গত ২৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স মায়ো ক্লিনিক পরিদর্শনে যান। করোনাভাইরাস মহামারীর এ সময়ে ক্লিনিকের মতো স্থানে পরিদর্শনে গেলেও তিনি মাস্ক-গ্লাভসসহ কোনো ধরনের সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহার করেননি। এ বিষয়ে পেন্স বলেছিলেন যে তিনি স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের চোখের সামনে দেখতে চেয়েছিলেন। এরপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও একই কাজ করতে দেখা গেছে। তিনি আমেরিকানদেরও এমন আচরণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। গত ৫ মে এন-৯৫ মাস্কের কারখানা পরিদর্শনে গিয়েছিলেন ট্রাম্প। সেখানেও সেফটি গ্লাস ছাড়া তার কোনো সুরক্ষা উপকরণ ছিল না।

কিন্তু সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহারে তাদের অনীহা কেন? এমন আচরণের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে বলে জানান নিউরোলিডারশিপ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী পিটার গ্লিক। নিজেদের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, এখানে পুরুষতন্ত্রের মূলনীতি কাজ করে । অর্থাৎ কোনো দুর্বলতা দেখানো যাবে না। সংক্ষেপে বলতে গেলে, মাস্ক পরা পুরুষত্বহীনতার শামিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞরা যেখানে মাস্কসহ সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহারে মানুষকে তাগাদা দিয়ে চলেছেন সেখানে নেতাদের এমন আচরণ ওই বার্তাগুলোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়। তবে মাস্ক বা নিরাপত্তাসামগ্রী ব্যবহার না করা মানুষের সংখ্যা খুবই কম। পাবলিক ইমেজধারী নেতাদের এমন আচরণ সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। বিশেষজ্ঞদের মতামত, সমালোচনা উপেক্ষা করে সেগুলোকে অবিরাম বিরোধিতার মাধ্যমে তারা তাদের পুরুষত্ব প্রমাণ করে চলেছেন।

পিটার গ্লিক বলেন, আমরা গবেষণায় দেখেছি, অনিশ্চয়তা স্বীকার করা বা অন্য কারো মতামতের ওপর নির্ভর করা দুর্বলতা মনে করা হয়। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের প্রতি ট্রাম্পের বিরোধিতা একটি বিশেষ মনোভাব থেকে আসে যে ‘আমি একাই এটা ঠিক করতে পারি’। ট্রাম্পের মতো নেতাদের জন্য প্রতিটি পরিস্থিতি একটি ব্যক্তিগত পুরুষত্ব প্রতিযোগিতা, যা তিনি ‘জিতেন’ এবং অন্যদের অবশ্যই ‘হেরে যেতে হবে’। অতীত ভুল স্বীকার করা বা সমালোচনা গ্রহণ করা তাদের কাছে অসহনীয়।

কভিড-১৯ সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে প্রতিনিয়ত হ্যান্ডশেকের মতো সামাজিক ক্রিয়াকলাপ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। অথচ পুরুষ নেতারা তাদের পুরুষত্বের দৃঢ়তা প্রমাণ করতে ব্যস্ত। স্বাভাবিক সময়ে হ্যান্ডশেক এড়িয়ে চলার মতো (জীবাণুবিদ!) ট্রাম্প পুরো মার্চ মাসে হ্যান্ডশেক করতে থাকলেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও একইভাবে করোনাভাইরাসের মধ্যে হ্যান্ডশেক ও জড়িয়ে ধরার মতো কাজগুলো যেন বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। করোনা সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির আগে ব্রিটিশ গণমাধ্যম গার্ডিয়ান তাকে ‘সুপার-স্প্রেডার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারো কৌতুক করে বলেছিলেন তার ক্রীড়াবিদ অতীত তাকে ভাইরাস থেকে রক্ষা করবে। কভিড-১৯ পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি ভিড় করে চলাফেরা, হ্যান্ডশেক ও সমর্থকদের জড়িয়ে ধরার মতো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

ট্রাম্প, পেন্স, জনসন ও বোলসোনারো—তাদের পৌরুষ প্রমাণ করার জন্য কেবল নিজেরাই সুরক্ষার বাইরে থাকেননি, অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু থেকে দেশের মানুষকে বাঁচাতে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতেও তারা বিলম্ব করেছেন বা ব্যর্থ হয়েছেন। সেদিক থেকে নিউজিল্যান্ড বা জার্মানির নারী নেতারা তাদের দেশে ভাইরাসটির ছড়িয়ে পড়া রোধ এবং মৃতের সংখ্যা হ্রাস করতে পেরেছে। যদিও সব পুরুষ নেতাই এমন নন। তবে অনেকেই দুর্ভাগ্যক্রমে নিজেদের পুরুষত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে নিজ দেশের নাগরিকদের মৃত্যুমুখে ফেলে দিচ্ছেন।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান