তাদের মধ্যে
বয়সের পার্থক্য
বছর ছয়ের।
দুজনই নিজ
নিজ ব্যক্তিত্বে
উজ্জ্বল। নিজ
দর্শনে আপসহীন।
মুক্তিকামী জনতার
একান্ত অধিশ্রয়।
দ্রোহী সত্তার
সারথী। শেখ
মুজিবুর রহমান
বিদ্রোহ ঘোষণা
করেছিলেন নিপীড়ন,
নিষ্পেষণ ও
সমাজের মেরুকরণের
বিরুদ্ধে। হাজার
বছরের বাঙালির
সংস্কৃতির মূল
উপড়ে নেয়ার
যে হীন
দুরভিসন্ধিতে লিপ্ত
ছিল পাকিস্তানি
স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্র,
মুজিব সেখানে
অন্যতম প্রতিবাদী
কণ্ঠ হয়ে
যূথবদ্ধ করেছিলেন
বাংলার মুক্তিকামী
মানুষকে।
অন্যদিকে
ফিদেল কাস্ত্রো,
এল কমান্দান্তে—দি
কমান্ডার। সংগ্রামী
মানুষের কাছে
তিনি বিপ্লবী
নেতা। আস্থার
প্রতীক। পুঁজিবাদ
তা সে
কট্টর কিংবা
আংশিক হোক
না কেন,
এমন রাষ্ট্রের
কাছে ফিদেল
মানে একনায়ক।
সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদের
পতাকা হাতে
ছুটে চলা
গেরিলা যোদ্ধা।
পাকিস্তানি
সামরিক জান্তাদের
রক্ষচক্ষু যেমন
মুজিবকে বিন্দুমাত্র
তার সংকল্প
থেকে টলাতে
পারেনি, তেমনি
বিশ্বের সবচেয়ে
ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের
বিরুদ্ধে একক
উচ্চতায় দাঁড়িয়ে
থেকেছেন ফিদেল।
মুজিবুর
রহমানের কালো
পাইপ আর
ফিদেলের হাভানা
চুরুট। ফিদেলের
কালচে সবুজ
সামরিক পোশাক
আর মুজিবের
কালো কোট।
মুজিব কোট;
সাদা পাঞ্জাবি-পাজামার
ওপর কোটা
হাতা কাটা
কোট। দুপাশে
দুই পকেট,
বোতাম প্লেটে
ছয়টি কালো
বোতাম। কথিত
আছে, ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক
ছাত্র একবার
এই ছয়ের
রহস্য জানতে
চাইলে বঙ্গবন্ধু
তাকে বলেছিলেন,
‘এই
ছয় বোতাম
আমার ছয়
দফার প্রতীক।’
ফিদেল
সবসময় দাড়ি
রাখতেন। ১৯৫৯
সালে কিউবার
বিপ্লবের ৩০
দিন পর
সিবিএসের এডওয়ার্ড
মুরোকে দেয়া
এক সাক্ষাত্কারে
কাস্ত্রো বলেছিলেন,
‘আমি
আমার দাড়ি
কেটে ফেলার
কথা ভাবছি
না। কারণ
আমি আমার
দাড়িতেই অভ্যস্ত।
তাছাড়া আমার
দাড়ি আমার
দেশের জন্য
অনেক অর্থ
বহন করে।
সুশাসনের জন্য
আমরা যেদিন
আমাদের অঙ্গীকার
পূরণ করতে
পারব, সেদিন
আমি দাড়ি
কাটব।’
‘কিউবার
নাম বাংলাদেশে
প্রথম আলোচিত
হয় ১৯৭৩
সালে। জোটনিরপেক্ষ
আন্দোলনে তখন
ছোট্ট কিউবা
বড় মাপের
সক্রিয় অংশীদার।
শেখ মুজিবুর
রহমানের সঙ্গে
ফিদেল কাস্ত্রোর
সাক্ষাৎ হয়
সে রকম
এক সম্মেলনে।
কিউবা তখন
বাংলাদেশের সঙ্গে
বাণিজ্যিক সম্পর্ক
স্থাপনে আগ্রহ
প্রকাশ করে।
বাংলাদেশও এতে
আগ্রহ দেখায়
এবং কিউবায়
পাট রফতানির
উদ্যোগ নেয়।
আমরা জানতে
পারি যুক্তরাষ্ট্র
এতে ভয়ংকর
ক্ষিপ্ত হয়
এবং বাংলাদেশে
খাদ্য সরবরাহের
জাহাজ আটকে
দেয়। ১৯৭৪-এ
বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ
পরিস্থিতি সৃষ্টির
পেছনে এটাও
একটা কারণ
হিসেবে চিহ্নিত।’
শুনেছি
ফিদেল কাস্ত্রো
শেখ মুজিবকে
যুদ্ধোত্তর প্রশাসন
বিষয়ে জিজ্ঞেস
করেছিলেন। শেখ
মুজিব বলেছিলেন,
‘দক্ষ
লোক পাই
না। খুব
অভাব। সেজন্য
যারা স্বাধীনতার
বিরোধিতা করেছে
তাদেরই প্রশাসনে
টানতে হয়েছে।’
কাস্ত্রো এর
সঙ্গে একমত
হননি। বলেছিলেন,
অদক্ষ লোক
যদি দেশপ্রেমিক
হয়, দায়বদ্ধতা
থাকে, তাহলে
তাকে দক্ষ
বানানো কঠিন
নয়। কিন্তু
দক্ষ লোক
যদি দেশবিরোধী
বা গণশত্রু
হয়, তাহলে
তার চেয়ে
ভয়াবহ আর
কিছু হতে
পারে না।’—
অধ্যাপক আনু
মুহাম্মদ, বিপ্লবের স্বপ্নভূমি কিউবা।
আলজিয়ার্সে
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী
শেখ মুজিবুর
রহমানের সঙ্গে
সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে
সমাজতান্ত্রিক কিউবার
প্রেসিডেন্ট ফিদেল
কাস্ত্রো বলেছিলেন,
‘আমি
হিমালয় দেখিনি,
তবে আমি
শেখ মুজিবকে
দেখেছি। ব্যক্তিত্ব
ও সাহসে
এ মানুষটি
হিমালয়ের সমতুল্য।
আর এভাবেই
আমি হিমালয়
দেখার অভিজ্ঞতা
লাভ করেছি।’
ফিদেল কাস্ত্রোর
এ উক্তির
মাধ্যমে মুজিবকে
ঘিরে তার
অভিব্যক্তিগুলো স্পষ্ট
ফুটে ওঠে।
একজন পুরোদস্তুর
বিপ্লবী তো
এভাবেই শব্দের
গাঁথুনিতে সাজাবেন
তার সমসাময়িক
সংগ্রামী সতীর্থকে।
কিউবার
সান্টিয়াগোর ক্যাথলিক
স্কুলে শিক্ষাজীবন
শুরু হয়
ফিদেলের। ১৯৪০-এর
দশকে হাভানা
বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন
পড়ার সময়ে
রাজনীতিতে জড়িয়ে
পড়েন। কাস্ত্রো
মনে করতেন
কিউবার লাগামহীন
পুঁজিবাদের কারণে
দেশটির যাবতীয়
অর্থনৈতিক সমস্যার
উদ্ভব। একমাত্র
জনগণের বিপ্লবের
মাধ্যমেই যার
সমাধান হতে
পারে।
১৯৫৯
সালে মাত্র
৩৩ বছর
বয়সে কিউবার
তত্কালীন শাসক
বাস্তিতাকে উত্খাত
করেন কাস্ত্রো।
এরপর পাঁচ
দশক ধরে
ক্ষমতায় ছিলেন।
কিউবাকে গড়েছেন
নিজ হাতে।
তার আমলে
কিউবাজুড়ে ১০
হাজার নতুন
স্কুল চালু
হয়। পাহাড়ে,
দুর্গম প্রত্যন্ত
সব অঞ্চলে
শিক্ষার আলো
পৌঁছে দিতে
কাজ শুরু
করে কাস্ত্রোর
সরকার। এ
উদ্যোগের কারণে
খুব অল্প
সময়ের মধ্যে
কিউবার সাক্ষরতার
হার পৌঁছে
যায় ৯৮
শতাংশে।
১৯৭১
সালের ১৬
ডিসেম্বর শেখ
মুজিবুর রহমানের
নেতৃত্বে বাংলাদেশের
বিজয় অর্জিত
হয়। ১৯৭২
সালে তিনি
যখন রাষ্ট্র
পরিচালনার গুরুদায়িত্ব
কাঁধে নেন,
তখন তার
সামনে যুদ্ধবিধ্বস্ত
এক ভূখণ্ড।
সর্বত্র পাকিস্তানি
দখলদার বাহিনীর
চালানো তাণ্ডবের
ক্ষত চিহ্ন।
ভেঙে পড়া
যোগাযোগ ব্যবস্থা।
খাদ্য, বাসস্থানের
সংকটে অসহায়
মানুষ। এক
কোটি শরণার্থীর
পুনর্বাসনসহ অগণিত
সমস্যা সামলানোর
চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধবিধ্বস্ত
একটি দেশের
পুনর্গঠনের তুমুল
সে চ্যালেঞ্জ
নিয়ে অর্থনৈতিক
মুক্তি অর্জনে
তিনি প্রথম
পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা
গ্রহণ করেন।
লক্ষ্য,
এ পরিকল্পনার
মাধ্যমে দারিদ্র্যপীড়িত
বাংলাদেশের জনগণের
অভাব দূরীকরণ
ও অর্থনৈতিক
মুক্তি অর্জন।
জনগণের অত্যাবশ্যক
পণ্যের চাহিদা
মেটানোর লক্ষ্যে
সেসব পণ্যের
উৎপাদন বৃদ্ধি।
কৃষির প্রাতিষ্ঠানিক
ও প্রযুক্তিগত
কাঠামোয় এমনভাবে
রূপান্তর সাধন,
যাতে খাদ্যশস্যের
উৎপাদনের স্বয়ংসম্পূর্ণতা
অর্জিত হয়।
কৃষিতে কর্মসংস্থানের
সুযোগ বাড়ে
এবং শ্রমশক্তির
শহরমুখী অভিবাসন
বন্ধ হয়।
শেখ
মুজিবুর রহমান
মাত্র সাড়ে
তিন বছর
দেশ পরিচালনার
সুযোগ পেয়েছিলেন।
এই এতটুকু
সময়ের মধ্যে
তিনি বাংলাদেশের
সার্বিক উন্নয়নের
জন্য সুদূরপ্রসারী
পরিকল্পনা গ্রহণ
করেন। বাস্তবায়ন
করেন অনেক
অসাধ্য কর্মসূচি।
একটি দেশ
সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার
জন্য ও
মুক্তিযুদ্ধের চেতনানির্ভর
একটি সময়োপযোগী
আধুনিক রাষ্ট্র
গঠনের জন্য
প্রয়োজনীয় সব
পদক্ষেপ তিনি
গ্রহণ করেন।
কেননা তিনি
ছিলেন একজন
দূরদর্শী নেতৃত্ব।
তার রাজনৈতিক
দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে
ছিল এ
দেশের জনগণ,
বিশেষ কোনো
গোষ্ঠী নয়।
এ দেশের
জনগণের অধিকার
আদায়, বৈষম্য
হটিয়ে সাম্য
প্রতিষ্ঠাই ছিল
তার সংগ্রামী
রাজনীতির অন্যতম
অভীষ্ট।
বাঙালি
জাতির জন্য
শেখ মুজিবুর
রহমানের অবদান
ও আত্মত্যাগ
এ দেশের
জনসাধারণের কাছে
তাকে বঙ্গবন্ধুতে
পরিণত করেছে
এবং তার
অসাম্প্রদায়িক ও
মানবতাবাদী রাজনৈতিক
দর্শন তাকে
বিশ্বদরবারে স্থান
করে দিয়েছে।
তেমনি মুক্তিকামী-নিপীড়িত-নির্যাতিত
মানুষের শোষণ-বঞ্চনার
বিরুদ্ধে আজীবন
এক প্রতিবাদী
চরিত্রের নাম
ফিদেল কাস্ত্রো। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের
ইতিহাসে সবচেয়ে
দীপ্তি ছড়ানো
নক্ষত্রও। যিনি
সারা জীবন
স্রোতের বিপরীতে
সাঁতরেছেন। টিকে
থেকেছেন। হার
মানেননি। আপস
করেননি। প্রায়
৫০ বছর
ধরে ক্ষমতাধর
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
নাকের ডগায়
বসে সমাজতান্ত্রিক
পন্থা মেনে
কিউবা শাসন
করেছেন। ১৯৫৯
থেকে ১৯৭৬
সাল পর্যন্ত
কাস্ত্রো কিউবার
প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে
প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব
ছেড়ে ১৯৭৬
সাল থেকে
২০০৮ সাল
পর্যন্ত একটানা
কিউবার প্রেসিডেন্টের
দায়িত্ব সামলেছেন।
ফিদেল কাস্ত্রোর
অসাধারণ ব্যক্তিত্ব,
দৃঢ়তা ও
দূরদৃষ্টি শুধু
কিউবাকেই সমৃদ্ধ
করেনি, অন্য
রাষ্ট্র নেতাদেরও
উন্নয়নের পথ
দেখিয়ে দিয়েছে। অনুরূপভাবে, শেখ
মুজিবুর রহমান
শুধু বাঙালি
জাতির জনকই
নন, বিশ্বের
নির্যাতিত মানুষের
মুক্তিসংগ্রামের নেতা।
তার নেতৃত্ব
হয়ে উঠেছিল
বিশ্বের নির্যাতিত
মানুষের মুক্তিসংগ্রামের
প্রেরণার উৎস।
বঙ্গবন্ধু
ও কাস্ত্রো
স্বপ্ন দেখেছিলেন
শান্তিময় বিশ্বের।
১৯৭১ সালে
স্বাধীনতা যুদ্ধের
সময় কাস্ত্রো
বাংলাদেশের পক্ষে
ছিলেন। পাশে
দাঁড়িয়েছিলেন। তারা
এমন একটি
বিশ্বের স্বপ্ন
দেখেছিলেন, যেখানে
থাকবে না
কোনো দারিদ্র্য,
সংঘাত ও
অবিচার। বঙ্গবন্ধু-কাস্ত্রোর
বন্ধুত্বও ছিল
বেশ জোরালো।
মুজিব ও
কাস্ত্রো দ্রোহ
ও বিপ্লবের
দুই কিংবদন্তি।
১৯৭৫
সালের ১৫
আগস্ট ঘাতকদের
হাতে শেখ
মুজিবের নিহত
হওয়ার খবর
শুনে কাস্ত্রো
বলেছিলেন, ‘শেখ
মুজিবের মৃত্যুতে
বিশ্বের শোষিত
মানুষ হারাল
তাদের একজন
মহান নেতাকে,
আমি হারালাম
একজন অকৃত্রিম
বিশাল হূদয়ের
বন্ধুকে।’
যদিও
১৯৭৩ সালের
সেপ্টেম্বরে আলজেরিয়ার
রাজধানী আলজিয়ার্সে
জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের
(ন্যাম) শীর্ষ
সম্মেলনে শেখ
মুজিবুর রহমানকে
সতর্ক করে
ফিদেল কাস্ত্রো
বলেছিলেন, ‘আপনি
আপনার শত্রুদের
এত স্বাধীনতা
দিয়েছেন। একদিন
ওরা আপনার
ঘাড়ে চড়ে
বসবে।’ এ
সতর্কবার্তা শুধু
বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমানের
জন্যই নয়,
বাংলাদেশের জন্যও
ছিল। দূরদর্শী
কাস্ত্রো শেখ
মুজিবের অপার
উদারতার সুযোগে
শত্রুদের মাথাচাড়া
দিয়ে ওঠার
আশঙ্কা করেছিলেন।
বছর দুইয়ের
মধ্যে তার
সে আশঙ্কাই
বাস্তবে রূপ
নিল।
রুহিনা ফেরদৌস: সাংবাদিক





