বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে কিছু ব্যক্তি দ্রুত ধনী হচ্ছে, অপেক্ষাকৃত মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনমান দিন দিন কমে যাচ্ছে। বর্তমান বৈষম্যমূলক উন্নয়ন, সুশাসনের অভাব এবং আইনের শাসনের অভাব—ঠিক এ সময়ে যোগ হয়েছে নভেল করোনাভাইরাসের ছোবল। এ মহামারী থেকে বেরোতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।
এখন আমি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের জন্য কতগুলো পদক্ষেপ সম্পর্কে বলছি:
১. সব শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, সেবা ও কৃষি খাতসহ সব উৎপাদশীল খাতের কর্মকাণ্ডগুলো চালু রাখতে হবে। বন্ধ রাখা সমীচীন হবে না। এতে ব্যবসা আবার উঠে দাঁড়াতে পাড়বে না, শ্রমিক চাকরি হারাবেন। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হয়তো স্বাভাবিক গতিতে সম্পূর্ণ লাভে চলতে পারবে না, কিন্তু কর্মকাণ্ড সচল রাখতে হবে, গতি মন্থর হলেও।
২. কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কিছু পদক্ষেপ (দেরি হলেও) নেয়া হয়েছে। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত কাউকে ঋণখেলাপি ধরা যাবে না, এটা যথেষ্ট নয়। এ সময়ে ঋণের ওপর কোনো সুদ আরোপ করা যাবে না, সুদ মওকুফ করতে হবে। এ সময় শিল্প, বাণিজ্যপ্রতিষ্ঠানের ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের স্বল্পতা দেখা দেবে। সব ব্যাংককে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দেয়ার জন্য নির্দেশনা দিতে হবে।
৩. কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এখনই ব্যাংক খাতে তারল্য বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিতে হবে। সম্প্রসারণশীল মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে হবে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। এটাকে ন্যূনতম ১৫-১৬ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।
৪. বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি রেট অর্থাৎ সিআরআর, এসএলআর, রেপো রেট কমাতে হবে। তবেই তারল্য বাড়বে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংককে সব বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে এসএলআরের সীমার ঊর্ধ্বে রক্ষিত সব ট্রেজারি বিল এবং ট্রেজারি বন্ড কিনতে হবে, যাতে ব্যাংকের ফান্ড বাড়ে।
৫. বাংলাদেশ ব্যাংককে ক্ষুদ্র, মাঝারি শিল্পের জন্য এবং বিশেষ করে দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ন্যূনতম ৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন ফান্ড তৈরি করে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ হারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিতে হবে, যাতে সর্বোচ্চ ৫-৬ শতাংশ হারে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঋণ পেতে পারে।
৬. রাজস্ব নীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে এ খাতে ভূমিকা রাখতে পারে।। সরকারের ব্যয় সংযত করতে হবে। অপচয় বন্ধ করে সেই অর্থ দিয়ে রফতানিকারী শিল্প, ওষুধ শিল্প ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় শিল্পকে আর্থিক প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে। বিশেষ করে করনীতির আওতায় করপোরেট ট্যাক্সের হার কমানো অথবা আপত্কালের জন্য সেটা বন্ধ রাখা, অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স (ব্যক্তিগত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান) আদায় বন্ধ করতে হবে।
৭. সরকারি অর্থ সংকুলান করার জন্য এডিবি থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাদ দিতে হবে। মেগা প্রকল্পগুলোর অর্থ ব্যয় কিছুটা মন্থর করা যেতে পারে। সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিব কতগুলো পদক্ষেপ ঘোষণা করেছেন। প্রায় সবই প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টন, কোনো অর্থের সংস্থান নেই। এগুলো শুধুই কথামালা, বাস্তবায়ন হলেও তা কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। সরকারকেই অর্থ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সেই সঙ্গে করপোরেট সেক্টর ও বড় বড় শিল্প খাতকে অর্থায়নে এগিয়ে আসতে হবে, এটা তাদের সামাজিক দায়িত্ব।
৮. সব শ্রমিক (গার্মেন্ট, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় শিল্প, অপ্রাতিষ্ঠানিক) সবার জন্য অর্থ ও খাদ্যসহায়তা দিতে হবে। প্রায় ৮০ লাখ শ্রমিক বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক কাজ করছেন। তাদের নগদ সাহায্য দিতে হবে। এটা সামাজিক সুরক্ষার আওতায় অতিরিক্ত অর্থের জোগান দিয়ে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। যাদের মজুরি বা বেতন বন্ধ হয়ে রয়েছে, তাদের জন্য এটা করতেই হবে। অমর্ত্য সেনের ভাষায়, নগদ অর্থ দিয়ে দরিদ্ররা দুর্যোগ ভালোভাবে মোকাবেলা করতে পারে। সরকারের বাজেট ঘাটতি ৫ শতাংশে রাখতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। এটা কিছু সময়ের জন্য ৬-৭ শতাংশ হলেও আপত্তি নেই।
৯. অবিলম্বে সরকারকে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক, জাইকাসহ দ্বিপক্ষীয় আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে।
১০. যেসব দেশে আমাদের প্রবাসী শ্রমিক রয়েছেন, এখনই সেসব দেশের সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের চাকরি সুনিশ্চিত করতে হবে। তাদের যেন ছাঁটাই করা না হয়।
১১. সর্বশেষ খাদ্যোৎপাদন যেন ব্যাহত না হয় (মত্স্য চাষ, গবাদি পশু পালন, সবজি চাষ প্রভৃতি) সেদিকে নজর দিতে হবে। বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ সঠিকভাবে চালিয়ে যেতে হবে এবং প্রয়োজনীয় অর্থ এখনই বরাদ্দ দিতে হবে।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককেন





