করপোরেট ওয়ার্ল্ডে আজ একটি কথার বেশ প্রচলন আছে—কেওয়াইসি (নো ইওর ক্লায়েন্ট) বা আপনার গ্রাহককে জানুন। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলা হচ্ছে কোনো সম্পর্ক তৈরি বা ঋণ দেয়ার আগে দয়া করে আপনারা আপনাদের গ্রাহককে জানুন; অর্থাৎ তার আর্থিক অবস্থা, সামাজিক অবস্থান, নৈতিক চরিত্র ও পারিবারিক অবস্থান জেনে নিন। পাশাপাশি তার সঙ্গে ব্যবসায়িক ও আর্থিক সম্পর্ক গড়ে তুলুন। তাহলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নিরাপদভাবে বিনিয়োগ করতে পারবে। যদি কোনো অবস্থায় কোনো ক্লায়েন্ট ঋণ নেয়া সত্ত্বেও নিয়ম অনুযায়ী পরিশোধ করতে না পারেন, ক্লায়েন্টের সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থানের ওপর আস্থা রেখে ব্যাংক তার নিজের দায়িত্বে ধৈর্য ধারণ করে অপেক্ষা করতে পারে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার এডি রিপোর্ট অনুযায়ী সময়োপযোগী ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সময় দিতে পারে। অবশ্যই এটা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর ওপর নির্ভর করে।
আজকে আমি সত্যিকার অর্থে কেওয়াইসি সম্পর্কে বলতে চাইছি না। এটার সূত্র ধরেই কেওয়াইএফ (নো ইওর ফ্যামিলি) বা ‘আপনার পরিবারকে জানুন’-এ যেতে চাইছিলাম। আমরা কি কখনো আমাদের কেওয়াইএফ বলতে শুধু আমাদের দুই সদস্যের সংসার বা আমাদের এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলি অর্থাৎ বর্ধিত পরিবারকে বোঝা বা জানার চেষ্টা করেছি?
এই করপোরেট যুগে আমি তো আমার চারজন পারিবারিক সদস্যকেই সঠিকভাবে জানি না। আমার পুরো পরিবার অর্থাৎ ফ্যামিলি তো চিন্তা বা ভাবনার বাইরে থাকে। যান্ত্রিক ও ম্যাটেরিয়ালিস্টিক যুগে ভাবার সময় কই? ঢাকা শহরে এ রকম পাখির আগমন কি আমরা গত কয়েক বছরে দেখেছি?
পাখির ডাকে ঘুম ভাঙা—এ আমরা ভুলেই বসেছি; মেঘের আড়ালে সূর্য হাসে। নভেল করোনাভাইরাসে আজ সারা বিশ্ব আতঙ্কিত। আমরা জানি না কাল কী অবস্থানে থাকব, কিন্তু করোনা তো আমাদের জীবনের মূল্যবোধ শেখাতে পারে। হাজার কোটি টাকা থাকা সত্ত্বেও ধনীরা যেভাবে ভেবেছিল, শুধু কাশি হলেই ব্যাংকক বা সিঙ্গাপুর গিয়ে চিকিৎসা করে শতভাগ সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরব, আজকে কি তা সম্ভব? আমাদের শতভাগ নিশ্চিত জীবন কখনো কখনো কোনো কাজেই লাগে না। নভেল করোনাভাইরাস সেই বার্তা দিচ্ছে। সামাজিক বন্ধন ও সহমর্মিতা এখানে উত্তরণের একমাত্র উপায়। বছর বছর ধরে সংসার করেও পরিবারের প্রতি সহমর্মী কখনো হইনি। সমাজের প্রতি সহমর্মিতা সেজন্যই কখনো উপলব্ধি করি না। আজ করোনা বাসায় বন্দি রেখেছে। আর্থিক লেনদেন থেকে দূরে রেখেছে। বারবার বলছে—নিজেকে জানো, পরিবারকে জানো, সমাজকে জানো। সৃষ্টির সেরা জীব হয়ে কখনো কি আমরা সেভাবে উপলব্ধি করেছি? করোনা নিয়ে অনেকে অনেক আজগুবি কথা বলছে, কিন্তু করোনা তাকে বার্তা দিয়ে যাচ্ছে—তোমরা সবাই একত্র হও। সবার সম্পদ কিছুটা হলেও সমবণ্টন করো। উপলব্ধি করো ব্রিটেনের রাজকুমার ও প্রধানমন্ত্রীর জীবন কোনো অবস্থাতেই সাধারণ একটা ভিখারির চেয়েও মূল্যবান নয়। কারণ চিকিৎসা পদ্ধতি একই। সবাইকে একই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পার হতে হবে। পৃথিবী তার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে অনেক সময় লাগবে। কিন্তু পৃথিবীতে এখন থেকেই তার অবস্থান উপলব্ধি করতে পারা উচিত। সেটা শুরু হতে হবে পরিবার থেকে, সহমর্মিতা থেকে এবং কার্যকর ভূমিকার মাধ্যমে। জি২০ যদি শুধু তার সদস্য রাষ্ট্রের কথা ভেবে কাজ করে তাহলে কিছুই হবে না। থ্রি সিক্সটি ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলের চিন্তাভাবনা চালাতে হবে। করোনা বলছে, পৃথিবীর আসলে কোনো সীমা বা সীমান্ত ছিল না। এটা মানুষের সৃষ্টি। করোনা সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা উহান রাজ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত।
আমরা সেই কেওয়াইসি থেকে কেওয়াইএফে ফিরে যাই। আমরা কি কখনো নিজেকে চেনার চেষ্টা করেছি? নিজেকে চিনতে না পারলে পুরো পরিবার বা সমাজকে কীভাবে চিনব? পরিবারের সবার কথা কি কখনো গত ২০ বছর মনে পড়েছে? কে কোন অবস্থানে আছে? তাদের সঙ্গে শেষ কবে হ্যালো বলেছি? তাদের নিয়ে চিন্তা করার শক্তি আমরা হারিয়ে ফেলেছি। যদি আমরা সামাজিক বা আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকি, তারা কিন্তু শুধুই আমাদের সঙ্গে বলেই সন্তুষ্ট। অনেক সময় কিন্তু পরিবারের অসচ্ছল সদস্যরা ওদের প্রাণের দাবিতে আমাদের কুশলাদি জানতে চায়, আমাদের হীনম্মন্যতার জন্য আমরা তাদের কখনো সময় দিই না। করোনা আমাদের অনেক জীবন মুহূর্তের মধ্যেই ছিনিয়ে নিয়েছে। অর্থনৈতিক অবস্থা আজ সারা বিশ্বে ভঙ্গুর, কবে কখন আমরা আগের অবস্থায় ফিরব, জানি না। তবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনার জরিপ থেকে শুধু এটাই বলতে পারব—ধরণী তার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে অনেক সময় নেবে।
তাই বলে কি পৃথিবী থেমে থাকবে অনন্তকাল ধরে!!! করোনা
বারবার বলছে, চীন তার দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেনি। আমার আগমনী বার্তা সারা বিশ্বকে বলেনি। আমার ভয়ংকরতা সম্পর্কেও কাউকে বলেনি, কারণ এখানে সমাজ তো চলছিল আমি করোনাকে বাদ দিয়ে। কিন্তু আমি তো শুধু চীনের জন্য আসিনি। আমি এসেছি মহাপ্রলয় হিসেবে। আমি এসেছি বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে। আমার প্রলয় ও ক্ষয়ক্ষতির পাশে আমি যে বিশ্ববন্ধুত্বের ও সহমর্মিতার বার্তা নিয়ে এসেছি, তা জানাতে হবে। সেটা নিয়ে রাজনীতি না করে এখনো সময় আছে আমার অর্ধসমাপ্ত বার্তাকে পৌঁছে দেয়ার। এই আধুনিক বিশ্বে সবাই শুধু তার প্রলয়ঙ্করী ক্ষমতার অবস্থান নিয়ে বাহাদুরি দেখিয়ে যাচ্ছে। এখনো সময় আছে সবাই এক হয়ে সীমানার বাইরে মানবকল্যাণে কাজ করার। তা না হলে আমি বিভিন্ন রূপে তোমাদের দিকে ধাবিত হব। তোমরা তার কোনো বৈজ্ঞানিক সমাধান খুঁজে পাবে না, যদিও আমি তোমাদের বিজ্ঞানেরই একটি ক্ষুদ্র কণা মাত্র।
আমি আবার অবাধ্য হলে কেউই আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না!!!
মোহাম্মদ সায়ফুল ইসলাম: ম্যানেজিং ডিরেক্টর, পিকার্ড বাংলাদেশ





