‘মুজিবকে অবশ্যই মুক্তি দিতে হবে’—ইন্দিরা গান্ধীর এ কথাই হয়ে উঠেছে সানডে টাইমস পত্রিকায় তার সাক্ষাত্কারের শিরোনাম।
সানডে টাইমসের নিকোলাস ক্যারোল এখানে ১৮ ডিসেম্বর, ১৯৭১ ইন্দিরা গান্ধীর সাক্ষাত্কার নেন। এটি প্রকাশিত হয় ১৯ ডিসেম্বর, ১৯৭১। এ সাক্ষাত্কার মুজিব-ইন্দিরা সম্পর্ক আরো স্পষ্ট করে তুলবে বলে আংশিক উপস্থাপন করছি।
ক্যারল: বাংলাদেশ প্রশ্নে আপনার ঘোষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। আপনি স্পষ্টভাবেই বলেছেন, ভারতের রাষ্ট্রসীমা বৃদ্ধির কোনো অভিলাষ নেই। তাহলে কবে নাগাদ শেষ ভারতীয় সেনা প্রত্যাহারের কাজটি সম্পন্ন হবে?
মিসেস গান্ধী: এ পর্যায়ে বলা কষ্টকর। বিষয়টি প্রধানত বাংলাদেশ সরকারের ওপর নির্ভর করে। আমরা আশা করি তা শিগগিরই ঘটবে।
ক্যারল: কত সপ্তাহ বা মাস এমন কিছু কি ভাবছেন?
মিসেস গান্ধী: এখনো বিষয়গুলো এলোমেলো অবস্থায় রয়েছে বলে আমি এ অবস্থায় কিছু বলতে পারছি না। সেখানকার জনগণের নিরাপত্তার বিষয়টিও দেখতে হবে। অবাঙালিদের প্রতি এবং অন্যান্য বিষয়েও আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। আমি মনে করি ভারতীয় সেনাবাহিনী এক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারবে।
ক্যারল: আপনি কি আবারো সুনির্দিষ্টভাবে বলবেন যে পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো এলাকা ভারতের অধিকারে রাখার ইচ্ছে আপনার নেই?
মিসেস গান্ধী: আমি মনে করি, আমি সুনির্দিষ্টভাবেই জনসভায় এবং সংসদে বলেছি যে আমাদের সীমানা সম্প্রসারণের কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই।
ক্যারল: পাকিস্তানের অধিকারে যে এলাকা রয়েছে, যা আপনার মতে ন্যায্যত ভারতের, সেক্ষেত্রেও কি এমনই কথা প্রযোজ্য?
মিসেস গান্ধী: আমি বলেছি যে আমরা বল প্রয়োগ করে তা উদ্ধার করব না। কিন্তু আপনি জানেন, আমরা কেবল বিশ্বাসই করি না, এটা প্রমাণিতও হয়েছে যে যুদ্ধ রহিতকরণ রেখা বরং খামখেয়ালির মাধ্যমে নির্ধারিত এবং তা শান্তি নিশ্চিত করতে সাহায্য করে না। তবে এটা নিয়ে সরকার নতুন করে বা নতুন কিছু ভাবছে না।
ক্যারল: বাংলাদেশের জন্য তার নেতা শেখ মুজিবুরের বিশেষ প্রয়োজন। তার মুক্তি নিশ্চিত করতে ভারত কী করছে? আপনি কোন ধরনের চাপ দিচ্ছেন?
মিসেস গান্ধী: আমি মনে করি না আমরা অনেকটা চাপ দিতে পারব। আমাদের দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে আমরা বিশ্ব সরকারগুলোর কাছে আপিল করেছি, আমি ব্যক্তিগতভাবে সবার কাছে চিঠি লিখেছি। আমরা একান্তভাবে প্রত্যাশা করি, তারা কিছুটা চাপ দেবে। আজ সকালেই দেখলাম আমেরিকান সরকার (পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের) যুদ্ধবিরতির কিছুটা কৃতিত্ব দাবি করে বসেছে, আশা করি তারা তাহলে এ ব্যাপারটাও দেখবে।
ক্যারল: কিন্তু আপনি তো তার জন্য জিম্মি হিসেবে পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের আটকে রেখেছেন। এটা কি সমঝোতার দরকষাকষিতে একটা ভূমিকা রাখতে পারে?
মিসেস গান্ধী: এ নিয়ে আমি তেমন কিছু বলতে পারব না, কারণ আমি জানি না কীভাবে সে আলোচনা হবে বা কী ঘটবে।
ক্যারল: বাংলাদেশ ও শরণার্থী প্রশ্নে ভারতের অবস্থান বুঝতে না পারায় আপনি প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে তিরস্কার করেছেন, ফলে আপনার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক তিক্ত হয়ে উঠেছে। যদি ধরে নিই আপনার প্রত্যাশা অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব এ সম্পর্কের উন্নয়ন হয়, আপনি প্রেসিডেন্ট নিক্সনের পদক্ষেপ গ্রহণ দেখতে চান?
মিসেস গান্ধী: হ্যাঁ, এটি আপনিই উল্লেখ করেছেন। শেখ মুজিবের মুক্তির বিষয় তাদের বাংলাদেশ পরিস্থিতির বাস্তবতায় স্বীকার করতে হবে। তাদের পাকিস্তান পরিস্থিতির বাস্তবতাও মানতে হবে। একটা দূরের দেশ অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে উৎসাহ জোগাতে পারে না, হস্তক্ষেপও করতে পারে না। আপনার পছন্দের বিশেষ সরকারকে আপনি সমর্থন করতে পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই সরকার সে দেশের জনগণের জন্য সঠিক কিনা? যদি তা না হয়, তাহলে এটি কখনো শক্তিশালী সরকার হতে পারে না—এর পেছনে যত সেনাবাহিনীই থাকুক কেন, তাতে কিছু এসে যায় না। এটা আমাদের বিষয় নয়, তাদের। এটা পাকিস্তানের ব্যাপার।
ক্যারল: অন্য সব দেশ পেছনে ফেলে কেবল সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে ছুটে আসবে—এটাকে আপনি অনাকাঙ্ক্ষিত মনে করেন না?
মিসেস গান্ধী: এটাকে বরং আমি এভাবে দেখতে চাই, যত বেশিসংখ্যক দেশ স্বীকৃতি দেবে, বাংলাদেশ তত আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে, এখন বাংলাদেশকে যেসব সমস্যার মোকাবেলা করতে হচ্ছে, তখন তার সমাধান সহজ হয়ে যাবে। আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, স্বাধীনতা দরজাটা খুলে দেয়; কিন্তু আসল কাজ আসে তারপর।
আন্দালিব রাশদী: কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক





