে যায়। এখানে, এর মানে ইরানি নববর্ষ দুয়ারে। এই নববর্ষ (নওরোজ) হাজার হাজার বছর ধরে ইরানিয়ানদের জন্য নতুন বছরকে বরণ করে নেয়ার এক মহোৎসব। বসন্তের প্রথম দিন ইরানিয়ানরা পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও ভালোবাসার মানুষদের সঙ্গে একত্র হয়ে নতুন বছরের জন্য একে অন্যকে শুভকামনা জানান। কিন্তু এ বছর কর্তৃপক্ষ আমাদের ঘরে থাকতে বলেছে। তারা সংকট নিয়ে অব্যবস্থাপনা করেছে এবং এখন এটি নিয়ে চরমভাবে ধুঁকছে।
ইরান অন্যতম সংকটাপন্ন দেশ। আমরা জানি না এর শেষ কোথায়, কাজেই আমরা খুব উদ্বিগ্ন। আমার খুবই প্রিয় এক চাচা নভেল করোনাভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করছেন। তিনি বাসায়ই আছেন। হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই, বেড পাতা হয়েছে পার্কিং লট ও স্টেডিয়ামে। চিকিৎসক বলছেন, ‘বাসায় থাকুন, নড়বেন না, হয়তো বেঁচে যাবেন।’ তারা তাকে কিছু ওষুধ দিয়েছেন। আশা করি তিনি বেঁচে যাবেন। সর্বত্র ভীতিকর অবস্থা। মৃত্যুর ভয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়। সামনের একটি বছর নিয়ে ভয়। অবশ্য আমার আগের বছরটিও ছিল বিভীষিকাময়। এখন যেমন নভেল করোনাভাইরাসের সঙ্গে লড়ছি, তেমনই জীবন আমাকে থামতে ও সবকিছু ছেড়ে দিতে বাধ্য করেছে। আমি যার মধ্য দিয়ে গেছি তা কখনো কল্পনাও করতে পারি না।
আমি ওই সব ফটোগ্রাফারের একজন যে কিনা ২৩ বছর ধরে পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় অ্যাসাইনমেন্টের জন্য ছুটেছি, মানুষের দুঃখ-দুর্দশার ছবি তুলে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছি। এলোমেলো জীবনে আমার যে বিষয়টি নিশ্চিত ছিল: আমি সময়সীমার দিকে তাকিয়ে ছুটেছি সবসময়, এজন্য নিজেকে ও কাছের মানুষজনকে ভুলে থেকেছি।
জীবন আপনার মুখে সশব্দে আঘাত করতে পারে। আমাকেও করেছে।
আমস্টারডামে (নেদারল্যান্ডস) ডিনার সারছিলাম, তখন ইরান থেকে আমার স্বামী (টমাস আর্ডব্রিঙ্ক) ফোন করে জানাল, আমার ৬৪ বছর বয়সী মিষ্টি বাবা বেহরুজ হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তার চোখের সামনেই মারা গেছেন। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দিনকয়েক পরই বিনা কারণে ইরানি প্রেস কর্তৃপক্ষ আমার ‘ওয়ার্ক পারমিট’
বাতিল করে ও ইরানে কোনো ধরনের ছবি তোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।
আমাকে থামতে বাধ্য করা হলো। বেশ। কারণ সামনে আরো কিছু আসছিল।
দুই মাস পর দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান আমাদের বাসার পরিচারিকা। আমাদের বিল্ডিংয়ের সামনের রাস্তায় গাড়ি চাপা দিলে তিনি প্রাণ হারান। এরপর আমার ভাইয়ের লিম্ফয়েড ক্যান্সার ধরা পড়ে এবং তাকে কেমোথেরাপি নিতে হয়।
ফিরে আসি আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে। এখন আমরা এটিকে বলছি ‘সেলফ কোয়ারেন্টিন’,
কিন্তু এটি আমার কাছে এক পুরনো বিষণ্নতার নাম। আমার ক্যামেরার ওপর ধুলার স্তর পড়ে যায়। ১৬ বছর বয়সের পর এই প্রথম আমি কোনো ছবি তুলিনি। আমি হাঁটতে এমনকি কোনো কিছু চিন্তা করতেও চাইনি।
এই কষ্ট আমাকে সংকট মোকাবেলা করতে শেখায়। আমি ছিলাম একজন কাজপাগল মানুষ। এই জরুরি বিরতি আসলে আমার অবিরাম অ্যাসাইনমেন্ট ও সফরের চক্রটাকে থামিয়ে দিয়েছে। এটা আমাকে যে সময় দিয়েছে তা দিয়ে আমি দেখছি জীবন কতটা সুন্দর।
সামাজিক মর্যাদা, খ্যাতি ও সর্বোপরি আর্থিক উন্নতি—এসব দীর্ঘকাল থেকেই জাগ্রত ছিল আমার ভাবনায়। কিন্তু এখন এসব বিমূর্ত আর গুরুত্বহীন লাগে। অফুরন্ত বিরতি আমাকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, মনে হচ্ছে যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সুখী আমি।
বাবার মৃত্যু হয়েছে ঠিক এক বছর আগে। আমার পরিবার তার স্মরণে বড় অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা করে, এজন্য অতিথিদের নিমন্ত্রণ জানানো হয়, খাবারের অর্ডারও দেয়া হয়। কিন্তু আমাদের সবকিছু বাতিল করতে হয়েছে। এটা ছিল খুবই দুঃখের ব্যাপার। আমরা তেহরানের বেহেস্ত-ই জাহরা কবরস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই, যেটি খুবই বড় জায়গা এবং সচরাচর জনাকীর্ণ থাকে। ইরানের মানুষজন তাদের কাছের মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের জন্য এই জায়গাটিকে বেছে নেয় এবং বিশেষ করে নববর্ষ সবার পছন্দের সময়। কিন্তু যখন আমরা সেখানে গেলাম, এটা ছিল একেবারেই জনশূন্য। সেখানে কেউই ছিল না। এটা ছিল কোনো হরর মুভির মতোই।
ভাইরাস আমাদের অনেক ধকলও দিচ্ছে। ছোট বোনটি আমার বাবার কবরে দেয়ার জন্য ফুল কিনতে বাইরে যায় এবং আমরা চেঁচিয়ে উঠি, কারণ সে হাতে কোনো গ্লাভস পরেনি। করোনাভাইরাস এতটাই সংক্রামক যে আপনাকে সবসময় সতর্ক ও উদ্বিগ্ন থাকতে হয়। আমি আমার বাবার কথা ভাবার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু এত এত সংকট আর সমস্যা সেই ভাবনাকে বিক্ষিপ্ত করে দেয়।
তিন মাস আগে আমি কাজের অনুমতি ফিরে পাই এবং এখানে আবারো কাজ করতে পারছি।
একই সঙ্গে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের মানুষকে কোণঠাসা করে রেখেছে। সঙ্গে আছে বেকার সমস্যা আর যুদ্ধের আতঙ্ক। অনেকেই আবার নভেল করোনাভাইরাসকে গুরুত্বের সঙ্গে নেননি এবং জমায়েত হয়েছেন ও ভ্রমণ করেছেন। একটি বিপর্যয় আসার পথেই ছিল। সবাইকে বসন্তের শুভেচ্ছা।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক





