বিশ্বব্যাপী বহু দেশের গবেষকরা কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন তৈরিতে প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে প্রশ্ন হলো, ভ্যাকসিন তৈরি হলেও এটি কি বিশ্বের সবাই পাবেন? গবেষক ও এ খাতের বিশেষজ্ঞদের ধারণা হলো, উৎপাদনের পথে নানা সীমাবদ্ধতা এবং ধনী দেশগুলোর মজুদ করার প্রবণতার কারণে বিশ্বের সব আক্রান্ত মানুষ এর সেবা না-ও পেতে পারেন।
কিছু মানুষ আশা দেখাচ্ছেন, ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যেই তৈরি হয়ে যেতে পারে কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন। কিন্তু গবেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন, প্রত্যেকের হাতে ভ্যাকসিন তুলে দেয়া আসলে সম্ভব না-ও হতে পারে। কারণটাও তারা বলে দিয়েছেন, ধনী দেশগুলো ভ্যাকসিন নিজেদের জন্য মজুদ করতে পারে।
কোন ধরনের ভ্যাকসিন কার্যকর হবে, মূলত তার ওপরই নির্ভর করবে, প্রডাকশনের জন্য কেমন ফ্যাসিলিটিজের প্রয়োজন পড়বে। কিছু গবেষক বলছেন, যারা ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা করছেন, সরকারি ও বেসরকারি খাতের দাতাদের উচিত হবে তাদের জন্য অগ্রিম অর্থ সরবরাহ করা। এমনও হতে পারে, এ ফ্যাসিলিটিজ কখনো ব্যবহূতই হবে না, তবু অর্থ জোগান দিয়ে যেতে হবে। দাতারা অবশ্য বসে নেই। এরই মধ্যে ভ্যাকসিন তৈরির জন্য বিনিয়োগের ঘোষণা এসেছে। যদিও জনস্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিনিয়োগের যে ঘোষণা দেয়া হয়েছে তা পর্যাপ্ত নয় এবং আরো শতকোটি ডলারের মতো বাড়াতে হবে।
নভেল করোনাভাইরাসের আগমন এবং এর জন্য ভ্যাকসিন তৈরির প্রয়োজন এমন সময়ে আবির্ভূত হলো, যখন বিশ্বব্যাপী কোম্পানিগুলো ইনফ্লুয়েঞ্জার ভ্যাকসিন তৈরিতেও ব্যস্ত সময় পার করে। এ সময়টাতে অন্য ভ্যাকসিনের উচ্চ চাহিদা থাকে এবং কোম্পানিগুলো লাখ লাখ ডোজ তৈরি করে। তাই কোম্পানিগুলোকে ভ্যাকসিনের কাঁচামালের জন্যও যুদ্ধ করতে হবে এবং এ জায়গাটিতে ভারসাম্য আনতে হবে।
লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের সংক্রমণ রোগ বিশেষজ্ঞ এবং মহামারী রোগে বিশ্ব সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা ডেভিড হেইম্যান বলেছেন, কোম্পানিগুলো যদি স্বাভাবিক সময়ের মতোই একই গতিতে ইনফ্লুয়েঞ্জা, হাম, রুবেলা কিংবা অন্য রোগের ভ্যাকসিন তৈরি অব্যাহত রাখে এবং একই সময় নভেল করোনাভাইরাসের জন্য ১০০ কোটি ডোজের চাহিদা তৈরি হয়, তখন নিঃসন্দেহে প্রডাকশনের ঘাটতি পড়ে যাবে।
সব দেশকে আশা দেখাচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ভ্যাকসিনের ন্যায়সংগত বণ্টন নিশ্চিত করতে তারা একটি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বলে জানিয়েছে। যদিও এটি কীভাবে তারা বাস্তবায়ন করবে, সে ব্যাপারে পরিষ্কার করে কিছু বলা হয়নি।
‘লন্ডন ইনস্টিটিউট ফর ইনোভেশন অ্যান্ড পাবলিক পারপোজ’-এর অর্থনীতিবিদ মারিয়া মাজ্জুকাতো এ নিয়ে বলেন, ‘মহামারীর সময় ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে আমরা শেষ কথা বলতে যা বুঝি—যে দেশ এটি তৈরি করেছে কেবল তারাই এটি ভোগের অগ্রাধিকার পাবে এবং বিশ্বব্যাপী সহজলভ্য হবে না।’
জেনেভাভিত্তিক অলাভজনক পাবলিক-প্রাইভেট সংস্থা ‘গাভি’র প্রধান সেথ বার্কলে স্বীকার করে নিলেন, সরবরাহের সীমাবদ্ধতা একটি ‘বড় দুশ্চিন্তা’র ব্যাপার হয়ে দাঁড়াতে পারে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, বিশ্বব্যাপী যত বেশি মানুষের হাতে ভ্যাকসিন পৌঁছে দেয়া যায় সেই চেষ্টা করে যাবেন তারা।
ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের চ্যালেঞ্জ: কোন ধরনের ভ্যাকসিন লাগবে তার ওপরই নির্ভর করবে কেমন অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। কাজেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে খুব বেশি পরিমাণ ভ্যাকসিন তৈরি করে দেয়ার কাজটি অনেক বড় চ্যালেঞ্জের হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অর্থের জোগান: ২০২১ সালের মধ্যে ভ্যাকসিন বাজারে নিয়ে আসতে কোম্পানিগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থের জোগান কি বিশ্বের সরকারগুলো দিতে যাচ্ছে? বিশ্বব্যাপী মহামারীতে ভ্যাকসিন তৈরির জন্য অর্থ বিনিয়োগ ও সমন্বয় করার উদ্দেশ্যে ২০১৭ সালে অসলোতে যাত্রা করে কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশনস (সিইপিআই)। এ সংস্থাটি জানায়, বিশ্বব্যাপী কোম্পানিগুলোর ভ্যাকসিন তৈরির প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি আনা ও ট্রায়ালের জন্য অন্তত ২০০ কোটি ডলার প্রয়োজন, যদিও এখন পর্যন্ত জাতীয় সরকারগুলোর কাছ থেকে ৬৯ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি মিলেছে। সিইপিআই বলছে, ভ্যাকসিন তৈরির জন্য আরো অন্তত ১০০ কোটি ডলারের জোগান প্রয়োজন। এছাড়া কোম্পানিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আরো শত শত কোটি ডলার লাগতে পারে বলে জানালেন সিইপিআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিচার্ড হ্যাচেট।
যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতিমান ওষুধ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জনসন অ্যান্ড জনসন গত মাসের শেষ দিকে ঘোষণা দেয়, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ‘বায়োমেডিকেল অ্যাডভান্সড রিসার্স ও ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’র সঙ্গে ভ্যাকসিন তৈরির বিষয় নিয়ে কাজ করতে তারা ১০০ কোটি ডলারের পার্টনারশিপ করছে। তারা বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিনের ১০০ কোটি ডোজ তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে এগোনোর কথা জানায়। কোম্পানিটির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পল স্টোফেলস জানান, প্রতিটি ডোজের পেছনে ১০ ডলার খরচ হতে পারে।
মজুদের আইন কী বলছে? প্রচুর পরিমাণে ভ্যাকসিন তৈরি হয়ে গেলেও এটি অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে উৎপাদনকারী দেশকে বলপ্রয়োগ করার সুযোগ নেই। ২০০৯ সালে এইচ১এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জার ভ্যাকসিন সবার আগে তৈরির যোগ্যতা দেখায় অস্ট্রেলিয়া। যদিও দেশটি তত্ক্ষণাৎ এটি রফতানি করেনি, কেননা তারা চেয়েছে নিজের নাগরিকদের জন্য এটি আগে সরবরাহ করতে। এ নিয়ে জন হপকিন্স সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির আমেশ আদালিয়া বলেন, ‘অধিকাংশ দেশেই এমন আইন রয়েছে, যা ব্যবহার করে সরকার কোম্পানিকে বলতে পারে, তারা যেন আগে দেশের মধ্যে বিক্রি করে। আমি সহসাই এ আইনের পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি না।’
সিইপিআই বলছে, ভ্যাকসিনের সমবণ্টন নিয়ে নীতিগত কিংবা আইনগত কোনো ধরনের চুক্তি হয়নি, যা দিয়ে কোম্পানিগুলোকে বলপ্রয়োগ কিংবা বাধ্য করা যাবে। আবার বিশ্বব্যাপী এমন কোনো সত্তাও নেই, যারা বিশ্বের সবার জন্য ভ্যাকসিন তৈরির নির্দেশ দেয়ার পাশাপাশি অর্থেরও জোগান দিতে পারে। সিইপিআইয়ের কমিউনিকেশন ম্যানেজার মারিও ক্রিস্টোডুলু এ নিয়ে বলেন, ‘কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন তৈরিতে যখন অগ্রগতি হচ্ছে, তখন সমবণ্টনের বিষয়টি নিয়ে সব সরকার, বিশ্বের স্বাস্থ্য খাতের নেতারা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে জরুরি ও সমন্বিতভাবে সোচ্চার হতে হবে।’
নেচার ম্যাগাজিন





