নভেল করোনাভাইরাসের মহামারীর কারণে প্রতিনিয়ত বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। শিগগির এ মহামারী থামবে এমন কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। যুক্তরাজ্যের কথাই বিবেচনা করা যাক। সেখানে এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে ২৩ মার্চ লকডাউনের ঘোষণা দেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। পরে ধাপে ধাপে তা আরো বাড়ানো হয়। যার অর্থ ছিল সম্ভব হলে বাসায় থেকে কাজ করা এবং অপ্রয়োজনে কোনো ধরনের ভ্রমণ না করা।
স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ৭০ বছরের বেশি বয়স্কদের এবং গর্ভবতী নারীদের ২১ মার্চ বলা হয় তারা যেন নিজ গৃহে সেলফ আইসোলেশনে থাকেন ১২ সপ্তাহের জন্য।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সরকার কি আশা করছিল যে করোনাভাইরাস ১২ সপ্তাহের মধ্যে চলে যাবে? জনসন বলেছিলেন, তিনি বিশ্বাস করেন যুক্তরাজ্য তিন মাসের মধ্যে এ ভাইরাসকে রুখে দিতে সক্ষম। কিন্তু এটি কীভাবে করা হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছুই বলা হয়নি। যদিও যুক্তরাজ্যের প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা স্যার প্যাট্রিক ভ্যালেন্স বলেছেন, নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেঁধে দেয়া সম্ভব না। অন্যান্য রিপোর্ট বলছিল, যে পদ্ধতিতে মহামারীকে বিবেচনা করা হচ্ছিল তা জনগণকে হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। যাতে এক বছরের বেশি সময় লাগতে পারে।
তাহলে কভিড-১৯ কত দিন ধরে চলতে পারে বলে আমরা আশা করতে পারি এবং সাধারণ জীবনে ফিরে আসার প্রস্তাবিত কৌশল কেমন হতে পারে?
করোনাভাইরাস কবে থামবে?
ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের সেলুলার মাইক্রোবায়োলজির প্রফেসর ড. সাইমন ক্লার্ক বলেন, কোনো একটা তারিখ বলা অসম্ভব। কেউ যদি আপনাকে নির্দিষ্ট কোনো তারিখ বলে তবে সেটি হবে ভাগ্য গণনা করে ভবিষ্যৎ বলার মতো। বাস্তবতা হচ্ছে এটা আমাদের সঙ্গে সবসময় থাকবে কারণ এটি ছড়িয়ে পড়েছে।
ডা. ক্লার্কের মতে, এটা বেশ চ্যালেঞ্জিং একটা বিষয়। কারণ এটা কোনো ধরনের লক্ষণ না দেখিয়েই আমাদের শরীরে থাকতে পারে এবং তারপর সেই ব্যক্তির দ্বারা ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই এটা বলার কোনো কারণ নেই যে এ ভাইরাস ভবিষ্যতে আর থাকবে না।
নির্দিষ্ট কোনো সময় না দেয়ার ব্যাপারে ক্লার্কের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্সের ইমিউনোলজির লেকচারার ড. জেনা ম্যাকিওচি। তিনি বলেন, এটা এমন একটি প্রশ্ন সম্ভবত আমরা সবাই এর উত্তর জানতে চাই এবং কারো কাছে সত্যিই এর জবাব আছে কিনা আমার সন্দেহ আছে। কারণ এটি অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। আমি যা বলতে পারি, তা হলো এ মুহূর্তে আমরা কেউ এটি জানি না। একই বিষয়ে নটিংহাম ট্রেন্ট ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের প্রফেসর রবার্ট ডিংয়াল বলেন, বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থনযোগ্য কোনো সময় বেঁধে দেয়া কার্যত অসম্ভব।
সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল হেলথের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মাইকেল হেড বলেন, কভিড-১৯ নিয়ে অনুমান করা কঠিন। এটি একেবারে নতুন ভাইরাস হওয়ার কারণে একে নিয়ে বিশেষ কোনো ভবিষ্যদ্বাণীও করা যায় না এবং আমাদের স্মৃতিতেও এ ধরনের মহামারীর উপস্থিতি নজিরবিহীন। তিনি আরো বলেন, বিশ্বায়নের বিস্তৃতি ও আন্তর্জাতিক সংযোগের কারণে এর শেষ নিয়ে কোনো কিছু বলা বেশ কঠিন। যদিও হেড আশা করছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা সীমিত হবে এবং বিস্তৃতিও আরো নিচের স্তরে নেমে আসবে। যাই হোক শীতের কারণে করোনাভাইরাসের কেস বৃদ্ধির ব্যাপারে উদ্বেগ আছে। যা কিনা ফ্লুর মৌসুমের সঙ্গে মিলে যেতে পারে।
লকডাউন কি ভাইরাসের বিস্তৃতি কমাতে পারে?
ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যেমন ইতালিতে ভাইরাসের বিস্তৃতি রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। যেখানে সবাইকে লকডাউনে রাখা হয়েছিল এবং কেবল খাবার ও ওষুধের জন্য অল্প কিছু মানুষকে জরুরি ভিত্তিতে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। এ রকম নিয়মগুলো কি অন্য দেশে কাজে লাগবে? ড. ম্যাকিওচি বলেন, ভাইরাস দমনের পদ্ধতিগুলোর ওপর নির্ভর করছে মানুষের ওপর কী ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে। কিন্তু একবার আমরা এসবের প্রয়োগ শুরু করলে, আমরা বলতে পারব না এটা কতদিন পর্যন্ত বলবৎ রাখতে হবে। যদি আমরা মানুষকে খুব দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ করে দিই তবে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই স্বল্পমেয়াদের লকডাউন কার্যকর না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
আমরা কি কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন পাব?
যুক্তরাজ্যের প্রধান মেডিকেল উপদেষ্টা প্রফেসর ক্রিস উইটি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে এটা পরিষ্কার যে ভ্যাকসিন হচ্ছে ভাইরাস থেকে বাঁচার একমাত্র পথ এবং আমরা সবাই আশা করছি এটা শিগগিরই পাওয়া যাবে। ড. ক্লার্কও একমত যে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মাধ্যমেই কভিড-১৯ কে থামানো সম্ভব হতে পারে। তিনি বলেন, এটাই পারে ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে আনতে। লক্ষণগুলো চিকিৎসার মাধ্যমে হয়তো আমরা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারি। কিন্তু তা এই মহামারী থেকে আমদের স্থায়ী মুক্তি দিতে পারবে না।
প্রাণিদেহে পরীক্ষার পর কয়েকদিন আগে পরীক্ষামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে একজনকে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। যদি দেশের যথেষ্ট পরিমাণ মানুষকে ভ্যাকসিন দেয়ার মাধ্যমে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করা সম্ভব হয় তবে তার মানে ভাইরাসটি ভবিষ্যতে খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারবে না।
এই হার্ড ইমিউনিটি অবশ্য (বিতর্কিত মত) ভাইরাসকে ছড়িয়ে পড়তে দেয়ার মাধ্যমেও অর্জন করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে ব্যক্তির প্রতিরোধ পদ্ধতিই ভাইরাসকে মোকাবেলায় সাড়া দেবে। প্রফেসর ডিংগওয়েল বলেন, করোনাভাইরাস মানবসমাজে ভবিষ্যতে আঞ্চলিকভাবে সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে (মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো), যতদিন পর্যন্ত না নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিন আবিষ্কার হচ্ছে।
সমাধানের অন্য কোনো পথ কি আছে?
প্রফেসর ম্যাককিওচি বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহ সবাই ব্যস্ত থাকবে ‘দেখা এবং অপেক্ষা’র কাজে। যেখানে অন্য দেশগুলো মহামারী মোকাবেলায় কীভাবে সাড়া দিচ্ছে এবং তাদের কৌশলগুলো থেকে কী ফল আসছে তা দেখা হবে। তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি, চীন সাফল্য পেয়েছে। আমরা অন্যান্য ভাইরাসের দিকেও তাকাতে পারি। কিন্তু এটি একই রকম অন্যান্য ভাইরাসের চেয়ে অনেক দ্রুত ছড়াচ্ছে। যা কিনা আরো কিছু সময় আমাদের আশপাশে থাকবে। পাশাপাশি অনেক বেশি মানুষ টেস্ট করতে হবে এবং রোগ নির্ণয়ের প্রক্রিয়ায়ও উন্নতি ঘটাতে হবে। এরই মধ্যে আক্রান্ত হওয়া সবাইকে চিহ্নিত করেই সফলতা পাওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দি ইনডিপেনডেন্ট





