আইকান স্কুল অব মেডিসিনের ভাইরোলজিস্ট পিটার প্যালেস, যার জেনেটিক কৌশল প্রতি বছর কোটি কোটি ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিনের ডোজ তৈরিতে ব্যবহূত হয়। তার দল সবর্জনীন ফ্লু ভ্যাকসিনটি আবিষ্কারের জন্য লাখ লাখ ডলার অর্জন করেছে।

প্যালেস কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিনের বিকাশের কাজও করছেন। এটি পাখির ভাইরাস দ্বারা গঠিত, যা জিনগতভাবে পরিবর্তিত করা হয়। প্রোটিন তৈরি করতে যেটি দেখা যায় সার্স-কোভ-২-এর পৃষ্ঠে। সাম্প্রতিক এক প্রিপ্রিন্ট প্রতিবেদন অনুসারে ভ্যাকসিনটি ইঁদুরকে কভিড-১৯-এর পরীক্ষামূলক মডেল থেকে সম্পূর্ণরূপে রক্ষা করেছে। অন্যান্য বেশির ভাগ ফ্লু ভ্যাকসিনের মতো এটি মুরগির ডিমেও বাড়ে, তাই ‘ট্রাইড অ্যান্ড টেস্ট’ কৌশল ব্যবহার করে এর উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে।

সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্যালেসের ভ্যাকসিন সংগ্রাম করছে অর্থায়নের জন্য মনোযোগ পেতে, যা কিনা মানুষের শরীরে ট্রায়ালের জন্য প্রয়োজন। তিনি বলেন, আমরা ভেবেছিলাম এটা দারুণ একটি বিষয় হবে এবং মানুষ আমাদের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়বে এটি পাওয়ার জন্য। কিন্তু ব্যাপারটি তেমন নয়। আমরা খুবই হতাশ।

অবশ্য তাদের ভ্যাকসিনের বিকাশ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে না পারার বেশকিছু কারণও বিদ্যমান। শীর্ষস্থানীয় ফার্মাসিউটিক্যাল ও বায়োটেকনোলজি কোম্পানিগুলো ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলোর মাধ্যমে কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিনের বিকাশে নিজেদের গতি বাড়িয়ে তোলে এবং ফার্স্ট ট্র্যাক রেগুলেটরি অনুমোদনে চোখ রেখেছে। বিপরীতে প্যালেসের মতো কয়েক ডজন আন্ডারডগ ভ্যাকসিন স্থির হয়ে রয়েছে কিংবা খুব শ্লথগতিতে এগোচ্ছে। কারণ তাদের যতটা প্রণোদনা প্রয়োজন, সেটি তারা লাভ করেনি। 

বিজ্ঞানীরা এটা স্বীকার করেছেন যে প্রত্যেক প্রার্থীকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্পদের অপচয় হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু তারা যুক্তি দিয়ে দেখান কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিনের বিকাশে বৈচিত্র্যময় নির্বাচন খুবই জরুরি। কারণ শুরুর দিকে যাদের সম্ভাবনাময় দেখা যায় তারা পরে গিয়ে ব্যর্থও হতে পারেন। কোনো কোনোটা দেখা গেল কেবল আংশিক সুরক্ষা দিচ্ছে, কিংবা খুব দুর্বলভাবে নির্দিষ্ট বয়সের লোকদের ক্ষেত্রে কাজ করছে। আবার উচ্চমূল্য এবং অন্যান্য সমস্যা কোনো কোনো ফ্রন্ট রানারকে অপ্রস্তুত করে তুলতে পারে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে বড় আকারে ভ্যাকসিন বিতরণের ক্ষেত্রে।

ভাইরোলজিস্ট ডেভ ও’কনোর বলেন, প্রত্যেকেই নিজেদের প্রত্যাশা ছাপিয়ে সফলতা অর্জন করতে চাচ্ছে। কিন্তু এটা ভাবাও বুদ্ধিমানের কাজ যে তারা না পারলে কী হবে? আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে আমাদের বিকল্প পরিকল্পনা আছে এবং তারও বিকল্প আছে।

ডজনের মতো প্রার্থী

কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশনের (সিইপিআই) সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, বর্তমানে কভিড-১৯-এর ৩২০টি ভ্যাকসিন বিকাশমান আছে। যার বেশির ভাগই প্রাক-ক্লিনিক্যাল বিকাশের প্রাথমিক ধাপে  রয়েছে। কিন্তু কেবল মুষ্টিমেয় কিছুই কার্যকারিতা প্রমাণের জন্য শেষ ধাপে আছে।

যদিও এ সুসংবাদের পাশাপাশি এখানে কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। একটি হচ্ছে এটি নির্ধারণ করা যে, কোন প্রার্থী খরুচে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের দিকে অগ্রসর হবে: এমনকি সুরক্ষা ও ডোজ পরীক্ষা করার বিষয়টি বেশির ভাগ একাডেমিক গোষ্ঠীর নাগালের বাইরে, অন্যদিকে ছোট দলগুলোকে নিজেদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য বেশ সংগ্রাম করতে হয়। বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা তাদের মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন প্রচেষ্টা একাডেমিক দলগুলোর জন্য দরজা উন্মুক্ত করেছে। ভ্যাকসিন প্রচেষ্টার শীর্ষ সারিতে আছে ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী অ্যাস্ট্রাজেনেকার একটি দল। যাদের ট্রায়াল স্থগিত হয়েছে একজন স্বেচ্ছাসেবকের স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ার পর। এ ভ্যাকসিনের ভিত্তি হচ্ছে শিম্পাঞ্জির কোল্ড ভাইরাস, যাকে বলা হয় অ্যাডেনোভাইরাস। যা কিনা ইবোলা, ম্যালেরিয়া ও  অন্যান্য রোগের পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটিকেই অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনোলজিস্টরা কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন আবিষ্কারের উপজীব্য হিসেবে ব্যবহার করেন।

ভাইরাল ইমিউনোলজিস্ট মাইকেল ডায়মন্ড বলেন, কোনো প্রযুক্তিই এখন পর্যন্ত লাইসেন্সধারী ভ্যাকসিন উৎপাদন করতে পারেনি এবং কোনো নিশ্চয়তা নেই যে এ ভ্যাকসিনগুলো করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ইমিউনিটি প্রদর্শন করতে পারবে।

ডায়মন্ডের অ্যাডেনোভাইরাস ভ্যাকসিন আবার অন্য শীর্ষস্থানীয় ভ্যাকসিনগুলোর মতো নয়। এটি নকশা করা হয়েছে নাক দিয়ে গ্রহণ করার জন্য। ক্যানসার বায়োলজিস্ট ডেভিড কুরিয়েলের নেতৃত্বাধীন একটি দল ইঁদুরের নাক দিয়ে ভ্যাকসিনের একটি ডোজ প্রদান করে দেখেছে যে সেগুলো সার্স-কোভ-২ থেকে সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত। এর কারণ হচ্ছে ইন্ট্রানাসাল ভ্যাকসিন শক্তিশালী ‘মিউকোসাল’ সুরক্ষা প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে, যা কিনা ওপরের এয়ারওয়েতে সংক্রমণের সাইটে ভাইরাসকে আটকে দিতে পারে।

এসব ট্রায়ালের ওপর ভিত্তি করে ডায়মন্ড মনে করেন তার দল নিজেদের ভ্যাকসিনকে মানুষের শরীরে ট্রায়ালের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তার ইউনিভার্সিটি ইন্ট্রানাসাল ভ্যাকসিন প্রস্তুতের জন্য একটি চুক্তি সম্পন্ন করেছে, কিন্তু ডায়মন্ড এখনো কাউকে এগিয়ে আসতে দেখেনি তার দলের লাইভস্টক ভাইরাস ভ্যাকসিনের জন্য। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি মের্ক একই ভাইরাসের ওপর ভিত্তি করে নিজেদের ভ্যাকসিনের বিকাশ করছে। যা কিনা ইবোলা ভ্যাকসিনেরও মূল চাবিকাঠি, যেটি গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন দ্বারা অনুমোদন লাভ করেছে। ডায়মন্ডের মতে, অনেক কোম্পানির অতিরিক্ত প্লাটফর্ম নেয়ার মতো ব্যান্ডউইথ, টাকা কিংবা ইচ্ছা নেই। তার মতে, এখানে প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে যোগ্য সঙ্গী খুঁজে বের করা।

দাতাদের অগ্রাধিকার

শুরুতে সিইপিআইয়ের অর্থের প্রথম অনুমোদন পাওয়ার জন্য অনেক ভ্যাকসিন লড়াইয়ে ছিল, যারা কিনা কভিড-১৯-এর নয়টি ভ্যাকসিনের পেছনে ৯০০ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। বায়োমেডিকেল অ্যাডভান্সড রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটিসহ (বিএআরডিএ) মার্কিন সরকারের এজেন্সিগুলো বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে কাজে গতি আনার জন্য।

কিন্তু অন্য অর্থদাতারা নিজেদের অগ্রাধিকারসহ এগিয়ে আসছে একাডেমিকদের তাদের পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিনকে পণ্যে রূপান্তর করার জন্য।

অনেক ধনী দেশ নেতৃস্থানীয় কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন প্রার্থীদের প্রাথমিক সরবরাহ থেকে সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করছে, এ রকম কিছু দল বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন তৈরির ওপরও দৃষ্টি রেখে চলেছে।

গবেষকরা বলছেন, কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিনের জন্য নেতৃত্ব ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে দাতাদের এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু আন্ডারডগ ভ্যাকসিন বিকাশকারীরা তাদের ভ্যাকসিনগুলো মহামারীর অবসান ঘটাতে কতটা সাহায্য করতে পারে, তাও দেখতে চান। এ প্রসঙ্গে বায়োকেমিস্ট নিল কিং বলেন, একজন মানুষ হিসেবে আমি আশা করব কোনো প্রার্থীই ব্যর্থ হবে না। আমি দেখতে চাই, এখানে প্রতিটি ভ্যাকসিন কাজ করছে। আমি এই মহামারীকে বিদায় নিতে দেখতে চাই।

নেচার থেকে সংক্ষেপে অনূদিত