কভিড-১৯ মহামারী জীবন বদলে দেয়া একটি ঘটনা, যেমনটা হয়তো কোনো একটি প্রজন্মে একবারই আসে। এ মহামারী থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে ভ্যাকসিনেশন, বলছিলেন ইয়েল ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথের ডিরেক্টর এবং সংক্রামক রোগবিষয়ক প্রফেসর সাদ বি ওমর।
‘কভিড-১৯-এর স্থিতিস্থাপক একটি ভ্যাকসিন সিস্টেমের বিবর্তন’ বিষয়ক সংক্ষিপ্ত একটি প্রেজেন্টেশনে তিনি বলেছেন, বর্তমান দৃষ্টান্তে ভ্যাকসিন উৎপাদনের ক্ষেত্রে ধাপগুলোকে সংক্ষেপিত করা হয়েছে, সেগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া হয়নি। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ভ্যাকসিনের বিকাশ, বিতরণ ও কার্যকরীসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি। সেই সাক্ষাৎকারের চুম্বকাংশ এখানে তুলে ধরা হলো।
প্রশ্ন:
আপনি বলেছেন,
এবারই প্রথম
আমরা বয়স্কদের
মাঝে এত
বড় আকারে
ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম
চালাতে যাচ্ছি।
আপনি কি
একটু ব্যাখ্যা
করবেন?
ওমর:
এ
রকম ভ্যাকসিন আছে। অনেক দেশ এটি করেছে, কিন্তু এত বড় আকারে না। প্রায়ই দেশগুলো এটি করে হেলথকেয়ার কর্মী ও কিছু গর্ভবতী নারীর মাঝে। ইনফ্লুয়েঞ্জার ক্ষেত্রে এটি খুবই সাধারণ ব্যাপার। এখানে প্রবীণদের জন্য একটি ভ্যাকসিনের পরামর্শ দেয়া আছে এবং অনেক দেশে বেসরকারি খাতে এটি করে থাকে।
আমরা এটা করেছি গুটি বসন্তের নির্মূল প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে। কিন্তু সেটি খুবই নির্দিষ্ট ছিল। আপনি প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, যারা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে তাদের দিকে দৃষ্টি দিয়ে এবং তাদের চারপাশে একটি বৃত্ত তৈরি করে। কিন্তু একটি গণভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম যা অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে টেনে আনবে তা নজিরবিহীন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক ইতিহাসের বিবেচনায়।
প্রশ্ন:
শিশুদের জন্য
ভ্যাকসিনের ক্ষমতা
কম এবং
বয়স্কদের জন্য
বেশি? এ
ক্ষেত্রে কি
এ রকম
কিছু আছে?
ওমর:
ভ্যাকসিনের
শক্তি এবং কার্যকারিতা শিশুদের জন্য বেশ শক্তিশালী। উদ্বেগ হচ্ছে বয়স্কদের নিয়ে। নানা কারণে অনেক সময় তাদের প্রতিক্রিয়া কম হয়। যেমন প্রতিরোধ ক্ষমতা, যেখানে ইমিউন সিস্টেমে নির্দিষ্ট কিছু কোষ এবং উপাদান ঠিকমতো কাজ করে না। এটি অন্যতম একটি বিষয় যা আমরা ট্রায়ালে পর্যবেক্ষণ করছি। এ ট্রায়ালে অনেক বয়স্ক মানুষ অন্তর্ভুক্ত আছে, কারণ এ ভাইরাস তাদের ওপর আক্রমণ করে অসামঞ্জস্যভাবে।
প্রশ্ন:
অবশ্যই এখানে
প্রতিযোগিতা রয়েছে
এবং এ
প্রতিযোগিতার পেছনে
রয়েছে লাভ।
এখানে কীভাবে
ভারসাম্য রাখা
যেতে পারে
বলে আপনি
মনে করেন?
ওমর:
সাধারণ
ঐতিহ্যগতভাবে সরকারের সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এ বিষয়টি আগ্রহোদ্দীপক কারণ আসন্ন নির্বাচন। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নির্ভর করেছে সুপরিচিত পদ্ধতিগুলোর ওপর। এটিই বিশ্বে প্রথম লাইসেন্সপ্রাপ্ত ভ্যাকসিন নয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থার মানসম্পন্ন পদ্ধতি রয়েছে। কী করতে হবে তা নিয়ে একটি পূর্বনির্ধারিত, লিখিত প্রটোকল রয়েছে। সেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সরকারের চাপ সত্ত্বেও সুপরিচিত পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। অন্যরা তা দেখতে পারে এবং এ পদ্ধতির সত্যতা নিয়ে মন্তব্য করতে পারে।
প্রশ্ন:
একটি ভ্যাকসিন
ব্যবহারের জন্য
জরুরি অনুমোদনের
সম্ভাবনা কেমন?
ওমর:
এটা
নির্ভর করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর এবং আইন-কানুনের ওপরও। এখানে কিছু পূর্বনির্ধারিত নিয়ম রয়েছে। পূর্ণ অনুমোদন এবং লাইসেন্স ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার ওপরই কেবল নির্ভর করে না, উৎপাদনের মতো অন্য কিছু ধাপের ওপরও নির্ভর করে। এ ধরনের বিষয়গুলো জরুরি অবস্থার কারণে দ্রুত করা যায় না। আমি দেখেছি বেশির ভাগই অন্তত যুক্তরাষ্ট্রে বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায় দ্বারা ভালোভাবে গৃহীতও হয়, তবুও জরুরি অনুমোদনের জন্য কিছু ফর্ম রয়েছে। কিন্তু সেটা কীভাবে করা হচ্ছে তা গুরুত্বপূর্ণ। এটা কি এফডিএর উপদেষ্টা কমিটির সুপারিশক্রমে করা হচ্ছে? এটা কি সহজেই উপলব্ধ এবং স্বচ্ছ ডাটার ভিত্তিতে করা হচ্ছে? এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।
সহজাতভাবে, পূর্ণ লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ এবং এটি এক বছরের প্রক্রিয়ায় আরো ছয় মাস যুক্ত করবে, যা কেবল আমলাতান্ত্রিক কারণে নয়। এখানে কিছু সুনির্দিষ্ট ধাপ রয়েছে।
প্রশ্ন:
একটি পূর্ণাঙ্গ
ভ্যাকসিন তৈরি
করতে এবং
সাধারণ মানুষ
পর্যন্ত আনতে
কেমন সময়
লাগবে?
ওমর:
তৃতীয়
ধাপের ট্রায়ালে আপনি দেখবেন সুরক্ষা ও কার্যকারিতার বিষয়টি। কার্যকারিতার ক্ষেত্রে সাধারণত এ ধরনের ট্রায়ালগুলো ইভেন্টভিত্তিক নমুনার ওপর ভিত্তি করে হয়।
এ পর্যায়ে বিভিন্ন ধাপের অর্থ হচ্ছে, গণহারে ভ্যাকসিনেশন এক মাসের মধ্যে উপলব্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই, রাজনীতিবিদরা যা-ই বলুন না কেন। কিন্তু একটি ভ্যাকসিন বছরের শেষদিকে উপলব্ধ হচ্ছে বা অনুমোদিত হচ্ছে, তা হতে পারে জরুরি ব্যবহারের অধীন বা পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্সের অধীনে, যা একেবারে কাল্পনিক কোনো বিষয় নয়। এখানে পরিষ্কার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ২০২১ সালের শুরুতে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
প্রশ্ন:
যাদের দীর্ঘস্থায়ী
রোগ রয়েছে
তাদের ক্ষেত্রে
ভ্যাকসিন কেমন
কার্যকর?
ওমর
: আমাদের
কাছে ডাটা আছে। আমরা জানি, সাধারণত ভ্যাকসিনের পরামর্শ দেয়া হয় তাদের জন্যও যাদের দীর্ঘমেয়াদি রোগ রয়েছে। যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন কিছু নির্দিষ্ট দেশে দীর্ঘস্থায়ী রোগীদের জন্য ব্যবহারের প্রস্তাব দেয়া হয়।
প্রশ্ন:
দীর্ঘ সময়
ধরে কী
ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
দেখা দিতে
পারে?
ওমর:
বেশির
ভাগ মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, যা নিয়ে আপনি চিন্তিত তা ট্রায়ালেই শনাক্ত করা হয়। এখানে কিছু দুর্লভ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, যা কিনা আমরা জানি না। কিন্তু তা খুবই দুর্লভ।
প্রশ্ন:
আপনি যা
বলছেন তা
মূলত অতীতের
ভ্যাকসিনগুলোর অভিজ্ঞতা
ও বোঝাপড়ার
আলোকে, তাই
নয় কি?
ওমর:
একদম।
কয়েক দশক ধরে যা বিকাশমান আছে এবং অসংখ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে, এমনকি নতুন কোনো রোগজীবাণুসহও। মনে করুন, এ করোনাভাইরাস নতুন। কিন্তু আমরা করোনাভাইরাস নিয়ে অনেকদিন ধরেই জানি। আমরা খুব সচরাচর করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন ব্যবহার করি না। কিন্তু সে সম্পর্কে কিছু ব্যাপার বুঝতে পারি। অনেক কিছু অজানা আছে। কিন্তু কীভাবে বিষয়গুলো কাজ করে তা নিয়ে কিছু ব্যাপার জানাও আছে। এটা সম্ভাবনার একটা খেলা। এ সম্ভাবনা বলে যে আমরা ট্রায়ালেই কোনো বিরূপ ঘটনা ধরতে পারি।
প্রশ্ন:
সব মিলিয়ে
কবে আমরা
স্বাভাবিক জীবনে
ফিরতে পারব?
ওমর:
আমি
আপনাকে ক্যালেন্ডার ধরে বলতে পারব না। কিন্তু আমি আপনাকে প্রথম লাইসেন্স পাওয়া ভ্যাকসিনের শুরু থেকে বলতে পারি, কারণ সেটি একটি ইভেন্টের শুরু। প্রথম ভ্যাকসিনের অনুমোদনের এক বছরের মধ্যে বৈশ্বিক পরিস্থিতি মোটামুটি স্থিতিশীল চেহারা নেবে। এরপর দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। তবে ব্যাপারটা ঠিক পুরোপুরি অতীতের মতো হবে না। ভাইরাস আমাদের সঙ্গে থাকবে কিন্তু সেটি ভালোভাবে নিয়ন্ত্রিত ভাইরাস। আমরা যেভাবে আশা করছি সব কিছু যদি সেভাবে এগোয়, তবে ভালো কিছুর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
স্ক্রল.ইন





