২০ বছর আগে বিজ্ঞানী সিনান আর্ল একটি প্রবণতার শুরু দেখতে পেয়েছিলেন, যা কিনা আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভর যুগকে সংজ্ঞায়িত করে: বিষয়টি হলো এ যুগে কত দ্রুত মিথ্যা সংবাদ ছড়ায়। তিনি দেখেছিলেন মিথ্যা সংবাদ অনলাইন ডিসকোর্সে জ্বলজ্বল করে, যেভাবে ছোট একটি স্ফুলিঙ্গে বিরাট আকারে আগুন জ্বলে ওঠে তেমন। এখন এমআইটির ডিজিটাল ইকোনমির ডিরেক্টর আর্ল বিশ্বাস করেন একটি ধারণায়, যাকে তিনি নভেলটি হাইপোথিসিস বলেছেন। এটা দেখায় মিথ্যা সংবাদের সংক্রমণ প্রায় অপ্রতিরোধ্য।

তিনি বলেন, মানুষের মনোযোগ অভিনবত্বের দিকে আকৃষ্ট হয়। সেসব জিনিসের প্রতি যা কিনা নতুন ও অপ্রত্যাশিত। আমরা চারপাশের মানুষের মধ্যে একটা বিশেষ মর্যাদা লাভ করি, যখন আমরা নতুন বা অভিনব কোনো তথ্য শেয়ার করি। কারণ এটা দেখায় যে আমরা হালনাগাদ তথ্যের জগতে আছি কিংবা এ তথ্যভাণ্ডারে আমাদের প্রবেশযোগ্যতা আছে।

সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখ একটি আর্টিক্যাল পোস্ট করা হয় জেনেডোতে, যা গবেষণাপত্র ভাগাভাগি করার একটি উন্মুক্ত জায়গা। যেখানে দাবি করা হয়, জেনেটিক প্রমাণ দেখায় যে সার্স-কোভ-২ করোনাভাইরাস প্রাকৃতিকভাবে প্রাণী থেকে স্থানান্তরিত হয়ে আসার বদলে ল্যাবে তৈরি করা হয়েছে। ২৬ পৃষ্ঠার সেই গবেষণাপত্র যার নেতৃত্বে ছিলেন চীনা ভাইরোলজিস্ট লি-মেং ইয়ান। এটির কোনো পিয়ার রিভিউ হয়নি এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এ প্রমাণ সায়েন্টিফিক জার্নালে ‘সেন্সর’ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

টুইটারে এটি মুহূর্তের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। খ্যাতিমান ভাইরোলজিস্ট ক্রিস্টিয়ান অ্যান্ডারসেন, কার্ল বারগস্ট্রোম ইন্টারনেটকে বেছে নিয়ে জানান পেপারটি অবৈজ্ঞানিক। তাদের অভিযোগের সর্বাগ্রে ছিল যে রিপোর্টটিতে বন্যপ্রাণীদের মাঝে করোনাভাইরাস কীভাবে চালিত হয় সে সম্পর্কে জ্ঞাত বিশাল তথ্যভাণ্ডার এবং মানুষের মাঝে স্থানান্তরিত হওয়ার প্রবণতার বিষয়ে যে আলাপ তাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। যেখানে সার্স-কোভ-২-এর উত্পত্তি সম্পর্কে সাম্প্রতিক পাবলিকেশনসগুলোও আছে।

বিশেষজ্ঞরা আরো ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, এ রিপোর্ট ষড়যন্ত্রতত্ত্বটি ছড়িয়ে দিয়েছে এবং ভুলভাবে একাডেমিক জার্নালগুলোর বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সেন্সর করার অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে এবং তাদের চক্রান্তকারী আখ্যা দেয়া হয়েছে।

জুলাইয়ে ভাইরাল জিনোমিকস গবেষক ডেভিড রবার্টসন ন্যাচার মেডিসিনে একটি পিয়ার রিভিউ করার গবেষণাপত্র লেখেন। যেটি দেখায় যে সার্স-কোভ-২-এর সংলগ্ন ও কাছের পূর্বপুরুষ হিসেবে পরিচিত হচ্ছে একটি ভাইরাস, যাকে বলা হয় আরটিজি১৩, যা কিনা কয়েক দশক ধরে বাঁদুড়ের মাঝে অস্তিত্বমান। ভাইরোলজিস্টরা চিন্তা করেন এরা কাছাকাছি সম্পর্কের, যা কিনা নভেল করোনাভাইরাসের সঙ্গে ৯৬ শতাংশ মিলে যায়। সম্ভবত বাদুড় কিংবা মানুষের মাঝে বিকশিত হয় এবং বর্তমান রূপ পাওয়া ও চলমান মহামারীর কারণ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় ২০ বছর ধরে তা আড়ালেই থেকে যায়।

ই লি-মেং ইয়ানের রিপোর্ট দাবি করে, এ হাইপোথিসিসটি বিতর্কিত ছিল এবং আরটিজি১৩ও ল্যাবে তৈরি করা। কিন্তু সার্স-কোভ-২ নিয়ে প্রকাশিত জেনেটিক প্রমাণগুলোর সামনে এটি পাত্তা পায়নি। আরো যে ব্যাপার তা হলো এ রিপোর্টটিতে অর্থায়ন করে রুল অব ল নামের একটি অলাভজনক সংগঠন। যেটির প্রধান হোয়াইট হাউজের প্রাক্তন কৌশলবিদ স্টিভ বানোন। যাকে জালিয়াতির জন্য গ্রেফতার করা হয়েছিল। এটি আরো একটি কারণ, যেজন্য অনেক ভাইরোলজিস্ট এর সত্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

রবার্টসন বলেন, এটি ছদ্মবিজ্ঞান দ্বারা দখল করা হচ্ছে। এ গবেষণাপত্রটি কয়েকটি উদাহরণের একটি, যা প্রমাণকে বিযুক্ত করে এবং সামনে আসে হাস্যকর চিত্র হিসেবে।

সার্স-কোভ-২-এর উত্পত্তি সম্পর্কে আমরা কী জানতে পারি?

করোনাভাইরাস প্রকৃতির মাঝে বিদ্যমান এবং এটি অনেক ভিন্ন প্রাণীকে সংক্রমিত করতে পারে। সার্সের মতো করোনাভাইরাস দেখা গিয়েছিল বাদুড়, শূকর, বিড়ালসহ আরো অনেকে প্রাণীর মাঝে। জেনেটিকসের ওপর ভিত্তি করে এর উত্পত্তিবিষয়ক সর্বাধিক সম্মত মত হলো এর পুর্বপুরুষরা বন্যপ্রাণীদের মাঝে বিস্তারের সময় মানুষের শরীরে আসার আগে নিজেদের মাঝে জেনেটিক বৈশিষ্ট্য আদান-প্রদান করে।

বিজ্ঞানীরা এখনো পশুপালের মাঝে সার্স-কোভ-২-এর পূর্বসূরিদের সন্ধান পাননি। যদিও এর খুব নিকটাত্মীয় বাঁদুড়ের মাঝে বিদ্যমান। এ ভাইরাস অনেক মধ্যস্থতাকারী প্রাণীর ভেতর দিয়ে বিস্তৃত হয়েছে—বনরুইকে এর সঙ্গে জড়িত করা হয় এবং তারপর এমনভাবে বিকশিত হয় যাতে আরো ভালোভাবে মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। কিংবা এটি সরাসরি বাদুড় থেকে মানুষে স্থানান্তরিত হয়েছে, অতীতে এ ধরনের ঘটনার উদাহরণ রয়েছে। ২০ বছর আগে চীনে মূল সার্স প্রাদুর্ভাবটি দেখা দেয়ার পর গবেষকরা স্থানীয় গুহায় বন্য বাদুড়গুলো এবং তাদের কাছাকাছি থাকা মানুষদের নিয়ে জরিপ চালানো শুরু করে। ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃত সার্স ভাইরাসের জেনেটিক আত্মীয় হচ্ছে উড়ন্ত স্তন্যপায়ীরা।

সুনির্দিষ্ট ঘটনার উত্তর অনুসন্ধান করা কঠিন, যা বিস্তৃত মহামারীর দিকে চালিত করেছে; সেটিকে ‘খড়ের গাদায় সুই খোঁজার’ সঙ্গে তুলনা করেছে এপিডেমিওলজিস্ট আয়ান লিপকিন। যিনি সহগবেষক ছিলেন নেচার মেডিসিনের প্রাথমিক গবেষণাপত্রে। ইয়ানের রিপোর্ট দাবি করেছে যে ন্যাচার মেডিসিন রিপোর্টের গবেষণাপত্রে ‘স্বার্থের দ্বন্দ্ব’ রয়েছে, যার কারণ ২০০২-২০০৩ সালের সার্স মহামারী নিয়ে লিপকিনের কাজ। যার জন্য তিনি চীনা সরকারের কাছ থেকে পুরস্কারও পেয়েছিলেন। লিপকিন বলেছেন, এ অভিযোগটি ‘উদ্ভট’। যখন তাকে সার্স-কোভ-২-এর জন্য বায়োইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, তার উত্তর ছিল, এটা সমর্থন করে এমন কোনো ডাটা নেই।

ইয়ানের রিপোর্ট কী বলছে?

ইয়ানের রিপোর্ট ভিন্নভাবে উদ্যেগী হয়েছে এ প্রশ্নকে মোকাবেলায়। শুরু করেছিল এ দাবি নিয়ে যে সার্স-কোভ-২ বাদুড়কে সংক্রমিত করার দিক থেকে দুর্বল। যে কারণে এটি তাদের কাছ থেকে আসতে পারে না। কিন্তু বিজ্ঞানীরা ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, ভাইরাস প্রতিনিয়ত বিবর্তিত হচ্ছে এবং প্রজাতির মধ্যে স্থানান্তরিত হতে থাকে। বাদুড় থেকে মানুষে স্থানান্তরের যে প্রাথমিক বিস্তৃতি তা আরো কয়েক দশক আগে সম্পন্ন হতে পারে, যা ভাইরাসকে তার স্পাইক প্রোটিনের জন্য পর্যন্ত সময় দেয়। এটি সে অংশ যা মানুষকে সংক্রমিত করতে কোষে প্রবেশের জন্য ব্যবহার করা হয়।

এ মহামারীর সময়কার গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গবেষণাপ্রবাহ এবং অবাধে তথ্য ভাগাভাগি, যা কিনা মহামারী সংক্রান্ত নানা আবিষ্কারকে গতিময় করার জন্য করা হয়েছে। ফলে পিয়ার রিভিউ ছাড়াই প্রিপ্রিন্টে পোস্ট করার এ অভ্যাসের সুবিধা অনেকেই নিচ্ছে। রবার্টসন বলেন, বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের জন্য এটা বেশ উপযোগী। কিন্তু এর অন্ধকার দিকও আছে। ভুল তথ্য যা মহামারীর আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। এখানেও ভূমিকা রেখেছে প্রিপ্রিন্ট পোস্টগুলো। যা ছড়িয়ে দিয়েছে অপ্রমাণিত দাবিগুলো।

আর্ল বলেন, তবে এ নির্দিষ্ট গবেষণাপত্রের ক্ষেত্রে আমি বলব কেন ভুল খবর ছড়িয়ে পড়ে তার কারণ হলো এগুলো ধাক্কা দেয়, উত্তেজক এবং ঘটতে থাকা রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক। আর অবশ্যই আমাদের মনে করোনাভাইরাস নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। আমরা বুঝতে চেষ্টা করছি যে এর উত্পত্তির বিষয়টি একটি বড় সংবাদ।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক