সৌদি আরবের জেদ্দায় ইলেকট্রিক পণ্যের ব্যবসা আছে ফেনীর ছানাউল্যাহ ভূঁইয়ার। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে লকডাউন শেষে ২৩ মার্চ থেকে ২১ দিনের কারফিউ জারি করেছে দেশটি। কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তা জানেন না তিনি। বাংলাদেশী তরুণ আরিফুল ইসলাম জোহানেসবার্গে ছোট একটি মুদি দোকান চালান। জোহানেসবার্গ থেকে তিনি গতকাল জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে পুঁজি হারিয়ে দেশে ফিরতে হবে।

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, কুয়েত, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, ওমান, কাতার, ইতালি ও বাহরাইনে প্রবাসী বেশির ভাগ বাংলাদেশী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার গল্প একই। বাংলাদেশের এ শীর্ষ ১০ শ্রমবাজারের প্রত্যেকটি দেশেই লকডাউন অথবা কারফিউ চলছে। একই পরিস্থিতি চলছে দেশের অন্য শ্রমবাজারগুলোতেও। 

বিদেশে বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের বড় অংশই সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর ঘোষিত আর্থিক প্রণোদনা ও নীতিসহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় আছেন। তারা বলছেন, বাংলাদেশী ব্যবসায়ী বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় অংশেরই প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও বৈধ কাগজপত্র নেই। ফলে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা ও অন্য সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনাও অনেকের নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের অন্তত ২০ শতাংশ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাদের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন আরো ৩০ শতাংশ প্রবাসী বাংলাদেশী।

ইতালি থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবাসীরা বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন ৭৫ কোটি ৭৮ লাখ ডলার। দেশের শীর্ষ রেমিট্যান্স আহরণকারী দেশের তালিকায় ইতালির অবস্থান নবম। ইতালিতে প্রবাসী লক্ষাধিক বাংলাদেশীর উল্লেখযোগ্য অংশ ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ইতালির মিলান শহরে একটি রেস্টুরেন্ট চালান বাংলাদেশী তরুণ আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি জানান, মিলান শহরে কবরের নিস্তব্ধতা চলছে এক মাসের বেশি সময় ধরে। করোনাভাইরাসে ইতালির অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অনেক দিন হলো রেস্টুরেন্ট বন্ধ। জানি না, এ ক্ষতি কীভাবে কাটিয়ে উঠব।

জরুরি অবস্থা চলছে স্পেন ও ফ্রান্সে। জার্মানি, গ্রিস, অস্ট্রেলিয়া, সুইডেনসহ ইউরোপের দেশগুলোতে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের বড় অংশই ছোটখাটো ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর থেকেই এসব বাংলাদেশী ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন। 

বেকার হয়ে পড়া প্রবাসী শ্রমিকদের খাদ্য, বাসস্থান, ওষুধ সরবরাহ করতে শ্রম উইংগুলো কাজ করছে বলে জানান প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম রেজা। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে বিভিন্ন দেশে লকডাউন থাকায় প্রবাসীদের ঘরে বসে থাকতে হচ্ছে। যাদের নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তা নেই, এখানে-সেখানে কাজ করছেন তাদের আয় নেই, করোনাভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার ভয়ে বাইরে যেতে পারছেন না তাদের খাদ্য, বাসস্থান, ওষুধ সরবরাহ করতে কাজ করছে শ্রম উইংগুলো। তিনি বলেন, আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। এটি যদি দীর্ঘমেয়াদে চলতে থাকে, তবে প্রবাসী এবং দেশে থাকা তাদের পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

যদিও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিবের বক্তব্যের কোনো বাস্তবতার কথা জানাতে পারেননি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী প্রবাসীরা। সৌদি আরবে বসবাসকারী নূরুল আবছার, কুয়েতে বসবাসকারী কেফায়েত উল্লাহ, ইতালিতে গৃহবন্দি থাকা বাংলাদেশী তরুণ শাহাদাত হোসেন, ফ্রান্সে বসবাসকারী ইকবাল আহমেদ, জার্মানিতে থাকা শফিকুল ইসলাম, যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী ফয়েজ আহমেদ ও জাপানে বসবাসকারী ইমরান হোসেনের সঙ্গে কথা হয়েছে বণিক বার্তার। তাদের প্রত্যেকে বলেছেন, শ্রম উইং কিংবা দূতাবাসের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আর্থিক কিংবা অন্য কোনো সহযোগিতা করা হচ্ছে, এমন কথা তারা শোনেননি।

করোনাভাইরাস দেশের প্রবাসী আয়ে বড় ধরনের ধাক্কা দেবে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশী প্রবাসীদের অল্প অংশই প্রাতিষ্ঠানিক চাকরিতে আছেন। করোনাভাইরাস হয়তো তাদের জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু প্রবাসীদের বড় অংশই ব্যাপক মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ইউরোপ, আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশীদের একটি অংশ ছোটখাটো ব্যবসা করেন। ওইসব দেশে চলমান লকডাউন পরিস্থিতি তাদের কর্মহীন করে ফেলেছে। ক্ষতি সামাল দিতে না পারলে পুঁজি হারিয়ে এ শ্রেণীকে দেশে ফিরে আসতে হবে।

ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসী পরিবারগুলোকে সরকারের পক্ষ থেকে সামাজিক সুরক্ষা সেবাগুলোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া দরকার বলে মনে করেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, প্রবাসী পরিবারগুলোর বড় অংশের আয় বন্ধ হয়ে যাবে। এ পরিস্থিতিতে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য রেশনিং, সামাজিক সুরক্ষা সেবার আওতায় এনে ভাতা প্রধান, ওএমএসের (খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি) মতো সেবা চালু করতে পারে। এছাড়া প্রবাসী কল্যাণ ফান্ড এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের স্বল্প সুদে ঋণ দেয়ার উদ্যোগ নিলে ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে দেয়া সম্ভব হবে।

২০১৮-১৯ অর্থবছরেই প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১ হাজার ৬৪১ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) প্রবাসীরা ১ হাজার ২৪৯ কোটি ৮৫ লাখ ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই কমতে শুরু করেছে রেমিট্যান্স প্রবাহ। মার্চের প্রথম ১৯ দিনে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১০৬ কোটি ৭৪ লাখ ডলার। মাসের শেষ ১০ দিনে রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেক কমেছে বলে জানা গেছে।