একটি ঝঞ্ঝামুখর, বৈরী বৈশ্বিক পরিবেশে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞে রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কৃষি, অবকাঠামোসহ পুরো দেশই বিধ্বস্ত। পাকিস্তানের মিওয়ালি কারগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু প্রিয় স্বদেশে ফেরেন। সশরীরে গ্রহণ করেন রাষ্ট্রভার। ওই সময় স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি লাভ এবং রাষ্ট্র-অর্থনীতি পুনর্গঠনই ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ। পাকিস্তানিদের বঞ্চনায় রাজকোষ প্রায় শূন্যই বলা চলে। হাতে প্রয়োজনীয় অর্থ নেই। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো থেকে অর্থ সংগ্রহ এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে মনোযোগ দেন বঙ্গবন্ধু। বৈশ্বিকভাবে সম্পৃক্তি বাড়াতে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (ন্যাম) এবং ওআইসিসহ বিভিন্ন জোটের সঙ্গে যুক্ত হন। একই সঙ্গে অনেক বিশ্বনেতাকে বাংলাদেশ সফরের রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণ জানান এবং অন্যদের আমন্ত্রণে বিভিন্ন দেশও সফর করেন তিনি। ওইসব বিশ্বনেতার মধ্যে মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত অন্যতম।

মূলত বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণেই মিসরের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। মাত্র ৩ ঘণ্টার জন্য ১৯৭৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পদার্পণ করেছিলেন তিনি। প্রকৃতপক্ষে, তিনি লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছিলেন। সেখান থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে যোগ দিতে দিল্লিতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে দেশে ফেরার পথে স্বল্প সময়ের জন্য ঢাকায় পা রাখেন।

উল্লেখ করা দরকার, আনোয়ার সাদাতই প্রথম আরব কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। জটিল বিশ্বরাজনীতি, বিশেষ করে আরব বিশ্বের দিক থেকে বাংলাদেশে তার সফর বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সত্যি বলতে কী, মুসলিম উম্মাহর সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর সম্পৃক্তি এবং বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের কল্যাণ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি মুসলিম দেশগুলোর সামনে আনার এটাই ছিল সূচনা। মিসরীয় প্রেসিডেন্টকে বহনকারী বিমানটি ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করেন বেলা ১১টায়। তাকে অভ্যর্থনা জানান তত্কালীন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ উল্লাহ এবং প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিমানবন্দর থেকে একই গাড়িতে করে তিনজনই বঙ্গভবনে পৌঁছান। সেখানে তারা মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন।

মধ্যাহ্নভোজের পর বঙ্গবন্ধু ও সাদাত এক সংক্ষিপ্ত বৈঠকে মিলিত হন। দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসম্পর্কিত বিষয়ের পাশাপাশি কিছু আন্তর্জাতিক ইস্যু, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত উপমহাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। তারা বাংলাদেশ ও মিসরের ঘনিষ্ঠ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর জোরারোপ করেন। আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের মতো না হলেও ওই বৈঠকে তারা খুব বন্ধুত্বপূর্ণ ও আন্তরিক পরিবেশ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনা করেছিলেন। বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন দুই নেতার আলোচনা সম্পর্কে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। দুই নেতা পারস্পরিক স্বার্থের আন্তর্জাতিক ইস্যু, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, ফিলিস্তিনিদের বৈধ অধিকার, উপমহাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা শক্তিশালী করাসহ দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করা বিষয়ে আলোচনা করেন বলে জানান তিনি। বৈঠকের পর মিসরের প্রেসিডেন্ট একই গাড়িতে করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীসহ বিমানবন্দরে ফিরে যান।

বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মিসরের প্রেসিডেন্ট খুব সংক্ষিপ্ত সফর হলেও বাংলাদেশে আসতে পেরে নিজের খুশির কথা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মাটিতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অনেক দিন ধরে আগ্রহী ছিলেন। বাংলাদেশে তার প্রথম সফরের কথা স্মরণ করে মিসরের প্রেসিডেন্ট বলেন, ১৯৫৫ সালে তিনি যখন এসেছিলেন তখন মুজিব জেলখানায় ছিলেন, যার কারণে তার সঙ্গে তখন দেখা হয়নি। বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎ পেয়ে এবার তিনি ভীষণ খুশি। আরেক প্রশ্নের প্রতিক্রিয়ায় মিসরের প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, তিনি দীর্ঘ সময়ের জন্য বাংলাদেশে আবার আসবেন। জানান, তিনি বঙ্গবন্ধুকে মিসর সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং বঙ্গবন্ধুও তা গ্রহণ করেছেন। আরো বলেন, মুজিবের সঙ্গে আরো অনেক বিষয়ে আলোচনা ভবিষ্যতের জন্য রেখে দিয়েছেন।

বিমানবন্দরেও একটি মজার ঘটনা ঘটেছিল। মিসরের প্রেসিডেন্ট বিমানে আসন গ্রহণ করেছেন। কিন্তু ফ্লাইট যাত্রা করতে দেরি করছিল। বঙ্গবন্ধু ফ্লাইট না যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলেন। সাদাত সেই খবর পেলেন এবং তাত্ক্ষণিকভাবে বার্তা পাঠান আর যেন তিনি অপেক্ষা না করেন। তবে ওইদিন বঙ্গবন্ধু তার বন্ধুর অনুরোধ রাখেননি। ফ্লাইট যাত্রা না করা পর্যন্ত বিমানবন্দরে তিনি অপেক্ষা করেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে আনোয়ার সাদাতের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কের গভীরতা খানিকটা আঁচ করা যায় বৈকি।

অন্য অনেক বিশ্বনেতার চেয়ে আনোয়ার সাদাতের সঙ্গে কেন বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয় আর কেনইবা তত্কালীন মিসর বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়ায়, এর একটা অনপেক্ষ পর্যালোচনা দরকার। স্পষ্টত এক্ষেত্রে অনেক কারণ রয়েছে। তার মধ্যে একটা হলো আনোয়ার সাদাতের রাজনৈতিক বীক্ষা ও গৃহীত নীতিগুলোর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর চিন্তার সাযুজ্য। সামরিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উঠে এলেও তিনি উদারবাদী, সেক্যুলার রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এসব নীতির ক্ষেত্রে তার পূর্বসূরির ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার একটা চেষ্টা ছিল। সাদাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ নীতি ছিল উন্মুক্ত দুয়ার নীতি (আরবি ভাষায় যাকে বলা হয় ইনফিতাহ)। এ নীতিতে অর্থনীতির বিকেন্দ্রীকরণ, বৈচিত্র্যায়ণের পাশাপাশি বাণিজ্য ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়। উদ্দেশ্য, অর্থনীতিকে আরো উদারীকরণ করা। এর মূল্যও তাকে চুকাতে হয়েছিল। মূল্যস্ফীতি ও সম্পদের অসম বণ্টনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, অসমতা তীব্রতর হয়েছিল এবং ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে যা খাদ্য দাঙ্গায় রূপ নিয়েছিল।

সমরূপভাবে, বৈদেশিক নীতিতেও তিনি নাটকীয় পরিবর্তন এনেছিল। ইসরায়েলের সঙ্গে মিসরের অব্যাহত সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন কম সমর্থন জোগাচ্ছে—এমনটি মনে হলে তিনি ১৯৭২ সালে দেশ থেকে কয়েক হাজার সোভিয়েত টেকনিশিয়ান ও উপদেষ্টা বহিষ্কার করেছিলেন। তত্কালীন বাস্তবতায় এটি বড় দুঃসাহস বৈকি। আরো উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইসরায়েলের সঙ্গে মিসরের প্রাথমিক শান্তি প্রক্রিয়াও সাদাতের আমলেই শুরু হয়েছিল। ইসরায়েলকে সিনাই উপদ্বীপে ফিরে যাওয়ার শর্তে তিনি দেশটির সঙ্গে একটি শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তিতে পৌঁছার ব্যাপারে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। ওই উদ্যোগ ব্যর্থ হলে তিনি সিরিয়ার সমন্বয়ে ওই ভূখণ্ড পুনরায় দখল করতে সামরিক হামলা চালান। ফলে ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে তিনি এই প্রথম আসলে ইসরায়েলের কাছ থেকে কিছু ভূখণ্ড নিজেদের অধিকারে নিতে সমর্থ হয়েছিলেন এবং আরব নেতাদের মধ্যে তার একটি বিশেষ মর্যাদার আসন তৈরি করেছিলেন।

ওই যুদ্ধের পর সাদাত মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ১৯৭৭ সালে ইসরায়েলে ঐতিহাসিক সফর করেছিলেন। ওই সময় তিনি জেরুজালেম সফর করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটের সামনে ধর্মীয় দিক থেকে মুসলিম ও ইহুদিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থানটি নিয়ে তার শান্তি পরিকল্পনা তুলে ধরা। তার ওই সফর কয়েকটি কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সূচনা ঘটিয়েছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আরব বিশ্বের প্রচণ্ড বিরোধিতা সত্ত্বেও যা তিনি অব্যাহত রেখেছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের মধ্যস্থতায় সাদাত ও বেগিনের মধ্যকার শান্তি আলোচনাগুলো হয়েছিল। এসব আলোচনার ফলে ইসরায়েল ও মিসর একটি প্রাথমিক শান্তিচুক্তিতে সম্মত হয়, যা ক্যাম্প ডেভিড অ্যাকর্ডস নামে পরিচিত। এজন্য ১৯৭৮ সালে সাদাত ও বেগিন শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। বড় বিষয় হলো, তত্পরবর্তী অব্যাহত রাজনৈতিক আলোচনার সূত্র ধরে ১৯৭৯ সালের মার্চে মিসর ও ইসরায়েল একটি চূড়ান্ত শান্তিচুক্তিতে উপনীত হয়। এটি ছিল আরব কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের প্রথম চুক্তি।

এমন এক বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে আনোয়ার সাদাত বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে মিসরের সম্পর্ক জোরদার করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় সফরে বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিল। এক্ষেত্রে বাদ যায়নি বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও।  বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাদতের বন্ধুত্বের একটি বড় কারণ ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ আরবদের সমর্থন দিয়েছিল। আরবদের প্রতি সমর্থন এবং ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মিসরে চা পাঠিয়েছিলেন আমাদের জাতির পিতা। আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর মিসরের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার আল সাদাত বাংলাদেশের পাঠানো উপহারের কথা ভোলেননি। বাংলাদেশে সফরের সময়ে শেখ মুজিবকে জানান, মিসর বাংলাদেশকে ৩০টি ট্যাংক উপহার দিতে চায়। উদ্দেশ্য ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশের অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তোলা। বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক সহযোগিতা চেয়েছিলেন। ট্যাংক নিতে অতটা রাজি ছিলেন না। কিন্তু পররাষ্ট্র দপ্তর ও মন্ত্রীরা তাকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, মিসরের উপহার ফিরিয়ে দেয়া ঠিক হবে না। মূলত অন্যদের জোরাজুরিতে মিসরের উপহার নিতে রাজি হয়েছিলেন। শুধু উপহার গ্রহণ নয়, বঙ্গবন্ধু তার দেয়া প্রতিশ্রুতিও রেখেছিলেন। ১৯৭৪ সালের নভেম্বরে তিনি মিসর সফর করেছিলেন। এটিও উভয় নেতার পারস্পরিক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও অঙ্গীকারের বহিঃপ্রকাশ বৈকি। মোদ্দা কথা, বঙ্গবন্ধু ও আনোয়ার সাদাতের সম্পর্ককে বিচার করতে হলে তত্কালীন বৈশ্বিক-আঞ্চলিক রাজনীতি, নীতি-আদর্শ ও জোটগত অবস্থানসহ বিভিন্ন দিক অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। নইলে উভয় নেতার বন্ধুত্বের গভীরতা ও বাঁকবদলগুলো ধরা সম্ভব নয়।

 

হুমায়ুন কবির: সাংবাদিক