গবেষণা জানাচ্ছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় নারী ও পুরুষের বায়োলজিক্যাল পার্থক্যের দিকে সেভাবে নজর দেয়া হয় না। গবেষণায় সাধারণত লিঙ্গ ভেদাভেদ না করে একই মডেল সামনে রেখে পর্যবেক্ষণ করা হয়। কিন্তু কিছু গবেষণায় জানা যাচ্ছে, কোনো মানুষকে কীভাবে রোগ আক্রমণ করবে এবং তার শরীর কীভাবে লড়াই করবে তা লিঙ্গভেদে ভিন্ন হয়।
এ ঐতিহাসিক চর্চার একটি উদাহরণ হচ্ছে হূদরোগের ওষুধ ডাইজোক্সিন। ট্রায়ালে কার্যকর ও নিরাপদ প্রমাণিত হওয়ার পর ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে এ ওষুধটি বিস্তৃতভাবে বাজারজাত করা হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নারীদের মধ্যে এ ওষুধটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখ দেয়। লিঙ্গভেদে প্রাপ্ত ডাটাকে বিশ্লেষণ করে দেয়া যায় ডাইজোক্সিন পুরুষদের মধ্যে মৃত্যু হ্রাস করলেও নারীদের মধ্যে মৃত্যুর হার বৃদ্ধি করছে। একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘নারী মানে ছোট আকারের পুরুষ নয়, এটা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।’
কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে লিঙ্গভেদে প্রতিক্রিয়ার ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে প্রবলভাবেই। করোনাভাইরাসে নারীদের তুলনায় পুরুষদের মৃত্যুর হার প্রায় দ্বিগুণ। নতুন একটি বিশ্লেষণ দেখাচ্ছে যে কভিডের চিকিৎসার জন্য বিজ্ঞানীরা যেসব ইন্টারভেনশন উদ্ভাবন করার চেষ্টা করছেন সেখানে নারী ও পুরুষের পার্থক্যকে খুব সামান্যই আমলে নেয়া হয়েছে।
পিয়ার রিভিউ হওয়ার অপেক্ষায় থাকা একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, কভিড-১৯-এর ২৪৮৪টি ক্লিনিকাল ট্রায়ালের মাত্র ৪১৬টিতে লিঙ্গভেদকে আমলে নেয়া হয়েছে।
জুন মাসে জার্নালগুলোতে বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলোর বিষয়ে মাত্র ১১টি অরিজিনাল রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এগুলোর একটিতেও লিঙ্গের ভিত্তিতে কোনো পর্যবেক্ষণ উত্থাপিত হয়নি। যদিও ট্রায়ালে অংশ নেয়া নারী ও পুরুষের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ১১টি সমীক্ষা হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনকে বিশ্লেষণ করেছিল। এক দশক পুরনো এ ম্যালেরিয়া ড্রাগটি কভিডের ওষুধ হিসেবে কার্যকর হওয়ার জোর প্রচার শুরু হয়েছিল।
মানুষের হূদযন্ত্রের ওপর হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। নারীদের ক্ষেত্রে এটা পুরুষদের তুলনায় বেশি। একটি গবেষণার মাধ্যমে এ তথ্য জানিয়েছেন নেদারল্যান্ডসের রাডবোড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেক্স অ্যান্ড জেন্ডার-সেনসিটিভ মেডিসিনের চেয়ারম্যান ড. স্যাবাইন ওরটেল্ট-প্রিজিওন। তিনি বলেন, এমন ধরনের ওষুধের ক্ষেত্রে আপনি যদি লিঙ্গভেদে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার তথ্য প্রকাশ না করেন তাহলে কী হবে?
কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সাম্প্রতিক একটি গবেষণার লেখক ম্যাথিয়াস ভেলাম নেলসেন বলেছেন, ‘আমি মনে করি...আমাদের গবেষণা দেখায় যে এ চর্চা গভীরভাবে আমাদের চর্চায় প্রোথিত এবং এটা পরিবর্তন করাটা খুব কঠিন।’
আজকের দিনে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি স্বীকৃতি পেলেও ১৯৪০ থেকে ১৯৭০-এর দশকের মধ্যবর্তী সময়ে বিষয়টি একেবারে উপেক্ষিত ছিল। কিছু ট্রায়ালে নারীদের সন্তানদের ওপর বিরূপ প্রভাবের কারণে গবেষকরা সন্তান ধারণে সক্ষম নারীদের ট্রায়াল থেকে বাদ দেন।
বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, যেকোনো ওষুধ নারী ও পুরুষের ওপর একই রকম প্রভাব রাখে। ১৯৯০-এর দশকে পুনরায় নারীদের ট্রায়ালে অন্তর্ভুক্ত করা শুরু হয়। এ বিষয়ে নীতিমালাও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু বাস্তবে নারী-পুরুষকে ভিন্ন ভিন্নভাবে পর্যবেক্ষণ করার রীতি এখনো সবখানে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৯৯৭ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে যে ১০টি ওষুধ তুলে নেয়া হয়েছে সেগুলোর ৮টিই পুরুষের তুলনায় নারীদের জন্য বেশি স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।
কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, নারীদের ইমিউন সিস্টেম পুরুষদের তুলনায় ভালো কাজ করছে। এটা হচ্ছে তাদের দুটো এক্স ক্রোমোজোম থাকায়। এতে পরিবেশগত ফ্যাক্টরগুলোও ভূমিকা রাখছে। এছাড়া আরো অনেক শারীরবৃত্তীয় পার্থক্যের কারণেও কোনো ওষুধ বা রোগের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষদের মধ্যে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া হয়।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত





