নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে পৃথিবী। প্রতি মুহূর্তে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছে মানুষ। এ অবস্থায় আমরা পরবর্তী ভাইরাসের আগমন নিয়ে চিন্তা করতে পারি। না, এটা একেবারেই তাড়াতাড়ি হচ্ছে না। যদিও মহামারী কভিড-১৯ এখনো তার প্রাথমিক অবস্থা পার করছে। ২০০৪ সালে সার্স যখন মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল, সেবারও পৃথিবী বুঝতে পারেনি পরবর্তী ভাইরাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে। যার মূল্য এখন সবাইকে দিতে হচ্ছে।

কভিড-১৯, সার্স ছাড়াও এইডস, ইবোলা ও মারবার্গের মতো এমন কিছু রোগ আছে, যা মানবদেহে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সংক্রমিত হয় না। এগুলো মূলত প্রাণী রোগ (যাদের জুনোসিস বলেও ডাকা হয়), যা সাধারণত প্রাণীদেহ থেকে মানবদেহে চলে আসে। তারা প্রধানত অন্য স্তন্যপায়ী এবং নিকটবর্তী প্রাণী থেকে আমাদের কাছে চলে আসে। এর কারণটা খুবই সহজ-সরল। হোস্টের দেহের অভ্যন্তরে রাসায়নিকভাবে জীবাণু বিকশিত হয়ে নতুন হোস্টের সন্ধানে থাকে। এরপর একই ধরনের অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক পরিবেশ পেলে তারা স্থানান্তরিত হয়ে চলে আসে। মানুষ যেহেতু স্তন্যপায়ী প্রাণী, তাই এ জীবাণুও অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে সহজেই মানবদেহে চলে আসতে পারে।

মানবদেহে সার্সের আগমন ঘটেছিল চীনের বন্যপ্রাণী বেচাকেনার মার্কেট থেকে। চীনে এ রকম অসংখ্য মার্কেট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। যেখানে বন্যপ্রাণী হত্যা করে কিংবা আটকে রেখে বিক্রি করা হয়। জীবিত ও মৃত উভয় ধরনের প্রাণী এখানে বিক্রি করা হয়, যা খাওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য কাজেও ব্যবহার করা হয়। সার্স ছড়িয়ে পড়েছিল চীনের বাজারে আনা খাটাস থেকে। তবে এর উত্পত্তি বাদুড় থেকে। 

চীন ছাড়াও বন্যপ্রাণী অন্যান্য দেশের বাজারেও বিক্রি করা হয়। তবে মহামারী ছড়িয়ে পড়ার জন্য চীনের বাজারগুলোকে সবচেয়ে উপযুক্ত বলে বিবেচনা করা হয়। কারণ পৃথিবীতে চীনের জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি কার, বিমান ও দ্রুতগামী ট্রেন দ্বারা চীনের শহরগুলো বেশ ভালোভাবেই সংযুক্ত। 

এর ফলেই মূলত মানবদেহে প্রাণীবাহিত রোগগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ মূলত চীনের বন্যপ্রাণী বেচাকেনার বাজারগুলোই দিয়ে থাকে। অনেক বছর ধরেই জনস্বাস্থ্য কর্মীদের কাছে এ বিষয়গুলো পরিচিত। এর আগে ২০০৪ সালে এ বাজার থেকে সার্স ছড়িয়ে পড়েছিল, তখনই এটিকে সতর্কবার্তা হিসেবে নেয়া উচিত ছিল চীনের। 

এরপর উহানে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে যখন নভেল করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে, তখনই জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সন্দেহ করেন বন্যপ্রাণীর বেচাকেনার বাজার থেকে এ ভাইরাসের আগমন। যদিও এখনো এটি প্রমাণিত নয়, তবে সব তথ্য-উপাত্ত সেদিকেই ইঙ্গিত করছে। 

চীন সরকার শুরুতে এ প্রাদুর্ভাবকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সংক্রমণের মাত্রা সীমাবদ্ধ রাখার জন্য বেইজিং বেশ জোরালো পদক্ষেপ নেয়। এর মাঝে জুনোসিস রুখে দেয়ার লক্ষ্যে বন্যপ্রাণী বেচাকেনার বাজার বন্ধ করে দেয় তারা। পাশাপাশি খাবার হিসেবেও বন্যপ্রাণী বেচাকেনার ব্যবসায় স্থায়ীভাবে তালা ঝুলিয়ে দেয়। 

এটা বেশ ভালো সংবাদ। কিন্তু এর বাইরে খারাপ সংবাদও আছে। বেচাকেনার বাজার বন্ধ করলেও মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংস্পর্শে আসার আরো কিছু প্রধান রাস্তা খোলা রেখে দেয়া হয়। যেমন সনাতনী ওষুধ বানানোর উপকরণ হিসেবে জীবিত প্রাণী বেচাকেনা। এ ব্যবসায় অনেক প্রজাতির প্রাণীর ব্যবহার হয়ে থাকে এবং অনেক মানুষ এর পৃষ্ঠপোষকতা করে। তাদের মাঝে একটি হচ্ছে বনরুই, যা সনাতনী ওষুধ বানানোর জন্য বিশাল পরিমাণে ব্যবহার করা হয়। তাদের মতে, এ ওষুধ দিয়ে জ্বর, চামড়ার সংক্রমণ ও যৌনরোগ নিরাময় সম্ভব। 

প্রশ্ন হচ্ছে, শক্তিশালী চীন সরকার যদি কয়েক দিনের মধ্যে কোটি কোটি মানুষকে লকডাউন করে রাখতে পারে, তবে তারা কেন বন্যপ্রাণীর এ ব্যবসা বন্ধ করতে পারছে না? অনেক চীনা এটা কেবল একটি পণ্যের চেয়ে বেশিকিছু হিসেবে দেখে থাকে। এসব তারা সাংস্কৃতিক অভ্যাস হিসেবেও চর্চা করে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাসের হুমকি এর চেয়ে বেশি কিছু। চীনসহ অন্যান্য দেশের সরকারকে দ্রুত বন্যপ্রাণীর এ বাণিজ্য বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে। নয়তো কভিড-১৯ মোটেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া শেষ মহামারী হবে না। যতদিন পর্যন্ত বন্যপ্রাণীকে খাবার এবং অন্যান্য উদ্দেশ্যে বাজেভাবে ব্যবহার করা হবে, ততদিন পর্যন্ত এ রকম আরো অনেক ভাইরাসের জন্য আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হবে। এটা চীনে হোক কিংবা অন্য কোথাও।

এর আগে সার্স ছড়িয়ে পড়লে সেটিকে সহজেই মোকাবেলা করা গিয়েছিল। যেখানে কভিড-১৯-এ মৃতের সংখ্যা এরই মধ্যে ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা। এর বাইরে অর্থনীতি, জীবন-জীবিকার ওপর প্রভাব তো আছেই।

তাই বলা যায়, কভিড-১৯-এর পর যে ভাইরাস অপেক্ষা করছে, তা আরো অনেক বেশি ক্ষতি নিয়ে আসছে আমাদের জন্য। বিশ্বব্যাপী মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ বাড়ছে। তাই এখনই প্রস্তুতি না নিলে পরবর্তী মহামারী হতে পারে আরো ধ্বংসাত্মক। 

এ ঝুঁকি কমিয়ে আনতে পারে বন্যপ্রাণীর ব্যবসা বন্ধ করে। চীন সরকার এ উদ্যোগ নিয়ে কেবল বিশ্বের জন্য উপকার করেনি, চীনা নাগরিকদেরও বাঁচিয়ে দিয়েছে। কারণ এ ব্যবসা চালিয়ে গেলে কভিড-১৯-এর মতো পরবর্তী যেকোনো মহামারীর প্রথম শিকার হতে পারে তারাই।

ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে অনূদিত