ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিকদের দাবি, কভিড-১৯ হলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর জীবতাত্ত্বিক আক্রমণ, যা গবেষণাগারে তৈরি করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এমন সংবাদ অনলাইনে ভাইরাল হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এ নিয়ে কথার যুদ্ধও খানিকটা হয়ে গেছে। কিন্তু নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়া এ ভাইরাস প্রাকৃতিকভাবেই বিকশিত হয়েছে।

সম্প্রতি বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী নেচার মেডিসিনে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বিজ্ঞানীরা দাবি করেন, নভেল করোনাভাইরাস গবেষণাগারে তৈরি কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাজে লাগানোর মতো কিছু নয়। গবেষকরা বলছেন, ‘গবেষণাগারভিত্তিক কোনো চিত্রনাট্য আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়।’

ওই গবেষণাপত্রের অন্যতম লেখক ও তুলানে ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের অধ্যাপক ড. রবার্ট গ্যারি এ নিয়ে বলেন, ‘এ নিয়ে সৃষ্ট প্রচুর গুজব ও ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব অনেক আলোড়ন তৈরি করেছে। কাজেই নতুন এই করোনাভাইরাসের উত্পত্তিটা আসলে কোথায়, তা খুঁজে বের করতে আমরা একটি দল হিসেবে কাজ করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছি।’

এই গবেষণাপত্রকে সমর্থন করে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউব অব হেলথের পরিচালক ড. ফ্রান্সিস কলিনস নিজের ব্লগে লিখেছেন, ‘কভিড-১৯ যে প্রাকৃতিকভাবেই সৃষ্ট, তা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করার কোনো সুযোগই রাখেনি এই গবেষণা।’

গবেষকরা এই বলে উপসংহার টেনেছেন—নভেল করোনাভাইরাস কোনোভাবেই মানুষের তৈরি হতে পারে না, কেননা অতীতে ব্যবহূত হয়েছে এমন কোনো ভাইরাসের সঙ্গে এর সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়নি। গবেষকরা বলছেন, বাদুড়ের শরীরে পাওয়া ভাইরাস ও সম্ভবত প্যাঙ্গোলিনের (বাংলাদেশে পরিচিত বনরুই নামে) মধ্যে থাকা ভাইরাসের মিলিত রূপ এই নভেল করোনাভাইরাস।

সম্প্রতি হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. টমি ল্যাম বলেছেন, চীনে পাচার হওয়া মালয়ান প্যাঙ্গোলিনের মধ্যে এমন দুই ধরনের ভাইরাস পাওয়া গেছে, যার সঙ্গে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া নভেল করোনাভাইরাসের বেশ মিল রয়েছে। ড. ল্যাম বলেন, ‘যদিও কভিড-১৯ রোগের ক্ষেত্রে সরাসরি হোস্ট হিসেবে প্যাঙ্গোলিনের ভূমিকা নিয়ে আরো নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে, তবে ভবিষ্যতে যদি এ রকম প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া মহামারী ঠেকাতে হয়, তবে বাজারে এদের বিক্রি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে।’

ড. টমি ল্যামের সহগবেষক ও সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এডওয়ার্ড হোমস মনে করেন, বন্য প্রাণীদের মধ্যে এমন ভাইরাস আছে, যা মানুষকে সংক্রমিত করার ক্ষেত্রে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে। তিনি বলেন, ‘নভেল করোনাভাইরাসের সঙ্গে বাদুড়ের নিশ্চয়ই মিল রয়েছে, হয়তো প্যাঙ্গোলিনও সম্পর্কিত। তবে অন্য কোনো প্রাণীরও জড়িত থাকার জোর সম্ভাবনা আছে।’

কভিড-১৯ যে বাদুড়ের শরীর থেকেই এসেছে তার সম্ভাবনা ৯৬ শতাংশ। আর রূপান্তরের ক্ষমতার কারণেই এর ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপ্তিও এতটা বেশি। এবিসি নিউজকে রবার্ট গ্যারি বলেন, ‘আমরা অন্য করোনাভাইরাসের ওপর পরিচালিত গবেষণা থেকে দেখতে পেয়েছি যে তারা এটি (রূপান্তর) করতে সমর্থ এবং আরো বেশি রোগ সংক্রামক হয়ে উঠতে পারে। এই ভাইরাসটি এক দেহ থেকে আরেক দেহে ছড়িয়ে পড়ে কীভাবে মহামারীর সৃষ্টি করছে, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এটি দারুণ ব্যাখ্যা হতে পারে।’

গ্যারির দাবি, প্রোটিনের উপরের স্তরে মিউটেশনই (বংশগতিতে পরিবর্তন) হতে পারে এই মহামারীর কারণ। আবার এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না যে এ ভাইরাসটি এতটা চরম পর্যায়ে পৌঁছার আগে অপেক্ষাকৃত কম তীব্রতা নিয়ে বছরের পর বছর, এমনকি যুগের পর যুগ মানুষের মধ্যে অসুস্থতা তৈরি করে গেছে। তার কথায়, ‘আমরা জানি না যে এই মিউটেশনগুলো অতিসম্প্রতি নাকি বহু আগে ঘটেছে। এটা সুনির্দিষ্ট করে বলা অসম্ভব যে মিউটেশনের কারণেই ভাইরাসের বিশ্বব্যাপী এই প্রকোপ, নাকি এটি প্রাকৃতিকভাবেই ঘটে যাওয়া একটি প্রক্রিয়া।’

অনেকের বিশ্বাস, উহানের (চীন) একটি মাছের বাজার থেকে এ ভাইরাসের সৃষ্টি। গ্যারির মতে, এটি মারাত্মক এক ভুল ধারণা। তার কথায়, ‘আমাদের ও অন্যদের গবেষণা বলছে, এর (নভেল করোনাভাইরাস) সৃষ্টি আরো আগে। সেখানে (বাজার) অবশ্যই কিছু একটা ঘটেছে, কিন্তু ভাইরাসের সৃষ্টি হয়নি।’

এদিকে ভারতের বিশিষ্ট ক্লিনিশিয়ান বিজ্ঞানী অধ্যাপক গগনদীপ কাং বলেছেন, উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি থেকে নভেল করোনাভাইরাস ছাড়ার যে গুজব সৃষ্টি হয়েছে তা ভিত্তিহীন। তিনি এ প্রতিষ্ঠানটিকে উচ্চ মানসম্পন্ন বলে দাবি করেন। আবার অন্য ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিকরা বলছেন, আসলে যুক্তরাষ্ট্রই ভাইরাসটিকে চীনে নিয়ে গেছে এবং ২০১৯ সালের অক্টোবরে উহানে মিলিটারিদের এক খেলায় তা ছেড়ে দেয়া হয়। এটিও গগনদীপ কাংয়ের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি।

তিনি বলেন, ‘এটা এমনই এক ভাইরাস আরএনএ ভাইরাসের মতো সময়ের সঙ্গে যার বিবর্তন ঘটেছে এবং প্রাণীদেহে থাকা ভাইরাসের সঙ্গে এর মিলও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, যা গবেষণাগারে তৈরি ভাইরাস বা ‘বায়ো ওয়েপন’র ক্ষেত্রে সম্ভব নয়।’

 

এবিসি নিউজ