মার্চের শুরু থেকেই বাংলাদেশ সরকার গণজমায়েতের ব্যাপারে মানুষকে সতর্ক করে আসছে, সবাইকে পরামর্শ দিয়েছে ঘরে থাকার। ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশে লকডাউন শুরু হয়েছিল। স্কুল-কলেজ ও ফ্যাক্টরিগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়।

এরপর রমজান মাস শুরুর প্রাক্কালে অনেক বেশি মানুষ মসজিদ ও মার্কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বাড়তি নিয়ম আরোপ করতে হয় (সম্প্রতি অবশ্য মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে)। এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে ইফতার পার্টিগুলোও নিষিদ্ধ করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার ধর্মানুরাগের এ সময়ে লকডাউন পুরোপুরি প্রয়োগে সক্ষম হবে কিনা।

সরকারের পক্ষে এ পদক্ষেপগুলো নেয়া সহজ নয়, কারণ বাংলাদেশে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা প্রবল। ধর্মনিরপেক্ষ দল হিসেবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকে প্রায়ই এ ধরনের চাপে পড়তে হয়। কিন্তু তার পরও দেশে কভিড-১৯-এর ক্রমবর্ধমান প্রাদুর্ভাব এবং সামাজিক দূরত্বের নীতি প্রয়োগের কারণে সরকারকে এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এর পর থেকে দেশটিতে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এপ্রিলে এসে আক্রান্তের হার অনেক বেড়েছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন রেকর্ড হচ্ছে। আবার বিশ্বব্যাপী ষাটোর্ধ্বদের মৃত্যুহার বেশি হলেও বাংলাদেশে সেটি মাত্র ১০ শতাংশ। এছাড়া বাংলাদেশ বিশ্বে একমাত্র দেশ যাদের করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা সেরে ওঠাদের চেয়ে বেশি। (তবে সম্প্রতি মৃতের চেয়ে সুস্থ হওয়ার সংখ্যা অনেকটাই বেড়েছে)।

করোনাসংক্রান্ত পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে কভিড-১৯-এর সমস্যা কম মারাত্মক। বিশেষ করে দেশের জনসংখ্যার তুলনায়। যেখানে অন্য দেশগুলো যে হারে আক্রান্তের সংখ্যা সামনে আনছে সে তুলনায়। কিন্তু জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংখ্যা প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরছে না। কারণ বাংলাদেশে পরীক্ষার হার খুবই কম। প্রকৃতপক্ষে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রতি ১০ লাখ মানুষে কেবল ১২৪ জনকে পরীক্ষা করেছে। এরপর সেটি ২৫ এপ্রিল প্রতি ১০ লাখে বেড়ে ২৪০ জনে দাঁড়িয়েছিল। (যদিও গতকাল পর্যন্ত সেটি ছিল ৬০৫ জন) যদিও তা অনেক কম। বাংলাদেশের বিশিষ্ট ভাইরোলজিস্ট নজরুল ইসলাম বলেছেন, প্রকৃত চিত্র পাওয়ার জন্য প্রতিদিন ১০ হাজার লোককে পরীক্ষা করে দেখা উচিত।

বাংলাদেশে কভিড-১৯ পরীক্ষা, আইসোলেট করা এবং আক্রান্তদের চিকিৎসা করার জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বেশ দুর্বল। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যে অবকাঠামো তা কভিড-১৯ এর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম নয়।

এছাড়া বাংলাদেশ শুরুর দিকে এ মহামারী সামলানোর ব্যাপারে কিছুটা শ্লথ ছিল। এরপর বিদেশ থেকে টেস্টিং কিট ও মেডিকেল সরঞ্জাম আনা এবং কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা বিস্তৃত করা হয়।

এছাড়া বাংলাদেশে লকডাউনের মাধ্যমে সামাজিক দূরত্ব নীতির প্রয়োগও খুব বেশি সফল হয়নি। এর জন্য বেশ কয়েকটি কারণ সামনে আনা হয়েছে। এর একটি হচ্ছে বাংলাদেশের সমাজে ও সংস্কৃতিতে সামাজিক দূরত্ব পছন্দনীয় বিষয় নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি বিলাসিতার নামান্তর। এখানে অনেককে একে অন্যের কাছাকাছি থাকতে হয়। পরিবারগুলো অনেক ক্ষেত্রেই বড় এবং তাদের থাকতে হয় অনেক ছোট জায়গায়। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক পরিবারকে একই ট্যাপ ও টয়লেট ব্যবহার করতে হয়।

আবার রিকশাওয়ালাদের মতো অনেকে দিনে এনে দিনে খায়। তাদের কাজের জন্য বাইরে যেতে হয়, যা তাদের উপার্জনের একমাত্র উপায়। তাদের জন্য বাসায় বসে কাজের কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই তাদের বাসায় আটকে রাখা, এমনকি ভাইরাস থেকে বাঁচানোর  জন্য হলেও তা কঠিন।

সামনের দিনগুলোতে লকডাউন অব্যাহত রাখা কঠিন হবে। বিশেষ করে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলো চালু করলে। ২৬ এপ্রিল থেকে গাজীপুর ও আশুলিয়ার একশর মতো গার্মেন্ট কাজ শুরু করেছে। ফলে অনেকেই কাজে ফিরে এসেছে। আরো অনেকে শিগগিরই আসবে। গ্রাম থেকেও অনেকে তখন ফিরে আসবে। কেউ হেঁটে আসবে, কেউ আবার গাড়িতে। সেটিও নতুন করে হুমকি তৈরি করবে।

এছাড়া লকডাউনের কারণে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ চাপে পড়তে যাচ্ছে। বিশেষ করে কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের কারণে ভবিষ্যৎ খুব ভালো দেখাচ্ছে না। বৈদেশিক মুদ্রার আয়ও কমে যাবে।

কেবল জাতীয় অর্থনীতিই নয়, ব্যক্তিগতভাবেও লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে যাচ্ছে। যার প্রভাব হবে ভয়াবহ। দিনমজুরদের আয় কমে যাবে। অনেকে এখনই চলতে পারছে না। ক্ষুধা, অপুষ্টি এবং আরো অন্যান্য সমস্যা বাংলাদেশে সবসময়ই আঘাত হেনেছে, এখন লকডাউনের কারণে এ সমস্যাগুলো প্রকট হয়ে উঠবে।

দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর